Opu Hasnat

আজ ১৪ জুলাই রবিবার ২০২৪,

অভিনয়টাই আমার প্রিয় শখ : ফিরদৌসী বসু বিনোদনসাক্ষাৎকার

অভিনয়টাই আমার প্রিয় শখ : ফিরদৌসী বসু

ওপার বাংলার (ভারত) অভিনেত্রী ফিরদৌসী বসু। নিপুণ, সাবলীল ও প্রাঞ্জল অভিনয় প্রতিভার কারিশমায় জয় করে চলেছেন অগণিত মানুষের হৃদয়। শুধুমাত্র অভিনেত্রী-ই নন; তিনি অসাধারণ একজন নৃত্যশিল্পীও বটে। সম্প্রতি ফিরদৌসী বসু মুখোমুখি হয়েছেন বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘টাইমটাচ নিউজ ডটকম’ এর সঙ্গে। বাংলাদেশ থেকে তার কথা জানাচ্ছেন ফয়সাল হাবিব সানি। 

টাইমটাচ নিউজ : বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ও তথ্যসমৃদ্ধ অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘টাইমটাচ নিউজ ডটকম’ এর পক্ষ থেকে আপনায় স্বাগত এবং আপনার প্রতি ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি। কেমন আছেন? 

ফিরদৌসী বসু : প্রথমেই অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই ‘টাইমটাচ নিউজ ডটক ‘-কে। আমার পক্ষ থেকে আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আপনাকে এবং বাংলাদেশের সকলের প্রতি। আমি ভালো আছি; ওঠা-পড়ার মধ্য দিয়ে ভালোই কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। 

টাইমটাচ নিউজ : বর্তমানে আপনার ব্যস্ততা সম্পর্কে জানতে চাই? 

ফিরদৌসী বসু : এই মুহূর্তে ব্যস্ততা বেশ খানিকটা চলছে। আসলে আমরা যারা ফ্রিল্যান্সিং করি, তাদের ব্যস্ততাগুলো বলতে পারেন বেশ অনির্দেশ্য। হঠাৎ করে প্রবল ব্যস্ততা চলে আসে; তখন কোন কাজটা ছেড়ে কোন কাজটা করব ভেবে সবটা সামলে উঠতে পারি না। আবার যখন ব্যস্ততা থাকে না, তখন কোনোদিকেই ব্যস্ততা থাকে না। তবে এই মুহূর্তে বেশ কিছু টুকরো টুকরো কাজ যেমন রেকর্ডিং, মিউজিক ভিডিও, ফটোশ্যুট, থিয়েটার এবং আমার নিজস্ব নাচের স্কুল ‘তাথৈ নৃত্য শিক্ষায়তন’ এর মধ্য দিয়ে ব্যস্ততাতেই দিনাতিপাত হচ্ছে আমার। 

টাইমটাচ নিউজ : মিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন কীভাবে? 

ফিরদৌসী বসু : এটা খুব ইন্টারেস্টিং একটা প্রশ্ন এবং আমার মিডিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়াটাও খুব অদ্ভুতভাবে ঘটে! আর আমি মূলত আমার জীবনের প্রধান সঞ্জীবনী শক্তি আমার নৃত্যশৈলীর বদৌলতেই প্রথম মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হই। আমার বাবা কখনো চাইতেন না আমি মিডিয়ায় কাজ করি। বাবা বরাবর চাইতেন আমি যেন পড়াশোনাটাই মনোযোগ সহকারে করি এবং পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার ধাপগুলো শেষ করে শিক্ষকতা করি। ২০১৩ সালে আমি যখন নবম শ্রেণিতে পড়ি, ওই সময় আমার কাছে মিডিয়ায় কাজ করার প্রথম সুযোগটা আসে। আর সেই সুযোগটা আসে আমার তৎকালীন নৃত্যগুরু শ্রীমতী পৌষালী মুখার্জি ও গুরু শ্রী দীপঙ্কর দাসের হাত ধরে। আমার কাছে সুযোগ আসে জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল ‘স্টার জলসা’র ধারবাহিক ‘জলনুপূর’ এর একটি স্পেশাল এপিসোডে নৃত্য পরিবেশন করতে হবে। ওই সময়টাই আমার বাবা ভারতে ছিলেন না। আমার মা প্রচণ্ড অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও আমায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মুভিটোন স্টুডিওতে। প্রকৃতপক্ষে, এই কাজটির পরপরই ধারাবাহিকের জন্য আমার কাছে বিভিন্ন অডিশনের সুযোগ আসে। কিন্তু বাবা দেশে ফিরে আসায় আমি আর সেগুলোতে যোগদান করতে পারিনি। উচ্চমাধ্যমিকের পর বেথুন কলেজে বাংলা বিভাগে অধ্যয়নের সময়টাই আমি পেশাগতভাবে নাচ নিয়েই মত্ত ছিলাম। স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত অবস্থায় ‘জি বাংলা’র খুবই জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ডান্স বাংলা ডান্স’ এ আমার বর্তমান নৃত্যগুরু সন্দীপ গোপ এবং হীরক সাহার অধীনে ডান্সগ্রুমার হিসেবে নিযুক্ত হই। এরই সঙ্গে ডান্স ডিরেক্টর রাহুল ঘোষের একটি পূর্ববর্তী কাজের সূত্রে ওই শো’তেই আমায় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিযুক্ত করা হই। এটি ছিল প্রাথমিক। স্নাতকোত্তর শেষ করার পর বিভিন্ন জায়গায় ছুটেছি, অডিশন দিয়েছি। তেমনই একটি অডিশন থেকে ২০২১ সালে আমায় প্রথম অভিনয়ের সুযোগ দিলেন খ্যাতনামা অভিনেতা এবং লেখক দেবপ্রতিম দাশগুপ্ত ওরফে তাজুদা। তাঁরই পরিচালিত  ওয়েব সিরিজ ‘রেড ক্যানভাস’ যা ‘হিপ্পিক্স’ ওটিটি প্ল্যাটফর্মে স্ট্রিমিং হয়েছিল। সেখান থেকেই ধারাবাহিকভাবে আমার অভিয়ন জীবন শুরু। 

টাইমটাচ নিউজ : আপনার উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ সম্পর্কে বলুন? 

ফিরদৌসী বসু : প্রত্যেক কাজই আমার কাছে খুবই বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ। তাজুদা পরিচালিত ওয়েব সিরিজটির (রেড ক্যানভাস) পর স্বর্ণশেখর জোয়ারদার পরিচালিত ছবি  ‘একলা মন’; তাজুদা পরিচালিত ছবি ‘মায়াগাঁও’; তারপর ‘স্টার জলসা’  চ্যানেলের ধারাবাহিক ‘এক্কা দোক্কা’, রামকমল মুখার্জি পরিচালিত ‘দেব এন্টারটেইনমেন্ট ভেঞ্চারস’ নিবেদিত ছবি  ‘বিনোদিনী- একটি নটীর উপাখ্যান’, বাপ্পা পরিচালিত ধাগা প্রোডাকশন নিবেদিত ছবি ‘ত্রিভুজ’, তাজুদা পরিচালিত ছবি ‘আবার আসিব ফিরে’ ইত্যাদি। তন্মধ্যে মুক্তি পেয়েছে দুটি ছবি। বাকি ছবিগুলোও হয়তো এই বছরই দর্শক দেখতে পাবেন। আর প্রতিটা কাজের ধরণ যেহেতু ভিন্ন, তাই প্রতিটা কাজই আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ববহ অর্থ বহন করে। 

তবু যদি আলাদা করে উল্লেখ করতে হয়, দুটি কাজ সম্পর্কে বলব, যে দুটি কাজ ভীষণই চ্যালেঞ্জিং ছিল আমার কাছে। প্রথমটা ‘বিনোদিনী- একটি নটীর উপাখ্যান’; এই ছবিতে ১৯ শতকের গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে বিনোদিনীর পূর্ববর্তী এক অভিনেত্রী ‘ক্ষেত্রমণি’র চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী  আমায় সর্বতোভাবে সাহায্য করেছিলেন আমার চরিত্রটিকে আমি যেন স্বতঃস্ফূর্তরূপে ফুটিয়ে তুলতে পারি। পুরো চরিত্রটা এতটাই চ্যালেঞ্জিং ছিল যে, এই চরিত্রটি সবসময়ের জন্যই আমার পছন্দের চরিত্র হয়ে থাকবে। এককথায়, কৌশিক গাঙ্গুলি, গৌতম হালদার, রাহুল বোস, রুক্মিণী মৈত্রদের মতো অভিনেতা-অভিনেত্রীর সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করাটা ছিল আমার কাছে স্বপ্নের ন্যায়। 

অপরদিকে, দ্বিতীয়টা ছিল ‘ত্রিভুজ’। এখানে আমার চরিত্র ছিল একজন আইপিএস অফিসারের; যা বলা যায় আমার স্বপ্নের চরিত্র। এই চরিত্রটিকে পরিচালক বাপ্পা দা বেশ বীরত্বপূর্ণ পন্থায় তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। চরিত্রে ভরপুর অ্যাকশন ছিল; যে কারণে আমায় মার্শাল আর্ট ট্রেনিং নিতে হয়েছিল। ট্রেনিং চলাকালীন এবং শুটিং ফ্লোরেও আমি নানাভাবে চোট পেয়েছিলাম; কিন্তু তা আমার জেদ আরও বাড়িয়ে তুলেছিল। এই অভিজ্ঞতা ছিল আমার কাছে খুবই বিশেষ ধরণের। এই ছবিতে সঙ্গে ছিলেন দেবলীনা দত্ত, সৌম্য ব্যানার্জি, বাসবদত্তা চ্যাটার্জী এবং আরও গুণী শিল্পী। 

টাইমটাচ নিউজ : ছোটবেলা থেকেই কী মডেল বা অভিনেত্রী হবার স্বপ্ন লালন করতেন নিজের মধ্যেই? 

ফিরদৌসী বসু : সত্যি কথা বলতে একদমই তাই। আমার মা-বাবা দুজনেই থিয়েটার করতেন। বাবার নিজস্ব দল ছিল। আমার বাড়িতেই মহড়া বসত। আর ওই মহড়ার মধ্য দিয়েই গুটি গুটি পায়ে ছোট থেকে আজ বড় হয়ে ওঠা। তাই অভিনেত্রী হবার স্বপ্নটা ছিল সেই ছোট থেকেই আমার। নিজের মনের মধ্যেই একদিন অভিনেত্রী হবার সুপ্ত বাসনা ও বাঞ্চা সযত্নে লালন করে পুষে রাখতাম। ছোটবেলায় বিভিন্নভাবে নিজেকে নিয়ে কল্পনা করতাম। স্বপ্ন দেখতাম, আমিও নিজেকে একদিন টেলিভিশনের ছোট পর্দায় কিংবা রূপালি পর্দায় দেখব, নয়তো মঞ্চে দেখব। 

টাইমটাচ নিউজ : আপনার নৃত্য প্রতিভায় যে কেউ-ই মুগ্ধ হতে বাধ্য। নাচ শেখার গল্পটা যদি সংক্ষেপে বলতেন? 

ফিরদৌসী বসু : আমার নাচ শেখা শুরু ৫ বছর বয়স থেকে। প্রথম থেকেই শাস্ত্রীয় নৃত্য ‘ওড়িশি’ নৃত্যেই আমি তালিম নিয়েছি। আমার নাচ শেখার পেছনে একমাত্র ভূমিকা আমার মায়ের। নানান প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও কোনোদিন আমার মা আমার নাচের ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দেননি। বাবা পছন্দ করতেন না; তারপরও আমি প্রবলভাবে ভালোবেসেছি নাচকে। বাবাকে গোপন করে আমাকে নাচের ক্লাসে নিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করানো, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও তার রিহার্সালে নিয়ে যাওয়া এসব নিয়ে নানান মজার অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। এখন সেই অভিজ্ঞাগুলো মজার মনে হলেও আদৌ ওই সময়টাই তা একেবারেই মজার ছিল না। বলতে পারেন, সেই সময়টা অত্যন্ত কঠিন সময়ও ছিল আমার জীবনের পথ পরিক্রমায়। বাবা আমায় নাচে প্রথম সম্মতি জানান, যখন আমি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমি এবং ডোভারলেন মিউজিক কনফারেন্স আয়োজিত ট্যালেন্ট সার্চ কন্টেস্ট থেকে প্রশংসাপত্র ও সম্মাননা অর্জন করি৷ আর সেই অর্জনের জন্য আমি আমার মায়ের পাশাপাশি ধন্যবাদ জানাই আমার সকল নৃত্যগুরুকে; যাঁরা সকলেই সমানভাবে আমার পাশে ছিলেন এবং এখনও আমার পাশেই রয়েছেন। 

টাইমটাচ নিউজ : আপনার কাজের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা এবং উৎসাহকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন? 

ফিরদৌসী বসু : আমার কাছে সত্যিই তা পরম ও চরম প্রাপ্তির। এখানে কাজ করে আমি বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি, তা আমার কাছে সত্যিই ভীষণ আহ্লাদের। বাংলাদেশ থেকে আমাকে অনেকেই মেসেজে আমার কাজ সম্পর্কে জানান; তাঁরা আমার কাজকে পছন্দ করেন, তাঁদের আন্তরিকতা আমায় দারুণভাবে আনন্দিত ও অভিভূত করে। বাংলাদেশের বুকে কাজ করার আমার প্রবল ইচ্ছে। বাংলাদেশের কাজের ভক্ত আমি আগাগোড়া। বাংলাদেশে কোনোদিন কাজের সুযোগ পাবার আশা রাখি। 

টাইমটাচ নিউজ : আপনার প্রিয় শখ কী? 

ফিরদৌসী বসু : একশব্দে ‘অভিনয়’। 

টাইমটাচ নিউজ : অভিনয়ের বাইরের কথা যদি বলি, তাহলে অবসর সময়ে আপনার ব্যক্তিগত জীবনকে কীভাবে উপভোগ করতে ভালোবাসেন? 

ফিরদৌসী বসু : অবসরে আমি গান করি, ছবি আঁকি, বিভিন্ন গানের সঙ্গে নাচের কোরিওগ্রাফি ভাবতে থাকি। প্রচুর সিনেমা দেখি, আবার একা একা কোনো রেস্তোরাঁয় খেতে চলে যাই। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসি। 

টাইমটাচ নিউজ : শেষ প্রশ্ন, ফিরদৌসী বসু একদিন নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চায়? 

ফিরদৌসী বসু : তারকা নয়; আমি নিজেকে একদিন আরও বেশি সফল, গুণী এবং শিক্ষিত অভিনেত্রী হিসেবে দেখতে চাই।