Opu Hasnat

আজ ২৩ জুন বুধবার ২০২১,

অসহায় বীরঙ্গনাকে ঘর দিয়ে ভূয়সী প্রশংসায় ভাসছেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার ফরিদপুর

অসহায় বীরঙ্গনাকে ঘর দিয়ে ভূয়সী প্রশংসায় ভাসছেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার

ফরিদপুরে অসংখ্য ভালো ভালো কাজ করায় ফরিদপুরের সুপার হিরো বলা হয়ে থাকে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মোঃ আলীমুজ্জামানকে। নিজেদের বেতন থেকে অসহায়দের খাদ্য, রক্ত দিয়ে জীবন বাঁচানো, করোনা সময়ে মাস্ক বিতরণ ও সচেতনতায় মাঠে থেকে কাজ করা, রোজাদারদের জন্য ইফতার ও সেহেরীর ব্যবস্থা, শীর্তাতদের জন্য শীতবস্ত্র, ফরিদপুরের আইন শৃংখলা ব্যবস্থা শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ, অসহায়দের জন্য উন্মুক্ত দ্বার, সন্ত্রাসী ও মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান, সেবা গ্রহীতাদের সর্বোচ্চ সেবা প্রদানের ব্যবস্থা থানা গুলোতেসহ নানা কাজে তিনি ফরিদপুরের মানুষের মনের কোঠায় স্থান করে নিয়েছেন।

এরই ভিতর খবর পান মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে নিহত হন চারু বালার স্বামী চন্দ্রকান্ত বিশ্বাস। এরপর সন্তান ও সম্ভ্রম হারানো অশীতিপর সেই বৃদ্ধা চারু বালার বসবাসের কোন ঘর নেই। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই পুলিশের নিজ বেতন থেকে একটি সেমিপাকা টিনের ঘর করার ব্যবস্থা গ্রহন করেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামান। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে শহরের টেপাখোলা বাজারে শাক সবজি বিক্রি করে কোনো রকম দিন যাপন করে আসছিলেন এই নারী। তার থাকার মতো কনো ঘর নেই। বিষয়টি জেলার শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির মাধ্যমে জানেন পুলিশ সুপার।

এদিকে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে জীর্ণ শীর্ণ ঘরে থাকা বীরঙ্গনা নারী চারু বালাকে ঘর দেওয়ায় ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ফরিদপুরবাসী। তারা পুলিশ সুপারের মহতি এই উদ্যোগকে এক অনন্য নজীর হিসেবে তুলনা করেছেন।

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার গাজিরটেক ইউনিয়নের পদ্মা নদী বেষ্টিত দুর্গমচরাঞ্চলর মেশবালা গ্রামে নির্মিত ওই ঘরটি রোববার (২ মে) বিকেল ৩টার দিকে তার হাতে হস্তান্তর করেন ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন।

ঘর হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার আলিমুজ্জামানের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এই করোনাকালে পুলিশ সদস্যদের বেতনের টাকা থেকে এমন একজন মানুষকে ঘর করে দেয়া হলো। তিনি চারু বালাকে নগদ এক লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন এই সময়।

চারু বালা বলেন, ৫০ বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় একদিন আমার স্বামী চন্দ্রচরণ বিশ্বাসকে গুলি করে মারে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা। আমার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে দুই বছরের শিশু পার্বতীকে উঠানের ওপর আছড়ে মেরে ফেলে। পরে আমাকে নির্যাতন করে ও সম্ভ্রম হানি ঘটায়। সেই দিনের সেই করুণ দৃশ্য আমি কোনো দিনও ভুলতে পারবনা। তিনি এই সময় মহান মানুষ হিসেবে তুলনা করে ফরিদপুরের পুলিশ সুপারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে স্বামী ও শিশু সন্তান হারিয়ে চারু বালা পদ্মানদী থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে দুর্গম বালুচর ও ফসলি মাঠের জমির মধ্যে ভাই সিদ্ধিচরণ সরকারের আশ্রয়ে তার বসত ভিটের উত্তর পাশে ছনবন ও পাটখড়ি দিয়ে গড়া একটি ভাঙা ঘরে থাকতেন।

ফরিদপুর জেলা শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি শেখ সাজ্জাদুল হক সাজ্জাত বলেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হায়েনারা চারু বালার স্বামী ও শিশু সন্তানকে মেরে ফেলে। তার সম্ভ্রমহানি করে ও বাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার পর ওই দুর্গমচরাঞ্চলে বীরাঙ্গনা চারু বালা অসহায় অবস্থায় একা একা ৫০টি বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। আমরা তাকে খুঁজে বের করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

পুলিশসুপার মোঃ আলীমুজ্জামান বলেন, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বীরাঙ্গনা মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পেরে আমি ও আমার সহকর্মীরা গর্বিত। ভবিষ্যতে তার সহায়তার জন্য যা যা করা দরকার তাই করা হবে পুলিশের পক্ষ থেকে। তিনি বলেন, আমি যখন জেলা শহীদ স্মৃতি সংরক্ষণ কমিটির কাছ থেকে শুনতে পাই তার কোন ঘর নেই। তখনই ওই উপজেলার ওসিকে দিয়ে তার বাড়িতে খাবার এবং টাকা পাঠাই। এরপর সিদ্ধান্ত নিই তার একটি থাকার ঘর করে দিব। পরে আমাদের পুলিশ সদস্যদের বেতনের টাকা থেকে একটি সেমিপাকা ঘর করে দিই। তিনি বলেন শহীদ পরিবারের সদস্য এবং বীরাঙ্গনা অসহায় পরিবারের জন্য পুলিশের দ্বার সব সময় খোলা থাকবে।  

এদিকে সম্প্রতি ১৯৭১ সালে যুদ্ধে স্বামী, সন্তান ও সম্ভ্রম হারানো চারু বালার বীরাঙ্গনা স্বীকৃতির জন্য ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছেন মন্ত্রণালয়ে বলে জানা গেছে জেলা প্রশাসন সূত্রে।