জুলাই ও কিছু কথা // সৈয়দা রুখসানা জামান শানু মতামত / 
সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনে ছাত্রসমাজ, যুবসমাজ, শিক্ষক, লেখক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদসহ আরো অনেকের অবদান অবিস্মরণীয়। এদের সৎ চিন্তা-চেতনা, দর্শন, নির্দেশনার ওপর নির্ভর করে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন। ব্যতিক্রম ঘটলেই সমাজ ও রাষ্ট্রে নেমে আসে দূর্যোগ ও মহাপ্রলয়। আর তখন মহাপ্রলয়ে ডুবতে থাকে কেবলই ডুবতে থাকে সাধারণ মানুষ। এমনটি ঘটে গেলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রে। যা কারোরই কাম্য ছিল না। বিগত সাড়ে পনেরো বছর ধরে ক্ষমতায় অধীন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি তথা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা পরপর তিনটি নির্বাচনে বিরোধী দলকে সম্পৃক্ত না করেই একক নির্বাচন করেন। এখানেও নানা কুট-কৌশলে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত রাখেন। নানা টকশো আর পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় ২০০৯ সালে বিডিয়ার জেনোসাইড করে তিনি মসনদে বহাল থাকেন। শুধু তাই নয়, ২০১১ সালেও পাতানো ক্যু করেছিলেন। এতে ১৯ জনের চাকুরি চলে যায়, তার মধ্যে ১৮জন ছিল দাড়িওয়ালা। কিন্তু ২০১৩ সাল হতে তার সরকারের সময়ে শুরু হয় অনান্য দলের নেতা-কর্মীদের ওপর জুলুম অত্যাচার, খুন, গুম এবং গ্রেফতার। হেফাজত ইসলামও বাদ পড়েনি। এর মাত্রা দিনের পর দিন বাড়তে বাড়তে চরম পর্যায়ে এসে দাড়ায়। যদি কেউ প্রতিবাদ করে তবে তাকে নানা মামলা দিয়ে বছরের পর বছর জেল হাজতে কাটাতে হয়। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার নির্দেশে অনেককে গুম করে রাখা হয় ভয়ংকর লোমহর্ষক আয়নাঘরে। একছত্র ক্ষমতার দাম্ভিকতা, অহংকার, দুর্নীতির ওপর দুর্নীতি, মিথ্যের ওপর মিথ্যে বুলি আউড়ানো, উদোর পিন্ডি বুদোড় ঘাড়ে চাপানো। এ খেলায় ভীষন পারদর্শী হয়ে ওঠেন সরকার প্রধান। সবাই তার হুকুমের গোলাম হয়ে যায়। এ বিষয়ে সাবেক কর্ণেল ইউটিউবে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পদত্যাগকারী, দেশ পলাতক, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন মাদার অফ মাফিয়া। যার আঁচলের তলায় গড়ে ওঠেছিল পুলিশ বাহিনী, বিডিআর, ডিজিএফআইসহ আরো অনান্য বিভাগে একাধিক মাফিয়া চক্র। যা শেখ হাসিনা নিজেই পরিচালনা করতেন।
এ প্রজন্মের দেশ প্রেমিক সূর্যসন্তানেরা, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত বাহক, সাধারণ ছাত্রসমাজ বৈষম্যহীন একটি বাংলাদেশ দেখতে চায়। এ লক্ষ্যে কোটা নিয়ে তারা আন্দোলনে নামে গত জুলাই-২০২৪ খ্রি: কিন্তু সরকার তাদের আবদারের প্রতি তোয়াক্কাই করেনি। বরং তাদের রাজাকার বলে গালি দেয়। এতে আন্দোলন তীব্র হয়। ১৬ জুলাই সরকারের পুলিশ বাহিনী রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাইদের বুকে পরপর চারটি গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করে। এরপর বৈষম্য বিরোধী ছাত্রসমাজের প্রতিবাদ, ক্ষোভের আন্দোলন সারাদেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে প্রবাসীদের মাঝেও এ প্রতিবাদ ও ক্ষোভের আন্দোলন ফুঁসে ওঠে। সরকারও তাদের কথা না শুনে আওয়ামীলীগের পেটোওয়া ও গুন্ডা বাহিনী প্রতিবাদি ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর লেলিয়ে দেয়। এ গুন্ডাবাহিনী ছাত্রসমাজকে বেধড়ক পিটানো শুরু করে এবং সেই সাথে সরকারের হুকুমে সাজোয়া যান, সেনাবাহিনী, পুলিশবাহিনী নিরস্ত্র ছাত্রসমাজের ওপর পাখিরমত গুলি বর্ষণ করে। এমনকি হেলিকপ্টার হতেও গুলি বর্ষণ করে নিরীহ ছাত্র-ছাত্রীদের খুন করে। আর অন্যের ওপর তকমা লাগিয়ে সাফাই গায়। দেশের সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে প্রত্যেকটি নাগরিকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। অথচ স্বৈরসরকার তা গুলি বর্ষণ করে প্রতিহত করেছে। রেমিটেন্সযোদ্ধাগণ ব্যাংকে তাদের টাকা পাঠানো বন্ধ করে সরকার প্রধানের কাছে খুনের বিচারের দাবি জানায়। এই বিচারের সাথে তারা আল্টিমেটাম দেয় যে, যতদিন বিচার হবে না ততদিন ব্যাংকে টাকা পাঠাবে না তারা। স্বৈরসরকার তখনও আমলে নেয়নি বিষয়টি। বরং সকল প্রকার ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিছিন্ন করে দেয়। এতে মানুষের দূর্ভোগ চরমে ওঠে।
নিরাপত্তার শপথ নিয়ে দেশ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে যারা তারাই এ অমানবীয়, ন্যাক্কারজনক এবং হিংসাত্মক গুলি বর্ষণ করে একের পর ছাত্র-ছাত্রিকে খুন করে। এরপরেও থামেনি সরকারের অমানবিকতা। ৬ সমন্বয়ককে হাসপাতাল থেকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ৬দিন রাখা হয় ডিবি কার্যালয়ে। এ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল ডিবি প্রধান হারুন-অর রশিদ (হারুন)। ছয় সমন্বয়ক তাদের মুক্তির দাবিতে দীর্ঘ ৩২ ঘন্টারও বেশি সময় অনশন করেন সেখানে। এরপর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এদিকে আন্দোলন চলতে থাকে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুলি বর্ষণ হতে থাকে নিরস্ত্র ছাত্রসমাজের ওপর। এতে সরকারিভাবে জানা যায় তিনশতাধিক মানুষ মারা যায়। কিন্তু বেসরকারী নানা সোর্স হতে জানা যায় প্রায় ১১শত ছাত্র-ছাত্রি খুন হয় এবং দশ হাজারেও বেশি আহত হয়।
৫২’র ভাষা আন্দোলনে মাত্র ১২জন মারা যায়। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানে ৬১ জন মৃত্যুবরণ করে। অথচ ২০২৪ খ্রি: বিশ্ব ইতিহাসে অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ঘটনা। ৬৯’র গণঅভ্যুত্থানের চাইতে চারগুণেরও বেশি নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। কতটা হিংসাপরায়ণ হতে পারে সরকার নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য এ নির্মমতায় নিমগ্ন হয়েছিল। সাধারণ মানুষ সবচেয়ে প্রতাপশালী ক্ষমতাধর হাসিনাকে খুনি হাসিনা বলে আখ্যায়িত করে। এ নির্মমতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধার প্রকৃত বাহক সূর্যসন্তানেরা। কতটা দেশের প্রতি মায়া, মমতা এবং দেশের মাটিকে কতটা ভালোবাসতে পারে যে তারা শারীরিক-মানসিকভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েও জীবনের পরওয়া না করে নানা শ্লোগানে দিনের পর দিন রাতের পর রাত রাজপথ দখল করে রাখে। তার সাথে যোগ দেয় আপামর জনতা। প্রবাস থেকে রেমিটেন্সযোদ্ধরাও ব্যাংকে টাকা পাঠানো বন্ধ ষোষণা দেয়। সকলের একদফা দাবি স্বৈরসরকার হাসিনা গদি ছাড়। অন্যদিকে সরকার গদি না ছাড়ার অঙ্গিকারে অটল। বিক্ষোভ-প্রতিবাদ এ আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসে ছাত্রসমাজের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজসহ, আইনজীবী, অভিভাবকবৃন্দ ও সর্বস্তরের আপামর জনসাধারণ। এ যেন জনসমুদ্রের জনজোয়ার। দেশ স্বাধীনের ৫৩’বছরেও এমন নজির দেখা মেলেনি। যা হাসিনা সরকারের সম্মুখে চিত্রায়িত হলো। এ প্রচার সাধারণ মানুষের মাঝে প্রসার লাভ যাতে না করে সে জন্যে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল। আরো হুমকি দিল প্রয়োজনে গ্যাস, বিদুৎ এবং পানির লাইন বন্ধ করে দিবে। দেশবাসী টানা ২০দিন অর্থাৎ ১৬ জুলাই থেকে ৫আগস্ট পর্যন্ত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছে। মনে হয়েছিল আমরা গাজা অথবা কাশ্মীরে বসবাস করছি। অবশেষে স্বৈরসরকারের নিপীড়ন-নির্যাতন, অহংকার আর তান্ডবের ক্ষমতাকে এ মাটির বীরোচিত সন্তানেরা ভেঙে চুরমার করে খান খান করে দেয়। আর সে দিনক্ষণ ছিল ৫ আগস্ট/২৪। দিনটি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে রইলো। সারাদেশ থেকে ছাত্রসমাজ শাহবাগে জড় হয়ে এক দফা দাবি নিয়ে গণভবনের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। সরকার বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এ খবর পেয়ে রাস্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রির পদত্যাগ করে বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করে পলায়ন করে ভারতের অভিমুখে রওয়ানা হন। একাধিক গণমাধ্যম হতে জানা যায়, এ যাত্রায় তার লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু লন্ডন সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় দিল্লী অবস্থান করেন। অন্যদিকে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপামর জনসাধারণ গণভবনে প্রবেশ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে না পেয়ে দীর্ঘ বহু বছরের পুঞ্জিভ‚ত ক্ষোভ এবং রাগে সেখানকার আসবাবপত্র, চেয়ার-টেবিল, ফ্যান, এসি ফ্রিজ, চাল-ডাল, শাড়ি কাপড়, মাছ, মুরগি, ডিম, কবুতর, খোরগোশ, শাক-সব্জি, সোফা, বিছানাসহ যা পেয়েছে মাথায় তুলে বাড়ি নিয়ে চলে যায়। আবার কেউ কেউ গাছের কাঁঠাল পেড়ে বাড়ি নিয়ে যায়। কিছু সময় পরে আবার এসব ফেরৎও দেয়া শুরু করে। বিশ্ব ইতিহাসে এমন নজির আর দেখিনি। দেশপলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জীবনে এমন কালো অধ্যায় নেমে আসবে তা তিনিও কখনও ভাবতে পারেননি। এর প্রধান কারণ ছিল তিনি বিগত সাড়ে ১৫ বছরে অস্ত্রের মুখে, খুন, গুম এবং অন্যসব রাজনৈতিক দলগুলোকে ট্যাগ লাগিয়ে, বাক স্বাধীনতা কেঁড়ে নিয়ে, মানুষের ভোটাধিকার কেঁড়ে নিয়ে দেশের গণতন্ত্রের ভীতকে একেবারে দূর্বল করে একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। এই ট্যাগ দেশের সাধারণ মানুষ গণরোষে তার জীবৎদশায় ফেরৎ দিল ‘খুনি হাসিনা’ বলে। অন্যদিকে তার পূত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ পরিবার আওয়ামীলীগ ত্যাগ করেছে। এদিকে পলাতক হাসিনা নিজে পালিয়ে গিয়ে আওয়ামীলীগ দলটিকে যেমন এতিম করে গেলেন, তেমনি দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকেও এতিম বানালেন।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর শেখ হাসিনার এ অভিনয় চলতে থাকে এবং সারাদেশের মানুষ তার এসব মিথ্যে নাটক দেখে ভিতোরে ভিতোরে প্রতিবাদ না করার ক্ষোভে ফুঁসতে থাকে। কিন্তু শেখ হাসিনা আপামর সাধারণ জনগণের মন পড়তে পারেননি। যা একজন সরকার প্রধানের পড়া একান্ত কর্তব্য ও দায়িত্ব ছিল। আসলে মনে হয় তিনি কখনও ম্যান সাইকোলজি, উইমেন সাইকোলজি, চাইল্ড সাইকোলজি পড়াতো দূরের কথা এসবের নামই হয়তবা শোনেননি। যদিও সংসদে এবং গণভবনে ছিল বিশাল লাইব্রেরী। কিন্তু অরাজকতা চালাতে চালাতে তার সময় হয়ে ওঠেনি। এ কারণে তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের ওপর ন্যাক্কারজন হত্যাকান্ড চালিয়ে যান।
ইতিহাস স্বাক্ষী তারুণ্যের বাক স্বাধীনতা মুক্তিকামী বৈষম্য বিরোধী ছাত্র জনতার প্রতিরোধ রুখবার কারোর সাধ্যি ছিল না। জনসমুদ্রের প্রবল জোয়ার যখন নানা শ্লোগানে অর্থাৎ ‘ঢাকায় আসছে জনগণ, ছাড়তে হবে গণভবন, চলো চলো ঢাকায় চলো, গণভবন ঘেরাও কর। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করার উদেশ্যে গণভবনে প্রবেশকালে ছাত্র-জনতার কণ্ঠে এসব শ্লোগান মুখরিত হয়। কিন্তু শেখ হাসিনা জনতার সম্মুখে ধরা না দিয়ে বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের দিল্লীর পথে পালিয়ে যান। ভারত সরকারও চাচ্ছে না হাসিনা তার দেশে থাকুক। অন্যদিকে আমেরিকা তার ভিসা ক্যানসেল করে দিয়েছে। লন্ডন সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য অনুমতি চেয়ও অনুমতি পায়নি। এছাড়াও অনান্য অনেক দেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বলে একাধিক গণমাধ্যমে জানা যায়। শেখ হাসিনা যেমন বিপাকে তেমনি মোদি সরকারও বিপাকে পড়েছে। কেননা ভারতবাসী চায় না শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিক। এতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের কুটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি আমলে রাখছে তারা। শেখ হাসিনাকে মোদি সরকার যত দ্রæত চলে যেতে বলেছে। এ বিষয়ে হাসিনা মোদির সাথে ফোনে কথা বলতে চাইলে ভারতীয় একাধিক গণমাধ্যম হতে জানা যায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কথা বলেননি। এক কথায় বলা যায় ভারত হাসিনার সুসময়ের বন্ধু ছিল। ভারতের জন্য হাসিনা সব কিছুই উজাড় করে দিয়েছিল, আজ সেই ভারত তাকে চলে যাওয়ার আল্টিমেটাম দিল। পাপ বাপকেও ছাড়ে না। এমনটি বাক্য ছোটকালেই পড়েছিলাম। আজ বৃদ্ধ বয়সে তা বাস্তবায়ন হতে দেখলাম। আমার জীবনে বাংলাদেশের ৫৩বছর বয়সে শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কোনো রাস্ট্র নায়ককে এতটা অপমান হতে দেখিনি। এদিকে সদ্য স্বৈরসরকার পতনে বাংলাদেশ নতুন করে স্বাধীন হয়েছে এটি ভেবেই সারাদেশ আনন্দ-উল্লাসে ফেটে পড়ে। কোথাও কোথাও গরু জবাই করে চলে নৈশ ভোজ। আবার কোথাও পিকনিকের আয়োজনে ব্যস্ত মানুষজন। এমনটি হওয়ার জন্য দায়ি শেখ হাসিনা নিজেই। কেননা তিনি দীর্ঘ ক্ষমতায় থেকে বঙ্গবন্ধুর ন্যারেটিভ বিক্রি করে খেয়েছেন। মানুষকে অপমানিত করা, তার মতের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের কথা না শোনা আর লাগামহীন নোংরা কথাবার্তা, সে পথে হেঁটেছে আওয়ামীলীগ দলটিও। এতে স্পষ্টভাবে দেখা মিলে যে বঙ্গবন্ধুকে দ্বিতীয় বার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলেন তারই কন্যা শেখ হাসিনা।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দীন ৬’আগস্ট সংসদ ভেঙে ফেলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজের নেতা নাহিদ ইসলাম এক প্রেস মিটে জানিয়েছেন তারা বির্তকিত ব্যক্তি বাদ দিয়ে এবং যাদের গ্রহণ যোগ্যতা রয়েছে তাদের নিয়ে অন্তর্বর্র্তীকালীন সরকার চান। তবে তাদের একটি বড় দাবি রয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ এবং ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল প্রাইজপ্রাপ্ত ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান করে সরকার গঠন করতে হবে। এতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের সম্পৃক্তা অব্যশই থাকাটা সকলেই সমুচীন মনে করছেন। কারণ প্রবীনের হাত ধরে তরুণরাই এগিয়ে যাবে, এটাই সকলের কাম্য। বরেণ্য ব্যক্তি ড. ইউনূসের সরকার প্রধান হওয়ার বিষয়টি সেনা প্রধান, তিন বাহিনীর প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি সম্মতি প্রকাশ করেন। এর পরবর্তীতে ৮’আগস্ট,২০২৪ বৃহস্পতিবার রাত্রি ন’টার সময় বঙ্গভবনে ১৭জন গুণী মানুষ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করে রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন তাঁদের শপথবাক্য পাঠ করান। এ সময় বঙ্গভবনের দরবার হলে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রসমাজের সমন্বয়ক ও প্রিন্ট মিডিয়া ইলেকট্রমিক মিডিয়ার সংবাদকর্মীসহ রাষ্ট্র ও দেশের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ প্রমূখ। এ উপস্থিতি ছিল বিভিন্ন পেশার প্রায় ১২শ জনের।
এখন অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে নতুন বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছে নতুন প্রজন্ম। এটি মেরামত, কোথাও কোথাও নতুন করে তৈরি। অর্থাৎ সর্বপরি সংস্কার প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্যিক মোকাবেলা, বিচার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের রোড ম্যাপ তৈরিকরন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের উন্নয়ন, দৈনিন্দন কাজ এবং সবচেয়ে বড় ব্যাপার জনগণের আস্থার জায়গায় আসা এসব মিলিয়ে আমার মতে দীর্ঘ মেয়াদী এ সরকার থাকাটা প্রয়োজন মনে করছি। কেননা যেসব দল আওয়ামীলীগের কুট-কৌশলে নির্বাচনের বাইরে ছিল তাদেরকেও নিজেদের ঘর গুছাতে সময় দরকার। সব মিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন অতীব জরুরী হয়ে দেখা দিচ্ছে। অবশেষে দীর্ঘ মেয়াদ নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
শেখ হাসিনা পলায়নের পর গণহারে আওয়ামী দূর্নীতিবাজ নেতা-কর্মীগণের পলায়নের হীড়িক পড়ে যায়। দেশে পাঁচদিন কোনো সরকার না থাকায় সারা দেশব্যাপী ছাত্র-জনতা অফিস-আদালত পাহারা দেয়। এমনকি পরিচ্ছন্নকর্মীর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিয়ে রাস্তা-ঘাট পরিস্কার রাখে। শুধু কি তাই, তারা রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন করে। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় বাড়ির পুরুষেরা চুরি-ডাকাতি যাতে না হয় সারা রাত্রি ধরে রাস্তায় বসে পাহারা দিয়েছে। ছদ্ধবেশে নানা গাড়িতে অফিসের ফাইলপত্র সরিয়ে নেয়াকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্রসমাজের হাতে ধরা পড়ছে। দেশের প্রতি মায়া-মমতার এসব চিত্র আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে।
পুলিশ একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। কিন্তু সদ্য সাবেক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রনে সরকারের পেটওয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহত হয়ে আওয়ামীলীগ রাজনৈতিক দলের হুকুমের গোলাম হয়ে অপেশাদারে পরিণত হয়েছিল। জুলাই-আগস্টের এ সীমাহীন গণহত্যা পুলিশের অপেশাদারের পরিচয় বহন করে। সদ্য গণহত্যা অনেক পুলিশকে ট্রমাতেও নিয়ে গেছে। পুলিশ বাহিনীকে তার পেশাদারিত্বে ফিরিয়ে এনে সার্বিক দায়িত্ব পালন করার জন্য পুলিশে সকল ধরণের রাজনৈতিক নিয়োগ, বদলি এবং ছুটি বাণিজ্যের যে প্রাকটিস অব্যহত রয়েছে সেটি বর্তমান সরকারকে উপড়ে ফেলার জন্য গুরুত্বের সাথে কাজ করতে হবে। সেই সাথে বহু হারুন এবং বহু বিপ্লবকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করতে হবে। সীমাহীন দূর্নীতির দায়ে রাষ্ট্রের কাঠামো সর্বক্ষেত্রে ভেঙে পড়েছে। তরুণসমাজকে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে আর সেই সাথে এ সময়ে ছাত্র-জনতা, শিক্ষকসমাজ, অভিভাবক, আপামর জনসাধারণ যে ভালনারেবল সময় অতিবাহিত করেছে সে জন্যে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে এনে দৃশ্যমান শাস্তি প্রদান করতে হবে এ সরকারকে।
তারুণ্যের মরণপন সংগ্রামের ফসল, গণঅভ্যুত্থানের ফসল, বিপ্লবের ফসল নতুন ইতিহাস গড়া আজকের বাংলাদেশে। এখন চলছে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ। আজকের নতুন বাংলাদেশ সারা পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে রইলো। এ বিজয় কোনো বিদেশি শক্তির বিনিময়ে নয়, এ বিজয় দেশের পাঁচ কোটি তারুণ্যের শক্তির বিজয়। প্রবীণের হাত ধরে নবীন এগিয়ে যাবে, নবীনের জন্য প্রবীণকে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। এমনটিই হওয়ার কথা সর্বকালে সর্বযুগে। বাংলাদেশের স্মরণকালের ইতিহাসে এমনটিই নজির স্থাপিত হলো। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ছাত্রসমাজের দু’জন ছাত্র নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ ১৭জন উপদেষ্টার মধ্যে দু’জন গর্বিত উপদেষ্টা।
শহিদের তালিকা তৈরি করে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সাথে সু-শাসন ফিরে আসুক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নিপাত যাক। এ বিজয়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান রেখে সামাজিক সাম্যের সাথে দূর্নীতিমুক্ত একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়ার অঙ্গিকার হোক বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের। গণতান্ত্রিক পন্থায় চলুক দেশ। আগামী সরকারকেও তারুণ্যের এ বীরোচিতের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে। এ প্রত্যাশাই কাম্য।
১০/০৮/২০২৪ খ্রি:

সব খবর
সর্বাধিক পঠিত