Opu Hasnat

আজ ৫ আগস্ট বৃহস্পতিবার ২০২১,

ব্রেকিং নিউজ

বিশ্বের কোটি হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু মতামত

বিশ্বের কোটি হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু

মোহাম্মদ সাব্বির রহমান : দিনটি ছিলো বুধবার, ১৭ মার্চ ১৯২০।  সেদিন গোপালঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বাংলার স্বাধীন রক্তিম সূর্যের উদয় ঘটেছিল। বলছি, বাংলার স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বাংলার আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র খোকা বাবুর জন্ম না হলে বিশ্বের মানচিত্রে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেতাম না।  বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক অন্নদাশঙ্কর রায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি-সংগ্রামের মহানায়ক, বাংলাদেশের স্থপতি ও প্রথম রাষ্ট্রপতি, ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বিশ্বনন্দিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে যথার্থই বলেছিলেন- ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান। /দিকে দিকে আজ অশ্রুমালা রক্তগঙ্গা বহমান/তবু নাই ভয় হবে হবে জয়, জয় মুজিবুর রহমান।’ 

বঙ্গবন্ধু স্কুলজীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে গিয়েছিলেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেখানে বঙ্গবন্ধু বলিষ্ঠ কণ্ঠে স্কুলের সব দুর্দশার চিত্র তাদের কাছে বর্ণনা করেন। মিশনারি স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন শেখ মুজিব। পরে ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৪৯ সালে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহিষ্কার করা হয়।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সমাবর্তনে ঘোষণা দেন- ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। সুউচ্চ কণ্ঠে ছাত্র-ছাত্রীরা না না বলে সেই কথার বিরোধিতা করেন। সেই থেকে শুরু হয় বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার সংগ্রাম। পরবর্তী সময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা স্বীকৃতির দাবিতে সাধারণ ধর্মঘট চলাকালীন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় আবারও গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু। ১৯৬৬ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ দফা ঘোষণা করেন। বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬ দফা আন্দোলনে দেশব্যাপী উত্তাল হয়ে পড়ে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভার মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন। ওই বছরের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানকে ‘বাংলাদেশ’ নামে ভূষিত করেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুই বাঙালির স্বাধীনতার মহানায়ক। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসভায় ১৮ মিনিটের ভাষণে ‘‘এবারের সংগ্রাম মুক্তি সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’’ ঘোষণা দিয়ে সচেতন সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে রণক্ষেত্রে নামার উৎসাহ দেন বঙ্গবন্ধু।  জ্বালাময়ী সেই ভাষণ আজও হৃদয়ে ধারণ করছে বাঙালি। ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান কারাগারে বন্দি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। নিরস্ত্র, নিরীহ বাঙালির ওপর বর্বরতা চালায় পাক-হানাদাররা। বাংলাদেশ পুলিশের সূর্য সন্তানেরা ২৫ মার্চ রাতে সর্ব প্রথম পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান ও প্রথম বুটেলটি নিক্ষেপ করেন। পাকিস্থান বাহিনীর নিক্ষেপিত প্রথম বুলেট টির আঘাতে বাংলাদেশ পুলিশের একজন গর্বিত সূর্য সন্তান শহীদ হন। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলার আকাশে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা। অর্জিত হয় স্বাধীন ভূখণ্ড। 

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু। স্বপ্ন দেখেন সোনার বাংলাকে সাজাবেন মনের মতো করে। বিশ্বের দরবারে এক অনন্য মর্যাদায় থাকবে সোনার বাংলাদেশ। কিন্তু স্বপ্ন সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায় একরাতে।  স্বাধীন ভূখণ্ডে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে সপরিবারে তিনি নিহত হন। জীবনের পুরোটা সময় দেশ ও জাতির কল্যাণে লড়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ছিলেন বিশ্বের মানবতাবাদী ও শান্তিকামী মানুষের আদর্শ। দেশকে ভালোবাসতে হবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে হবে এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্যতম দর্শন। অধিকার আদায়ে আন্দোলন সংগ্রাম করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সমগ্র জীবনের ১৪টি বছর জেলের মধ্যেই কেটে গেছে।  ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের এ প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি আমার দেশের মানুষকে ভালোবাসী।’ প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু আমাদের অনুভূতি ও অন্তরাত্মায় মিশে আছেন। শেখ মুজিব মানেই লাল সবুজের বাংলাদেশ। শেখ মুজিব মানেই বাঙালির অবিরাম মুক্তির সংগ্রাম।  শেখ মুজিব মানেই সাম্য-অধিকার-গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। শেখ মুজিব মানেই দেশের জনগণের প্রতি মানুষের প্রতি ভালোবাসা। শেখ মুজিব মানেই নিজ নিজ ধর্ম পালনের স্বাধীনতা। শেখ মুজিব মানেই তো স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রাষ্ট্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় বিশ্বনেতা। বিশ্বমানবতা, স্বাধীনতা, বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও নির্যাতিত মানুষের মুক্তির সংগ্রামে যেমন মহাত্মা গান্ধী, মাঙ সেতুং, হো চি মিন, ফিদেল কাস্ত্রো, নেলসন ম্যান্ডেলা অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। বিশ্বের বিরল নেতৃত্ব, বিশ্ব নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবও তেমনি বিশ্বের কোটি হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। বিশ্বখ্যাত কিউবার সংগ্রামী নেতা ফিদেল ক্যাস্ত্রো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেখে বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, হিমালয়সম মুজিবুর রহমানকে দেখলাম।  তাইতো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে শুধু বাংলাদেশেই নয়; ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিকভাবে ‘মুজিব জন্মশতবার্ষিকী’ উদযাপিত হচ্ছে।  

এটাই সত্য যে, বিরল নেতৃত্ব, বিশ্বনেতা বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না।  সমগ্র বাঙালি জাতি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পেত না।  বঙ্গবন্ধু শুধু একটি স্বাধীন দেশ দিয়ে যাননি, বাংলাদেশ বিশ্বে দরবারে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন সে ব্যবস্থাও করে দিয়েছেন। ঘাতকরা হয়নি সফল; তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর। নেতৃত্বের উচ্চতায় ও চরিত্রের দৃঢ়তায় রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আর কারও তুলনা করা যায় না।  জাতির জনকের প্রতি আমাদের ঋণ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা অশেষ। মুজিব চেতনায় জাগ্রত, হৃদয়ে স্পন্দিত, মুজিব মরেনি; মরতে পারে না; মুজিব জন্মশতবর্ষে শেখ মুজিব শতকোটি গুণ শক্তিশালী।  বঙ্গবন্ধুই বাঙালির ইতিহাস, সমগ্র বাঙালি জাতি তার কাছে চিরঋণী। হাজারও গুণে গুণান্বিত আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘সোনার বাংলা গড়তে চাইলে সোনার মানুষের দরকার। তাহলেই সোনার বাংলা গড়তে পারব। বঙ্গবন্ধুর এ কথার প্রয়োজনীয়তা ২০২১ সালে মুজিব শতবর্ষে আরও বেশি প্রযোজ্য- সোনার বাংলা গড়তে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ হৃদয়ে ধারণ করে সোনার মানুষ হতে হবে।  

লেখক : অফিসার ইনচার্জ, নানিয়ারচর থানা, রাঙ্গামাটি।