Opu Hasnat

আজ ১৭ এপ্রিল শনিবার ২০২১,

নারী পেঁয়াজ চাষী শাহিদা বেগম এর কোটি টাকা লাভের গল্প কৃষি সংবাদফরিদপুর

নারী পেঁয়াজ চাষী শাহিদা বেগম এর কোটি টাকা লাভের গল্প

গত ১৮ বছর ধরে পেঁয়াজের বীজ চাষ করছেন দেশ সেরা নারী কৃষক ফরিদপুরের সদর উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের পেঁয়াজ চাষী শাহিদা বেগম। পেঁয়াজের বীজ চাষ করে আত্মনির্ভরশীল শুধু নয় বরং অনন্য উদাহরণ স্থাপন করেছেন বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার শাহিদা বেগম। দেশের মোট চাহিদার পেঁয়াজ বীজের ৪ভাগের ১ভাগ বীজ থেকে আসে তার উৎপাদিত খান বীজ থেকে। গত বছর তার চাষ করা দুইশত মন পেঁয়াজ বীজ বিক্রি করে পেয়েছেন ৪কোটি টাকা। এরই মাঝে তিনি এবছর সেরা নারী কৃষক হিসেবে পেয়েছেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড চ্যানেল আই এগ্রো অ্যাওর্য়াড। এছাড়াও তিনি ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারন বিএডিসির চুক্তিবদ্ধ কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ বীজ চাষ করে পেয়েছেন বহু পুরুস্কার।  

শাহিদা বেগম গত ১৮-১৯ বছর ধরে পেঁয়াজের বীজের আবাদ করে চলেছেন। আর চলতি বছর প্রায় ২০০ মণ পেঁয়াজের বীজ বিক্রি করেছেন তিনি। মৌসুমে এই বীজ মণ প্রতি ২ লাখ টাকা করে বিক্রি করেছেন। জানাগেছে, চলতি মৌসুমে পেঁয়াজের বীজ বিক্রি হয়েছে ৫-৬ হাজার টাকা কেজি দরে। এ বছর এরই মধ্যে বীজ উৎপাদনের জন্য যে পেঁয়াজ লাগানো হয়েছিলো তার ফলন আসবে আগামী এপ্রিল-মে মাসে।

শাহিদা বেগম বলেন, কৃষক পরিবারের বউ হওয়ার কারণে আগে থেকেই নানা কৃষিকাজের সাথে পরিচয় ছিল তার। তার শ্বশুর মূলত পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু কখনোই আসলে বেশি পরিসরে চাষ করা হয়নি। তিনি নিজেও অনেকটা শখের বশেই এই চাষ শুরু করেন। আশপাশের কেউ কেউ খুব কম করে পেঁয়াজের বীজ চাষ করতো। আমারো মনে হলো আমি করে দেখি, তাই করলাম। তিনি বলেন ২০০৪ সালে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের আগে ২০ শতক জমিতে পেঁয়াজের বীজ চাষ করেন তিনি। সে বছর মাত্র দুই মন বীজ উৎপাদিত হয়েছিল। সেগুলো বিক্রি করে পেয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা। পরের বছর আরো বেশি পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজের চাষ করতে শুরু করেন তিনি। সেবছর পান ১৩ মণ বীজ। তবে তার যাত্রা সহজ ছিলো সেইও বিষয়টি তিনি বলেন অবলীলায়। 

বীজ বিক্রি করে দেখলাম যে আমি ভালই লাভবান। পরের বছর আরো জমি বাড়াই। ৩২ মণ বীজ উঠলো। এভাবেই আমার ওঠা।" এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি সাহেদাকে। গত বছর ৩০ একর জমিতে পেঁয়াজের বীজের চাষ করেছিলেন। ঘরে তুলেছিলেন ২০০ মন বীজ। আর এবার করেছেন মোট ৩৫ একরে উপরে জমিতে পেঁয়াজ বীজের চাষ। "অনেক শ্রম দিতে হয়, কষ্ট করতে হয়। পেঁয়াজের বীজের অনেক যত্ন করতে হয়। তবে তার এই যাত্রা সহজ ছিলো সেইও বিষয়টি তিনি বলেন অবলীলায়। 

ফরিদপুর জেলার স্থানীয় কৃষক তো বটেই, পুরো বাংলাদেশে তারা বীজ সরবরাহ করে থাকেন তিনি। "আমাদের বীজ ভাল বলে চাহিদা থাকে। কৃষকরা অনেক খুশি। কারণ এর মধ্যে কোন ঝামেলা নাই। নিজের প্রোডাক্ট, কোন ভেজাল নাই। 

শাহিদা বেগমের পেঁয়াজের বীজ উৎপাদনের কাজে সহায়তা করেন তার স্বামী বক্তার উদ্দিন খানও। যিনি পেশায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা, তিনি চাকুরী করেন সোনালী ব্যাংকে। সাহিদা বেগম নিজেই গড়ে তুলেছেন পেঁয়াজের বীজের কারখানা। সেখান থেকেই বীজ প্যাকেটজাত করা এবং ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করা হয়। তার তৈরি করা বীজ ক্রেতাদের কাছে পরিচিত “খান বীজ” নামে। 

তার উৎপাদিত পেঁয়াজ বীজ হলো তাহেরপুরী, সুখ সাগর, নাসিক কিং, বারী-১, বারী-৪, বারী-৫ জাতের পেঁয়াজের বীজ। 

এলাকার কৃষক আলমাছ সেখ বলেন, আমরা আগে অন্য ফসল চাষ করতাম এখন পেঁয়াজ বীজ চাষ করি। এর কারন হিসেবে তিনি বলেন শাহেদা বেগম যেভাবে এলাকায় পেঁয়াজ চাষ করছেন সেটা দেখে উদ্বুদ্ধ হয়েই আমাদের এই চাষে আসা। এখন ভালো লাভ পাচ্ছি দিনকে দিন আমারও চাষের এলাকা বাড়ছে। 

অন্য এক কৃষক সুমন জোমাদ্দার বলেন, শাহেদা বেগম শুধু পরিবর্তন করেন নি। পেঁয়াজ চাষে তার সফলতা স্বর্না অক্ষরে লেখা থাকবে দেশে। আমরা তার দেখাদেখি এখন অধিক পরিমান জমিতে পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ বীজের চাষ শুরু করেছি। আগে ছিলো টিনের ঘর এখন আমার বাড়িতে বিল্ডিং হয়েছে। এভাবে যদি পেঁয়াজ বীজের চাষ করতে পারি আমরা তাহলে সামনের দিনে পেঁয়াজের কোন খাটতি থাকবে না দেশে।  

মানিকগঞ্জ থেকে আসা বীজ ব্যবসায়ী রইচ মেম্বার জানান, আমি এই বীজের ব্যবসা করছি অনেক বছর। এই ফরিদপুর থেকেই বীজ কিনে নিয়ে ব্যবসা করতাম। তখন এমন বিপ্লব দেখিনি। তিনি বলেন শাহেদা বেগম বীজ চাষে আসার পর থেকে এই চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। তিনি বলেন সারা দেশে তার মতো এতবড় পেঁয়াজ বীজ চাষী নেই। যে কিনা একাই চাষ করে এক’শ থেকে দেড়শো বিঘা জমিতে পেঁয়াজ বীজের চাষ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি পেঁয়াজ বীজ চাষ করতে। সেখানে সর্বোচ্চ একজন কৃষক চাষ করে দশ বিঘা বা বিশ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ। কিন্তু একজন নারী পেঁয়াজ বীজ চাষী এক’শ থেকে দেড়শো বিঘা জমিতে পেঁয়াজ বীজের চাষ যা সারাদেশ তো বটেই সারা বিশ্বের কোথাও নেই। তিনি আমাদের গর্ব। সামনের দিনে এই শাহেদা বেগমের ভূমিকার কারনেই পেঁয়াজের যে খাটতি রয়েছে দেশে তা দূর হবে বলে আমি মনে করি। 

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো: হজরত আলী জানান, সত্যি বলছি পেঁয়াজ ও পেঁয়াজ বীজের চাষে সাহেদা বেগম একটি নাম নয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে দাড়িয়েছে দেশে। তার পেঁয়াজ ও বীজের কারনে সামনের দিনে দেশে পেঁয়াজের যে খাটতি রয়েছে তা আর থাকবে না বলে মনে করা হচ্ছে। আর এই কারনে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর পেঁয়াজ বীজ আবাদে মাঠ পর্যায়ে শাহিদা বেগম সহ সকল কৃষকদের সকল ধরনের সহযোগীতা দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন সাহেদা বেগমের পেঁয়াজ বীজের মান অনেক ভালো। বাংলাদেশে পেঁয়াজ বীজের যে খাটতি ছিলো এই সব চাষীদের কারনে বিদেশ থেকে আর পেঁয়াজ বীজ আমাদের আনতে হচ্ছে না।   

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, ফরিদপুরের সদর উপজেলাধীন অম্বিকাপুরের গোবিন্দপুর গ্রামের পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনে অসামান্য সাফল্য অর্জনকারী নারী উদ্যোক্তা শাহিদা বেগম এর কৃষি খামার। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রবর্তিত কৃষি প্রণোদনার ওপর ভর করে এ ধরনের লক্ষ লক্ষ শাহিদার অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলেছে আজকের বাংলাদেশ। সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন বাংলাদেশ বিদেশ হতে পেঁয়াজ আমদানি করার পরিবর্তে পেঁয়াজ রপ্তানি করতে শুরু করবে। পেঁয়াজ উৎপাদনেও স্বনির্ভর হবে প্রিয় স্বদেশ। তিনি বলেন শাহিদা বেগম এর পেঁয়াজ বীজ সারাদেশের পেঁয়াজ চাষে যে ভূমিকা রাখছে তা একটি জেলার জন্য গর্বের।   

উল্লেখ্য, ফরিদপুর জেলায় এবছর ১ হাজার ৭শ ১১ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজ আবাদ করা হয়েছে। যা থেকে ১ হাজার ২৬ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদিত হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা। যার মধ্যে দেশের মোট চাহিদার পেঁয়াজ বীজের ৪ভাগের ১ভাগ বীজ থেকে আসে শাহিদা বেগমের উৎপাদিত খান বীজ থেকে।