Opu Hasnat

আজ ২১ এপ্রিল রবিবার ২০২৪,

আজন্ম আমৃত্যু মানুষের জন্যই গান করে যেতে চাই : মনস্বিতা ঠাকুর বিনোদনসাক্ষাৎকার

আজন্ম আমৃত্যু মানুষের জন্যই গান করে যেতে চাই : মনস্বিতা ঠাকুর

দুই বাংলার নন্দিত সংগীতশিল্পী মনস্বিতা ঠাকুর। সম্প্রতি তিনি মুখোমুখি হয়েছেন বাংলাদেশের পাঠকপ্রিয় ও অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ অনালইন নিউজ পোর্টাল ‘টাইমটাচ নিউজ ডটকম’ এর সঙ্গে। বাংলাদেশ থেকে তার সঙ্গে কথা বলেছেন জনপ্রিয় সাংবাদিক ফয়সাল হাবিব সানি। 

টাইমটাচ নিউজ: কেমন আছেন? সংগীতে আপনার পথচলার গল্পটা সংক্ষেপে শুনতে চাই? 

মনস্বিতা ঠাকুর: ভালো আছি। এইটুকু বলতে পারি যে, কোভিডের দুঃসময়টাকে কাটিয়ে আমরা আবারও পূর্বের ন্যায় সুন্দর একটা জীবনে ফিরে যেতে সমর্থ হচ্ছি। গান নিয়েই সুন্দর সময় পার করছি। আর সংগীতে আমার পথচলার গল্প বলত গেলে বলতে হয়, ছোটবেলা থেকেই আমাদের পরিবারে সাংস্কৃতিক আবহ ছিল আর সংস্কৃতির সেই পরিবেশটা ছিল বিরাজমান ছিল। আর সেই ধারাবাহিকতায়, সংগীতের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা গড়ে ওঠে আমার শৈশব থেকেই। আমি যেই হারমোনিয়ামে তালিম নিতাম, সেইটা আমার ঠাম্মার (দিদু) হারমোনিয়াম। আমার ঠাম্মা (দিদু) গান গাইতেন, পাশাপাশি আমার বাবাও ভীষণ ভালো গান গাইতেন। গণসংগীত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসংগীতেও বিশেষ পারদর্শীতা ছিলেন আমার বাবার। আর আমার বাড়িতে সবসময়-ই রবীন্দ্রসংগীত, লোকসংগীত, বাউল সঙ্গীত, লালন সাঁইজির গান থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঘোরানার গান শোনার ও গান গাওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। এছাড়াও, আমার মা তার ছোটবলোায় নৃত্যচর্চা করতেন। আঁকতেনও বরাবর, আঁকাতেই রয়ে গেছেন। পরবর্তীতে আমি নিজে সংগীত বিষয়েই রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করি এবং আমার ফোক সংগীতের গুরু অভিজিৎ বসুর কাছ থেকে গানে তালিম নিই। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের বাড়িতে সংগীত বা সংস্কৃতিচর্চা ছিল বলেই হয়তো আমি নিজেও একজন শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছি। 

টাইমটাচ নিউজ: রবীন্দ্রসংগীত, ফোক সংগীত সহ সংগীতের বিভিন্ন শাখায় আপনার রয়েছে বিশেষ পারদর্শীতা। কোন ধরণের গান গাইতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? 

মনস্বিতা ঠাকুর: গান করার ক্ষেত্রে আসলে আমার নির্দিষ্ট কোনো সীমাবদ্ধতা নেই; সেইটা রবীন্দ্রসংগীত, ফোক সংগীত যাই হোক না কেন। আমি মনে করি, গানের ক্ষেত্রে শিল্পীদের ছকে বাঁধা কোনো নিয়ম থাকতেও নেই। যে গানগুলো আমি আত্মার সঙ্গে জড়াতে পারি বা যে ধরণের গানগুলোর সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে সেই গানগুলো করতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আর সেইটা রবীন্দ্রসংগীত, ফোক সংগীতের বাইরে নজরুলগীতি হতে পারে, লোকগীতি হতে পারে কিংবা সিনেমার কোনো গানও হতে পারে।  

টাইমটাচ নিউজ: যদি নির্দিষ্ট করে বলি, তাহলে আপনার গাওয়া কোন গানকে আপনার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট মনে করেন? 

মনস্বিতা ঠাকুর: খুবই কঠিন একটা প্রশ্ন! আমার কাছে মনে হয়, প্রত্যেক গানের মুক্তিই একজন শিল্পীর কাছে ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। কেননা প্রত্যেক গানের মুক্তিই শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করে এবং সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আরও বেশি নিবেদিত করে তোলে। তবে অবশ্যই ‘দূরে কোথায় দূরে দূরে’ মিউজিক ভিডিওকে আমার ক্যারিয়ারের স্মৃতিময় কাজ মনে করি আমি। ২০১৭ সালে ‘দূরে কোথায় দূরে দূরে’ রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম মিউজিক ভিডিও বের করি আমি আর ইউটিউবে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম কাজ ছিল এটিই আমার। অন্যদিকে, ‘জি বাংলা'র বহুল আলোচিত সংগীতানুষ্ঠান ‘সা রে গা মা পা’ এর মঞ্চে ২০১৮-১৯ ব্যাচের অংশগ্রহণকারী সংগীতশিল্পী ছিলাম, যা আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। 

টাইমটাচ নিউজ: আপনার গাওয়া কোন গান বা গানগুলো সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে এবং শিগগিরই মুক্তি পেতে পারে কোন গানগুলো? 

মনস্বিতা ঠাকুর: আপনারা অনেকেই জেনে থাকবেন যে, ‘চন্দ্রবিন্দু’ ব্যান্ড আমাদের ভারতের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের নিকট তুমুল জনপ্রিয় ব্যান্ড হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আর ‘চন্দ্রবিন্দু’ ব্যান্ডের বিশেষ Roof কনসার্ট হয় এই ব্যান্ডেরই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য উপল সেনগুপ্ত দাদার বাড়ির ছাদে। আর যেই কনসার্টটিতে আমার লেখা এবং উপল সেনগুপ্ত দাদার সুরে গানটি করেছিলাম সেইটা ছিল ২০২০ সালের কথা। গানটির শিরোনাম ছিল ‘হাওয়ার সাথে গল্প হলো’। গানটি বাংলাদেশের মানুষও ভীষণ পছন্দ করেছে এবং বাংলাদেশেও ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, যা আমার জন্য ছিল বিশেষ প্রাপ্তির। ‘Gaan Taan’ অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেল থেকে গানটি প্রকাশ করাও হয়েছিল। আর যেহেতু আমি কবিতা লিখি, তাই উপল সেনগুপ্ত দাদার অনুপ্রেরণাতেই গানটি লিখেছিলাম আমি। তাছাড়াও, সিনেমার জন্য গান করা হচ্ছে।  সম্প্রতি, ‘হাওয়ার সাথে গল্প হলো’,  গানের পর মুক্তি পেয়েছে ‘আমি তোমার বলে’, ‘চাঁদ সোহাগী মন’, ‘আমার সোনার বাংলা’ শিরোনামের গানগুলো। গানগুলো গেয়ে ব্যক্তিগতভাবে প্রশংসাও পাচ্ছি বেশ আর গানগুলো এরই মধ্যে ব্যাপকভাবে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে দর্শক মহলে। তাছাড়াও, আমি ইতোমধ্যে দেবজ্যোতি মিশ্র এর সংগীত পরিচালনায় ‘জি বাংলা’য় প্রচারিত ‘নেতাজী’ সিরিয়ালের জন্য ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ শিরোনামের গান গেয়েছি এবং ‘কালারস বাংলা’, ‘স্টার জলসা’ তে সংগীত পরিচালক উপালি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় গান গেয়েছি ধারাবাহিকে। অন্যদিকে, ‘দ্য গিফট’ সিনেমার জন্য ‘আমি তোমায়’ শিরোনানের গান গেয়েছি; যা মুক্তি পেয়েছে এবং আরও একটি সিনেমার গান মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। 

টাইমটাচ নিউজ: সংগীতের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ভারত দুই বাংলাতেই পেয়েছেন সুখ্যাতি এবং জনপ্রিয়তা। নিজের দেশ ছাড়াও যখন বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে প্রশংসিত হতে থাকেন, সেই অনুভূতির পাল্লাটা নিজের কাছে কতটুকু? 

মনস্বিতা ঠাকুর: সত্যিই সেই অনুভূতি অত্যন্ত আনন্দের, সম্মানের। আমি জানি না সেই অনুভূতির ভার আমি বহন করে চলতে পারব কি-না। তবে সেই অনুভূতির পাল্লাটাকে কোনো মাপকাঠিতেই পরিমাপ করা আমার পক্ষে  সম্ভব নয়। আমি আজন্ম ঋণী এবং কৃতজ্ঞ থাকতে চাই ওপার বাংলার (বাংলাদেশ) মানুষের কাছেও। 

টাইমটাচ নিউজ: সংগীতশিল্পী না হলে মনস্বিতা ঠাকুর জীবনে কী হতে চাইতেন? 

মনস্বিতা ঠাকুর: ছোটবেলা থেকেই আমার রয়েছে সাংঘাতিক পশুপ্রেম। আমার আয়ের সিংহভাগও বিভিন্ন অবলা পশুর সংস্থান, আবাসস্থল এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের পেছনে ব্যয় করি আমি। আর সংগীতশিল্পীর বাইরে আমার প্রথম পছন্দের তালিকায় ছিল সাঁতারু হওয়ার ব্যাপারটা। তাই সংগীতশিল্পী না হলে হয়তো সাঁতারু হতাম। নয়তো পশুদের জন্য বৃহৎ পরিসের আরও কিছু করার চিন্তা-ভাবনা করতাম এবং সর্বোপরি দেশপ্রেমিক আছি এবং একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক-ই হতে চাইতাম। 

টাইমটাচ নিউজ: সংগীতের পাশাপাশি আর কিছু করা হচ্ছে নাকি? 

মনস্বিতা ঠাকুর: সংগীতের পাশাপাশি সাইক্লিং, বাইকিং করতে ভালোবাসি, ভ্রমণ  করতে ভালোবাসি, পাহাড়ের প্রতি ভীষণ রকম দুর্বলতা রয়েছে আমার। তাছাড়াও, ‘অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টস' ভীষণভাবে টানে আমায়। সংগীতের পাশাপাশি এগুলো করতেই খুব ভালোবাসি। সাংক্লিং করতেও রয়েছে আমার দারুণ আগ্রহ। 

টাইমটাচ নিউজ: আপনার প্রিয় শখ সম্পর্কে যদি বলতেন? 

মনস্বিতা ঠাকুর: আমার প্রিয় শখের কোনো শেষ নেই। অবসর সময়ে গান শুনতে ভালোবাসি, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে ভালোবাসি, পশু-পাখিদের ভালোবাসতে ভালোবাসি, সাঁতার কাটতে ভালোবাসি, ঘুড়ি ওড়াতে ভালোবাসি, নিজের পরিবারের সঙ্গে সময়টাকে দারুণভাবে উপভোগ করতে পছন্দ করি। 

টাইমটাচ নিউজ: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলা সংগীত এরই মধ্যে নিজস্ব একটা আসন গড়ে নিয়েছে। আপনাদের হাত ধরেই বাংলা সংগীত একদিন কোথায় পৌঁছাতে সমর্থ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন? 

মনস্বিতা ঠাকুর: অবশ্যই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা সংগীত উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি অর্জন করছে। আমি নির্দ্বিধায় আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি যে, বাংলা সংগীত একদিন পৃথবীর নানান দেশের মানুষের কাছে আরও বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং তাদের সবটুকু আবেগ, অনুভূতির সংগীতে পরিণত হতে পারবে বলে আমার ব্যক্তিগত অভিমত। 

টাইমটাচ নিউজ: সংগীত নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলুন? 

মনস্বিতা ঠাকুর: আমি এখনও নিজেকে তেমন কিছু মনে করি না যে, আমি হুট করেই বড় কোনো প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করব। তবে ছোট ছোট মিউজিক ডিরেকশনও দিয়েছি আমি৷ হয়তো ভবিষ্যতে বড় কোনো প্রজেক্টগুলোতে মিউজিক ডিরেক্টর হিসেবে নিজের নামটাকে স্বীয় মহিমায় সকলের সামনে মেলে ধরতে চাইব। মিউজিক কম্পোজার হিসেবেও কাজ করতে চাই। সবমিলিয়ে, আমি শিখছি এখনও এবং শেখার ক্ষেত্রটা যখন আরও বেশি বৃহৎ পরিসরের হয়ে উঠবে, তখন সংগীত নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রটাও আপনাআপনিই তৈরি হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয়। 

টাইমটাচ নিউজ: শিল্প আর সংগীত তো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে সম্পর্কিত। শিল্পের সঙ্গে সংগীতের এই মেলবন্ধনকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

মনস্বিতা ঠাকুর: শিল্পের সঙ্গে সংগীতের মেলবন্ধনকে মূল্যায়িত করতে নিঃসংকোচেই বলতে পারি, শিল্প আর সংগীত বিষয় দুটি একে অন্যের পরিপূরক। আর তাদের মধ্যকার সম্পর্ক চিরন্তন, অবিনশ্বর ও অপরিহার্য বইকি। 

টাইমটাচ নিউজ: আপনি ইতোমধ্যেই একজন সফল সংগীতশিল্পী। ভবিষ্যতে নিজেকে আরও কোন অনন্য উচ্চতায় দেখতে চান? 

মনস্বিতা ঠাকুর: আমি এখনও নিজেকে নিজেই সফল সংগীতশিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারছি না। তবে মানুষের জন্য গান করছি এবং আজন্ম আমৃত্যু এভাবে মানুষের জন্যই গান করে যেতে চাই। তবে অবশ্য সংগীতে এমন কিছু করে যেতে চাই যাতে করে আমার মৃত্যুর পরও মানুষ সংগীতে অবদানের জন্যই আমায় মনে রাখবে এবং আমার গানগুলো যুগ যুগান্তর ধরে তাদের অনুভূতিকে নাড়া দিতে থাকবে। 

ছবি: সংগৃহীত