Opu Hasnat

আজ ২০ মে শুক্রবার ২০২২,

‘বঙ্গালী ভইলী’ উপন্যাস পর্যালোচনা শিল্প ও সাহিত্য

‘বঙ্গালী ভইলী’ উপন্যাস পর্যালোচনা

সৈয়দা রুখসানা জামান শানু : সাহিত্য জগতে মোখলেস মুকুল উজ্জ্বল তারকা। বুদ্ধি বৃত্তিক, উদ্ভাবনী এবং অসম্ভব প্রতিভাবান একজন লেখক। কৌতূহলোদ্দীপক প্লট, ক্লাসিক্যাল থিম আর পান্ডিত্যপূর্ণ সব চরিত্র... পছন্দ না করে উপায় আছে?” হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা প্রসিদ্ধাচার্যদের অনেকেই ছিলেন বাংলার অধিবাসী। শবরপা, কুক্কুরিপা ও ভুসুকুপা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। যে সকল ভাষা তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যচর্যার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ককে প্রমাণ করে চর্যাপদের ভাষা বাংলা কি-না সে বিষয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল পরবর্তীকালে যার অবসান হয়েছে। এটি সৃজ্যমান বাংলা ভাষার একটি গুরুত্বপূর্ণ  নিদর্শন। চর্যাপদের রচয়িতা বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ সংস্কৃতে পারদর্শী হলেও তাঁরা তৎকালীন অপরিণত বাংলাতেই পদগুলি রচনা করেছিলেন। চর্যাপদের ভাষা বাংলা ভাষার অদ্যাবধি আবিষ্কৃত আদিতম রূপ।

বইয়ের শিরোনাম: বঙ্গালী ভইলী।
লেখক : মোখলেস মুকুল।
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি-২০২১।
প্রকাশনাসংস্থা : বটেশ্বর বর্ণন।
পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৩৭৬।
অধ্যায় : চারটি ।
ধরণ : ভাষা সাহিত্য অর্থাৎ ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস।
মূল্য : ৭০০ টাকা।
প্রাপ্তিস্থান : বটেশ্বর বর্ণন, ১৬৬-১৬৭, শহিদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম সরণি, বিজয় নগর, ঢাকা।
ফোন : ০২-৯৫১৫৪৯৫।

লেখক পরিচিতি : কথা সাহিত্যিক মোখলেস মুকুল চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর। লেখাপড়া শেষ করে পুরোপুরিভাবে রোগির সেবা যত্ন নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যের প্রতি আবেগময় ছিলেন তিনি। তাই পেশা চিকিৎসা হলেও নেশা তাঁর সাহিত্য চর্চা। সময় পেলেই রোগি দেখার পাশাপাশি গল্প কবিতা উপন্যাস লিখে ফেলেন। কথা সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক ও কবি মোখলেস মুকুল’র জন্ম ৭’ নভেম্বর ১৯৬৪ সালে পাবনা জেলা শহরের ভাড়ারা মহল্লায়। কিন্তু তিনি বসবাস করেন পাবনা জেলা শহরে শালগাড়িয়া’র মীর বাড়ীতে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ : গল্প গ্রন্থ ‘চাকা’, কাঁকড়া তাল; কাব্যগ্রন্থ ‘শূন্য’; উপন্যাস: ‘মৃন্ময় বৃক্ষ’, চর্যাপদ ও অত:পর করোনা।

উপন্যাস সম্পর্কে আমার একান্ত ব্যাখ্যায় বলতে পারি----------
উপন্যাসটি শুরু হয় একটি কিশোর বালকের দুষ্টমির ছলে দেয়ালে বসে প্রস্রাব করার ঘটনা দিয়ে। বঙ্গালী ভইলী উপন্যাসের প্রত্যেকটি চারিত্রিক মেজাজ সেই মধ্যযুগীয় শতাব্দীর আদলে চমৎকারভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। ভাষার মালা গাঁথা অর্থাৎ শব্দ নির্বাচন এবং বাক্য গঠনের গতি নিরন্তর সেই পুরোনো শতাব্দী জুড়ে। বাংলা ভাষার আদি অর্থাৎ স্পট লাইটে উপন্যাসিক অতিযত্নে এবং সুনিপুণভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন পরিচয়ে বলিয়ান করেছেন। সাগর্ভে আধুনিক ভাষার কাছে ভাষার প্রাণশক্তিকে অত্যন্ত প্রাজ্ঞতায় শুরু থেকে শেষ করেছেন। ৩৭৬ পৃষ্ঠাব্যাপি উপন্যাস লিখতে লেখক গল্প নির্বাচন, শব্দ এবং বাক্য গঠন অতিযত্ন এবং দক্ষতার সাথে করেছেন। বর্তমান মূল ধারার কথা সাহিত্যিকগণের চর্যাপদের উপর লেখা গ্রন্থ নিত্যান্তই কম নয়। তা সত্তেও চমৎকার এ উপন্যাসটি ব্যতিক্রম এবং উপস্থাপনায় ভিন্নতা রয়েছে। লেখক অত্যন্ত দায়িত্ব এবং দরদ দিয়ে মধ্যযুগীয় সাহিত্যের জগতে দক্ষতার সাথে প্রবেশ করেছেন। এক কথায় বলা যায় ভাষা চর্চা বিকাশের একটি উপন্যাস। পাঠক যদি এ উপন্যাসটি পঠন করেন তবে তিনি ভাষার প্রাজ্ঞতায় পৌছাতে পারবেন এবং লেখক যদি এ উপন্যাসটি পড়েন তবে তিনি তার লেখিয়ে শক্তির অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস।

সাহিত্য একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ উপন্যাসে যেমন সাহিত্য রস রয়েছে, তেমনি সুখপাঠ্য ও ভাষা গবেষণা লব্দ। যতোদিন পৃথিবীতে বাংলাভাষা ও সাহিত্য বেঁচে থাকবে ততোদিন লেখক এবং পাঠককে সংস্কৃত, লৌকিক, আদিম, চর্যাপদ যেটাই বলিনা কেনো বাংলা ভাষার সাথে বোঝা পড়া করে চলতে হবে। তথা ‘বঙ্গালী ভইলী’ উপন্যাসকে মর্যাদার আসনে অধীন করতে হবে। মূলত: বাংলা ভাষা চর্যাগৃহ নিয়ে যদি কেউ আদি প্রান্তরে না যেতে পারলেও মোখলেস মুকুল রচিত ভাষার ইতিহাস সম্বলিত ‘বঙ্গালী ভইলী’ উপন্যাসটি পাঠক অথবা লেখক পড়লে ভাষার সংস্কৃত এবং চর্যাপদের রুপটি পরিস্কার ভাবে অবগত হতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। নতুন প্রজন্ম যারা কলম হাতে ধরেছেন এবং লিখে চলেছেন তারা নিশ্চয় ভাষা গবেষণা করবেন আর তখনই ভাষার আদিম শব্দগুলো পূণরায় জীবিত হবে। এক প্রজন্ম হতে অন্য প্রজন্মে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসার ছড়িয়ে যাবে। আমি পাঠে মুগ্ধ হয়েছি প্রতিটি শব্দের অর্থময় ব্যবহারে। এছাড়াও ভাষার ইতিহাস নির্ভর এ উপন্যাসে লেখক যেমন প্রত্যেকটি শব্দ নির্বাচনে, চরিত্রের নাম ও মেজাজ নির্মাণে আধুনিক ভাষার রুপ ব্যবহার করেননি। তা সত্বেও বর্ণনায় যথেষ্ট নান্দনিকতা রেখেছেন। ঠিক তেমনি উপন্যাসের নাম করণ “বঙ্গালী ভইলী’’ নিবার্চন করে যথার্থই ভাষার প্রাণশক্তিকে এক নামেই বোঝাতে সক্ষমতা অর্জন করেছেন।

লেখক পরিচিতি : গবেষক, সম্পাদক- প্রকাশক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ, কথা সাহিত্যিক, শিশু সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কবি।