Opu Hasnat

আজ ২৩ জানুয়ারী শনিবার ২০২১,

পার্বত্য চুক্তির তেইশ বছর পূর্তিতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নানান কর্মসূচী খাগড়াছড়ি

পার্বত্য চুক্তির তেইশ বছর পূর্তিতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নানান কর্মসূচী

২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৩ বছর উদযাপন করবে পার্বত্যবাসী। কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহন করেছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদসহ তিন পার্বত্য জেলা। 

গত ২৫শে নভেম্বর বুধবার সকাল ১১টায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরীর সভাপতিত্বে পরিষদ সম্মেলন কক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম শরনার্থী বিষয়ক টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বলেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এ চুক্তির ফলে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তির সুবাতাস বইছে। শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। প্রতি বছর এ জেলা খাগড়াছড়িতে শান্তিচুক্তির বর্ষপূর্তি বর্ণাঢ্যভাবে পালিত হয়ে আসছে। এ বৎসর কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবের কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করতে হবে। তিনি পার্বত্য শান্তিুচুক্তি উদযাপনের অংশ হিসেবে গৃহহীনদের গৃহ নির্মান প্রদান বিষয়ক একটি কর্মসূচী রাখার বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেন। পরে আলোচনা সভায় উপস্থিত বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের মতামতের ভিত্তিতে ২রা ডিসেম্বর ২০২০খ্রি: দিনব্যাপি কর্মসূচী পালনে নিম্মোক্তো সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। 

এদিন সকাল ১০টায় “শান্তিচুক্তি একটি ঐতিহাসিক অর্জন” হিসেবে উপলব্ধি করতঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পন এবং পার্বত্য চুক্তির ২৩বছর পূর্তি উপলক্ষে কেক কাটা। সকাল সাড়ে ১০টায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্টীর সাংস্কৃতিক ইনষ্টিটিউট, খাগড়াছড়ি হল রুমে আলোচনা সভা। সকাল ১১টায় খাগড়াছড়ি পৌরএলাকায় মাস্ক বিতরণ কর্মসূচী। ৯টি উপজেলায় ৯জন গৃহহীন পরিবারকে গৃহ উপহার। সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ কার্যালয়ে ফানুস বাতি ওড়ানো ও আলোকসজ্জায় সজ্জিত করবে স্ব স্ব প্রতিষ্ঠান।

৪০টি গ্রামে অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তুু শরনার্থী : আঞ্চলিক দলগুলোর বিরোধের জেরে খাগড়াছড়িতে ৪০টি গ্রামে প্রায় দেড়শ পরিবার নিজ বসতবাডি ছেড়ে অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তুু শরনার্থী হয়েছে। এর মধ্যে খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ির বর্মাছড়ি, বাইন্যাছোলা, দুল্যাতলী, গুইমারা, রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরের উদ্বাস্তুু ৪৪টি পরিবার বর্তমানে মহালছড়ির সিঙ্গিনালা কুলারামপাড়া হাইস্কুলসহ আশপাশের এলাকায় অন্যের বাসাবাড়িতে বসবাস করছেন। এক কাপড়-চোপড় পড়ে অনেক কর্মী ও সমর্থক নিজ বাড়ির আংগিনায় জিনিস পত্র যে যার অবস্থা আছে, সে অবস্থায় ছেড়ে ফেলে আসতে হয়েছে। অলি-গলি জায়গায় ধান পাকতে শুরু হয়েছে, কিন্তু কাটার লোকজন নেই, আতংকে জনমানব শুন্য। 

মহালছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না নাসরিন উর্মি বলেন, মানবিক কারণে তারা অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি নিরাপত্তার দেওয়া কথাও বলেন ঐ কর্মকর্তা। পাহাড়ের আঞ্চলিক একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সমর্থকদের হুমকিতে কিছু পরিবার অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তু হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তদন্ত করে পরিবারগুলোকে নিজ বাস্তুুভিটায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। গত ২০এপ্রিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের ত্রাণ সহায়তা দেয়া হয়েছে। এছাড়া উদ্বাস্তুু অন্য পরিবারগুলো বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান করছে। শুধু তাই নয়, দীঘিনালা, পানছড়ি, রামগড়, মাটিরাঙ্গায় প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ-ভাংচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। তবে জানুয়ারি থেকে হিসেব করতে গেলে এই খুন, অপহরণের সংখ্যা আরো বেশি। 

বাইরে থেকে পুন:র্বাসন : ১৯৭৬সালে বরকল উপজেলায় টহল পুলিশের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে এই সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠন। সংগঠনটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য বিশ্বস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব না থাকায় সশস্ত্র আন্দোলন এক পর্যায়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করার অপতৎপরতা রুখতে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই তৎকালীন সরকার সমতল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভূমিহীন এবং দরিদ্র বাঙালিকে পুনর্বাসন করে পার্বত্য অঞ্চলে। এতে করে বিচ্ছিন্নতার তৎপরতা কমলেও জটিল আকার ধারণ করে ভূমি বিরোধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য, চাঁদাবাজি এবং কৌশলে ভূমি দখলের বিষয়গুলো।

পাহাড়ে সংঘাতের ইতিকথা : পাহাড়ে আঞ্চলিক চারটি দল থাকলেও তারা দুই ভাগে বিভক্ত। চুক্তির পক্ষের সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং পুর্নস্বায়ত্ব শাসন দাবিতে অড়ঢ় প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এখন এক হয়ে কাজ করছে। এক সময় চুক্তিবিরোধীতা থাকলেও এখন তা একেবারেই নেই। সুধাসিন্ধু খীসার নেতৃত্বাধীন পিসিজেএসএস(এমএন লারমা/সংস্কার) এবং শ্যামল কান্তি চাকমার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ’কে(গণতান্ত্রিক) এক হয়ে কাজ করছে বলে এলাকাবাসী মনে করে। 

দুই দশক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯৭সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সই হয়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় ওরফে সন্তু লারমার সঙ্গে এই চুক্তি সই সম্পাদন হয়। খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে প্রায় ২হাজার সশস্ত্র বিদ্রোহী গেরিলা শান্তিবাহিনীর সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন সন্তু লারমা। তবে ওই চুক্তির বিরোধিতা করে খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামেই কালো পতাকা প্রদর্শন করে জনসংহতি সমিতির সহযোগী ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের একটি অংশ। চুক্তির বিরোধিতা করে সন্তু লারমার সংগঠন থেকে বের হয়ে প্রসিত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) গঠিত হয়। 

১৯৯৮ সালের ২৬ জুন ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) পুর্নস্বায়ত্বশাসন দাবীতে তারা আত্মপ্রকাশ করে। 

২০১০ সালে সন্তু লারমার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে নানা অভিযোগে সুধাসিন্ধু খীসা ও তাতিন্দ্র লাল চাকমার নেতৃত্বে জন্ম হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা/সংস্কার) নামে পাহাড়ে আরেক নতুন সংগঠন। 

সর্বশেষ ২০১৭ সালের নভেম্বরে খাগড়াছড়িতে সাংবাদিক সম্মেলন করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ভেঙে গণতান্ত্রিক ইউপিডিএফ নামের নতুন সংগঠন জন্ম নেয়। এ নিয়ে এখন পাহাড়ে চারটি আঞ্চলিক দলের তৎপরতা রয়েছে।

বিশিষ্ট জনের মন্তব্য : নারী নেত্রী ও মানববাধিকার কর্মী নমিতা চাকমা বলেন, পাহাড়ের অপরাজনৈতিক কারনেই এই ঘটনাগুলো অহরহ ঘটছে। অশান্ত ও অপরাজনৈতিক সৃষ্টি করা এটি অত্যন্ত দু:খজনক ও বেদনাদায়ক। যতদিন পর্যন্ত নিজেদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি অবসান হবেনা, ততদিন এ গুলো থামানো খুবই মুশকিল। সমাধানের উপায় সকলের মাঝে শুভ উদয় হোক এ কামনায় ব্রত করেন। 

মহালছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিমল কান্তি চাকমা ঘটনা গুলোকে অমানবিক ও নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করে বলেন, আমিও নিরাপদ নই, আতংকিত ও হতাশ। তিনি আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের লড়াই বন্ধ না হলে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য চট্ট্রগ্রামে মানবিক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে মত প্রকাশ করেন। সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের কাছে জনপ্রতিনিধিরাও অসহায়। নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে জনগণকে কষ্ট দেয়া হচ্ছে। পাহাড়ের বৃদ্ধমান সমস্যা সমাধানে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। পাহাড়ের জনপ্রতিনিধি হতে গেলে কারও না করো সমর্থন নিতে হয়, ঠিক তেমনি আমি পিসিজেএসএস (এমএন লারমা/সংস্কার) সমর্থন নিয়ে ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান হয়েছি। 

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও রাংগামাটি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি দীপংকর তালুদার বলেন, বর্তমান চিত্রই পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের গন দাবির ছিল যথার্থতা প্রমান করে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা না হলে পাহাড়ে শাস্তি আসবে না, মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না।  

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) এর সদস্য সচিব জালেয়া চাকমা বলেন, প্রসিত খীসার ইউপিডিএফ জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের বুলি আড়ালেও তারা এখন লক্ষ্যচ্যুত। তারা এখন ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির মত ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে। তারা গণতান্ত্রিক পন্থার পরিবর্তে জোর জবর দস্তিতে দলীয় কার্যক্রম চালাতে চায়। তারা এখন সন্ত্রাসী সংগঠন। প্রতিষ্ঠার সাড়ে ৫মাসের মাথায় গণতান্ত্রিক প্রধান তপন জ্যাতি চাকমা ওরফে বর্মা সংঘাতে নিহত হওয়ায় বর্তমানে সংগঠনটির নেতৃত্ব সংকটে পড়বে কি না তা নিয়েও নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস-এমএন লারমা/সংস্কার গ্রুপ)’র কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘রক্তপাত করে অধিকার আদায় হবে না। অধিকার আদায় করতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে। কিন্তু ইউপিডিএফ (প্রসিত) এতে বিশ্বাসী না বলে পাহাড়ে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাচ্ছে। আমাদের বহু নেতাকর্মী তাদের হাতে মারা গেছে। অপহৃত হয়েছে। বাড়ি ঘর ও এলাকা ছাড়া হয়েছে।

ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র প্রসিত খীসার ইউপিডিএফ এর মুখপাত্র নিরণ চাকমা বলেন, ‘নব্য মুখোশবাহিনী (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) ও পিসিজেএসএস এমএন লারমা/সংস্কার পন্থীরা সেনাবাহিনীর সাথে তাল মিলিয়ে টার্গেট কিলিংয়ে নেমেছে। তারা আমাদের নেতাকর্মীদের একের পর এক হত্যা, অপহরণ করে যাচ্ছে। তাঁরা যদি মনে করে খুন করে ইউপিডিএফ নেতাকর্মীদের দমানো যাবে তাহলে ভুল করবে।’ চলতি বছর ১০জন নেতাকর্মীকে হত্যা ও নারী নেত্রীসহ ১১জনকে অপহরণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

সোমবার (২৩ এপ্রিল) খাগড়াছড়ি টাউন হলে আয়োজিত এক সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাাম ভারত প্রত্যাগত শরণার্থী বিষয়ক টাস্কর্ফোসের চেয়ারম্যান(প্রতিমন্ত্রী সমমর্যাদা) ও ২৯৮নং আসনে স্থানীয় সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘পাহাড়ের মানুষ এখন ভালো নেই। একের পর সংঘাতের কারণে মানুষ আতঙ্কিত।’ তিনি সবাইকে সজাগ থাকার এবং সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানান।

এ বিষয়ে খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাউদ্দিন জানিয়েছেন, ‘এসব ঘটনা ঘটার পরও পরিবারগুলো থেকে তেমন কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয় না। তবে কোনো অবস্থাতেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। আইন শৃংখলা বাহিনী সতর্ক অবস্থা রয়েছি। প্রয়োজনে অভিযানও চালানো হচ্ছে।’ 

বান্দরবান পুলিশ সুপার জেরিন আক্তার বলেন, খুনাখুনির ঘটনায় কারা জড়িত তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তারা তদন্ত অব্যাহত রেখেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যের দল পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে সেনাবাহিনীর টহল অব্যাহত চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ এলাকাকে ঘিরে রাখা হয়েছিল।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, সেনাবাহিনীর একটি টহল দলের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। তখন একজন সেনা সদস্য আহত এবং দু’জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে বলে জেনেছি আমরা। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল। 

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(মূল) সন্তুু লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, এ ঘটনাটি তারা নিজেদের অভ্যন্তরীন বহি:প্রকাশ। পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর আমরা গনতন্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাসী কোন অস্ত্রে মরনাস্ত্র এমন কাজে জড়িত নয়। সম্পুর্ন মিথ্যা ও বানোয়াট অপপ্রচারে তীব্র নিন্দা-প্রতিবাদ জানান। এ ব্যাপারে বান্দরবান জেলা পিসিজেএসএস মূল দলের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য জানার জন্য তাদের একাধিক নেতার টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও কোন সংযোগ পাওয়া যায়নি।

পুর্নস্বায়ত্বশাসন দাবী অনড় সংগঠন হিসেবে পরিচিত ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট(ইউপিডিএফ)’র কেন্দ্রীয় কমিটির যুব ফোরামের সভাপতি অংগ্য মারমা বলেন, এটি অসম্পূর্ণ চুক্তি, সেই কারণে আমরা চুক্তির বিপক্ষে ছিলাম। এই অসম্পূর্ণ চুক্তিটি সরকার দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখেছে এবং তারা বাস্তবায়নও করছে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষকে অধিকার দেওয়া হলে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত হতো না। চুক্তি নিয়ে আমাদের চার দলের মধ্যে একটি প্রতিশ্রুতি হয়েছিল কেউ আর হানাহানির মধ্যে জড়াবে না। কিন্তু সেটি স্থায়ী হয়নি। শাসক গোষ্ঠীর কারণে পাহাড়ে সংঘাত বন্ধ হচ্ছে না। এই সংঘাত বন্ধে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার চাইলেই এই সংঘাত বন্ধ হতে পারে।

ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর সভাপতি শ্যামল কান্তি চাকমা বলেন, প্রসিত খীসার ইউপিডিএফের জন্য আজ পাহাড়ে এত সংঘাত। তারা তখন চুক্তির বিরোধিতা না করলে হয়তো পাহাড়ে আজ চারটি আঞ্চলিক সংগঠন হতো না। পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক এটা আমরা সব সময় চাই। এর জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু সন্তু লারমার জেএসএস ও প্রসীত খীসার ইউপিডিএফের কারণে এটি বন্ধ হচ্ছে না। তারা মুখে হানাহানি বন্ধের কথা বললেও সাধারণ পাহাড়িরা তাদের কথা বিশ্বাস করে না। তারা উভয়ে বিশ্বাস ঘাতক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(এমএন লারমা) দলের আর্ন্তজাতিক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, পাহাড়ে কোনও হত্যাকান্ডের সঙ্গে আমাদের দল জড়িত ছিল না। চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য আমরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে যাচ্ছি। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে যাদের বেশি ক্ষতি হবে তারাই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে। আমরাও চাই পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজমান থাকুক। সবাই নিরাপদে শান্তিতে বসবাস করুক।

সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস কয়েক বছর ধরে দলের কোনও নেতাকর্মী গণমাধ্যমে বক্তব্য দিচ্ছে না। তবে প্রতি মাসে দলীয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিবৃতি দেয় তারা। ১৩ই অক্টোবর তাদের পেজে সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, আগের মতো সেপ্টেম্বরেও পাহাড়ে নারীর ওপর সহিংসতা থেমে থাকেনি। এসব দমনে এখানকার জনগন সরকারের সহায়তা কামনা করেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাথে ইউপিডিএফ এর মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত লেগে থাকলেও গেলো দু‘বছরের মধ্যে পার্বত্য চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষের বিবদমান সংগঠন দুটির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হানাহানির ঘটনা কোন ক্রমে ঘটেনি।

স্থানীয়দের দাবি-পার্বত্য চট্টগ্রাম সন্ত্রাস দমনে সরকার আন্তরিকতা এখন বেশি প্রয়োজন। আজ পাহাড়ের পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের নতুন করে ভেবে দেখা দরকার। সমতলে সন্ত্রাস দমনে সরকারের প্রসংশনীয় ভূমিকা রয়েছে। তাহলে কেন? পাহাড়ে অনবরত একের পর এক খুন হবে এমন প্রশ্নে এখন সচেতন সাধারণ মানুষের। সন্ত্রাস নির্মূল এবং অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরী হয়ে পড়েছে।

পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের সধারণ মানুষের প্রত্যাশা, সংঘাত বন্ধ করে পাহাড়ে শান্তি ধরে রাখতে সবাই একসাথে কাজ করবে, নচেৎ পাহাড়ের পরিস্থিতি আরো ভয়াভহরুপ নিবে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র-নৃ-গোষ্ঠি পাহাড়িদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্পাদিত একটি শান্তি চুক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার(আওয়ামীলীগ শাসন আমলে) ১৯৯৭খ্রিষ্টাব্দের ২রা ডিসেম্বর এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে চীপ হুইপ আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং গেরিলা শান্তি বাহিনীর পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতা সন্তু লারমা।