Opu Hasnat

আজ ২২ মে বুধবার ২০২৪,

সৎ ও নির্ভীক রাজনীতিবিদ মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল, মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি মতামত

সৎ ও নির্ভীক রাজনীতিবিদ মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল, মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, 
কে বাঁচিতে চায়?
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে,
কে পরিবে পায় ।। (রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়)

শফি কামাল বাদল : ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে, কাপুরুষ ইংরেজ বেনিয়ারা যখন পলায়নপর অর্থাৎ ইংরেজ শাসনের শেষ অধ্যায়; ঠিক সেই সময়ে এদেশে এমন কিছু মানবসন্তানের জন্ম হয়েছিলো যারা জন্মসূত্রেই স্বাধীনতাকামী, মুক্তির নেশায় ছিল অস্থির দুরন্ত। সেই মাস্টার দা সূর্যসেন প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম বসু হয়ে বিনয়-বাদল-দীনেশ এমনি শত শত শহিদের রক্ত-অঞ্জলি বাঙ্গালি মায়েদের মাতৃগর্ভে সূর্যসন্তান ভূমিষ্ঠদানে আকুলি বিকুলি করে তুলেছিলো। তাঁদেরই একজন মির্জা মুকুল। পুরো নাম মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল। 

সময়টা ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ। টালমাটাল অস্থির অবিভক্ত ভারত-উপমহাদেশ। সেই ১৯৩২ সালের ২ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের দিঘুলিয়া গ্রামে জন্ম মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুলের। সে সময়ে টাঙ্গাইল শহরের কর্মকোলাহলে দিনের সূচনা হতো নিকটবর্তী গ্রাম দিঘুলিয়ার জনমানুষের পদচারণায়। ব্যবসা-বানিজ্য, শিল্প, কৃষি সর্বক্ষেত্রে এ গ্রামের পেশাজীবী মানুষদের পদভারে নিরালা মোড়ের ঘুম ভাঙ্গতো। দুরন্ত কিশোর মুকুল সে সময়েই রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠেন। মামা মাহবুবুর রহমান মটু মিয়া রাজনীতি করতেন। মটু মামার সান্নিধ্যে রাজনীতিতে আসেন মির্জা মুকুল। টাঙ্গাইল শহরের বনেদি পরিবারের ব্যবসায়ী মটু মিয়া মাওলানা ভাসানী, শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইয়ার মোহাম্মদ খান প্রমুূখের সঙ্গে রাজনীতি করতেন। সেই সুবাদে মাওলানা ভাসানী, শামসুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ইয়ার মোহাম্মদ খানের সঙ্গে মির্জা মুকুল রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। 

বিন্দুবাসিনী হাই স্কুলে পড়া অবস্থায় ১৩ বছরের বালক স্বাধীনতার প্রথম বীজবপন করেন রাজনীতির জমিনে। মামা মটু মিয়া ছিলেন বিত্ত-বৈভবে রুচিশীল অগ্রগামী। তিনি ভাগিনা মুকুলকে কিনে দেন একটি বাই-সাইকেল এবং একটি চুঙ্গা। সে সময়ে চুঙ্গা ছিল মোক্ষম প্রচারযন্ত্র। সেই চুঙ্গা ফুঁকিয়ে দুরন্ত কিশোর মির্জা মুকুল সাইকেলে চড়ে দাবড়িয়ে বেড়িয়েছেন মাঠে মাঠে, পাড়ায় পাড়ায়, স্কুল থেকে স্কুলে, কর্মীসংগ্রহে- প্রচার-প্রচারণায়। দেশ বিভাগের আগ মুহূর্তে ১৯৪৬ সালে বেঙ্গল কাউন্সিল নির্বাচনে ফরিদপুর-ঢাকা আসনে মুসলিম লীগ প্রার্থী তমিজউদ্দিন খানের পক্ষে এই বিশাল প্রচারণায় অংশ নেন। মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল ১৯৪৮  সালে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হন। সে সময়ে টাঙ্গাইল শহরে বদিউজ্জামান খান, ফজলুর রহমান কায়সার, খোদাবক্স মোক্তার, সৈয়দ আব্দুল মতিন প্রমুখর সঙ্গে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করেন। টাঙ্গাইল শহরের প্রথম শহিদ মিনার তৈরীতে মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুলের ভূমিকা স্মরণীয়। 

১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল দক্ষিণ টাঙ্গাইলের উপ-নির্বাচনে শামসুল হকের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। সে নির্বাচনে মির্জা মুকুল চুঙ্গা ফুঁকিয়ে এবং চাঁদা তুলে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। বিপুল ভোটে জমিদার খুররম খান পন্নীকে হারিয়ে শামসুল হক বিজয়ী হয়েছিলেন। মির্জা মুকুল করটিয়া সরকারি সাদত কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন- একই সঙ্গে ঢাকা থেকে এলএলবি কমপ্লিট করেন। 

১৯৫৩ সালে মির্জা তোফাজ্জল হেসেন মুকুল টাঙ্গাইল মহকুমা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে হক-ভাসানীর পক্ষে নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনে এবং নতুন দলের কার্যক্রমে মির্জা মুকুলের বেশ ভূমিকা ছিল। 

মির্জা মুকল ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ সালে টাঙ্গাইল মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৬৯ সাল থেকে সু-দীর্ঘকাল টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের টানা ৪১ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আমৃত্যু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ছিলেন। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের সংগঠক ছিলেন তিনি। 

মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, আব্দুল মান্নান, শামসুর রহমান খান শাহজাহান, ব্যারিস্টার শওকত আলী খান, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, বদিউজ্জামান খান, সৈয়দ আব্দুল মতিন, ফজলুর রহমান খান ফারুক, আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, বুলবুল খান মাহবুব, রফিক আজাদ, আনোয়ার উল আলম শহীদ প্রমুখের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৫  মার্চ রাতে পাকবাহিনী আক্রমণ করলে সন্তোষের কাগমারী ওয়ারলেসের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে পরদিন ২৬ মার্চ সকালে টাঙ্গাইল শহরের আদালতপাড়ায় এ্যাডভোকেট নুুরুল ইসলামের বাড়িতে সর্বদলীয় বৈঠকের ডাক দেন মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল। এতে টাঙ্গাইল জেলা স্বাধীন বাংলা গণমুক্তি পরিষদ গঠন করা হয়। সেই থেকে  ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণেতাদের অন্যতম ছিলেন মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল । ১৯৭৩ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে টাঙ্গাইল-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। 

রাজনীতি হবে রাজার নীতি- জনমুখী, কল্যাণকামী এবং মানবমুক্তির সোপান। সেই রাজনীতি ধারণ করতেন মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল। তিনি ছিলেন ত্রিকালদর্শী  রাজনৈতিক নেতা একইসঙ্গে কর্মী এবং সংগঠক এবং নেতা এবং জননেতা বললেও অতুক্তি হবে না। সবসময় কর্মী তৈরি, তাদের প্রশিক্ষণ এবং মোটিভেশনাল পলিটিক্যাল ওয়ার্ক নিয়ে মগ্ন থাকতেন এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিছু পেতে নয়, কোনো মোহে নয় আদর্শবাদী এবং জনমুক্তির জন্যই তিনি দেশ মানুষ এবং মানবতার জয়গান গেয়েছেন। সেই কিশোর বয়সেই ব্রিটিশ কাল দেখেছেন, যুবক বয়সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত নিজ দলের পক্ষে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। কোনো দিন আপস করেননি কোনো অপশক্তির সঙ্গে। তাইতো সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগের মহিমায় তিনি সততই মহৎ নির্ভেজাল রাজনীতির প্রতিবিম্ব।      

পেশাগত জীবনে তিনি একজন আইনজীবী ছিলেন। টাঙ্গাইল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের সংকটকালে এবং দলের দুঃসময়ে সম্পূর্ণ বিনা ফিতে নিরীহ কর্মীদের মামলা এবং আইনি সহায়তা করেছেন। তিনি সবসময় নিরন্ন, সাধারণ এবং তৃণমূল কর্মীদের খোঁজখবর রেখে সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতা করতেন। তিনি একজন সেরা ফুটবলার ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল করোনেশন ড্রামাটিক ক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিলাসিতা কখনো তাঁকে ঘেষতে পারেনি। অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী, মৃদুভাষী এবং সাদাসিধে জীবনের অধিকারী একজন মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল আজ খুব বেশি প্রয়োজন। ত্যাগী, সৎ, ঋজু এবং নির্ভেজাল রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সারাজীবন কর্মীনির্ভর রাজনীতি করেছেন। কখনো কিছু পাওয়ার জন্য কিংবা কিছু হওয়ার জন্য নয়, ত্যাগের মহিমায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে এই যে আদর্শের রাজনীতি করে গেছেন এতে তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন। এই মহান দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা ২০২২ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা ২১ শে পদকে ভূষিত হয়েছেন। এই সম্মান জনগণের, এই সম্মান স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের মানুষের। মির্জা তোফাজ্জল হোসেন মুকুল ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

শফি কামাল বাদল, কবি ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা

এই বিভাগের অন্যান্য খবর