Opu Hasnat

আজ ১৫ জানুয়ারী শুক্রবার ২০২১,

ব্রেকিং নিউজ

খাগড়াছড়িতে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়িতে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠনের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাবারাং কল্যাণ সমিতির Our Lives, Our Health, Our Futures (OLHF) প্রকল্পের আওতায় আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত। ‘নারীর জন্য বিশ্ব গড়ো, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করো, সহিংসতা প্রতিরোধ করো’ এ প্রতিপাদ্য বিষয়কে সামনে রেখে জাবারাং কলাণ সমিতির উদ্যোগে বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ এবং সিমাভি-নেদারল্যান্ড এর সহায়তায় পরিচালিত Our Lives, Our Health, Our Futures (OLHF) প্রকল্পের আওতায় বুধবার (২৫ নভেম্বর, ২০২০ আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস (International Day for the Elimination of Violence against Women) উপলক্ষে পানছড়ি গণপাঠাগার হলরুমে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উল্লেখ্য, এবার জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে Orange the World : Fund, Respond, Prevent, Collect!.

পানছড়ি উপজেলা : এদিকে পানছড়ি উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: তৌহিদুল ইসলাম এর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানছড়ি উপজেলার প্যানেল চেয়ারম্যান চন্দ্রদেব চাকমা এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানছড়ি থানার ভারপ্রপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ দুলাল হোসেন, উপজেলা মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান মনিতা ত্রিপুরা এবং জাবারাং এর নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। 

আলোচনা সভায় অংশগ্রহনকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পানছড়ি উপজেলার প্রত্যেক ইউনিয়নের (৫টি ইউনিয়ন) সকল মহিলা সদস্য এবং প্রত্যেকটি ইউনিয়ন থেকে ১জন করে সাধারণ ইউপি সদস্য। এছাড়াও আরো উপস্থিত ছিলেন কার্বারী প্রতিনিধি, স্থানীয় মিডিয়ার প্রতিনিধি, সরকারি বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধি এবং পানছড়ি উপজেলায় OLHF প্রকল্পের কিশোরী ক্লাবে দায়িত্বরত ফিমেল মেন্টরবৃন্দ।

স্থানীয় উন্নয়ন কর্মী রুমেল মারমার সঞ্চালনায় OLHF প্রকল্পের সমন্বয়ক দয়ানন্দ ত্রিপুরার স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা সভা শুরু হয়। তিনি দিবসের প্রেক্ষাপট, প্রতিপাদ্য বিষয়, দিবসটির গুরুত্ব এবং বর্তমান প্রেক্ষিতে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের আলোকে নারী সহিংসতার অবস্থা উপস্থাপন করেন। পরে উপস্থিত বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সদস্য এবং সাধারণ সদস্যবৃন্দ আলোচনায় অংশগ্রহন করেন।

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি উপজেলা প্যানেল চেয়ারম্যান জনাব চন্দ্রদেব চাকমা বলেন, ‘‘নারী নির্যাতন একটি সামাজিক ব্যাধি। মূলত: পরিবার বা সমাজ থেকে নির্যাতন নারী নির্যাতেনের ভিত্তি শুরু হয়। তাই সামাজিকভাবে একে মোকাবিলা করতে হবে। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে সচেতন হতে হবে, নারীদের শিক্ষার হার বাড়াতে হবে, সচেতনতা বাড়াতে হবে, তবেই নির্যাতন কমিয়ে আনা সম্ভব। আমি আশা করি সবাই সচেতন হলে ধীরে ধীরে নির্যাতনের মাত্রা কমে আসবে। এজন্য প্রত্যেকে ভূমিকা রাখতে হবে।”

বিশেষ অতিথি বক্তব্যে পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ দুলাল হোসেন বলেন, ‘‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রথম ধাপে আছে পুলিশ, তবে জন প্রতিনিধিরা এক্ষেত্রে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করেন এবং করতে পারেন। নারী নির্যাতন বহূমাত্রিক, নারীরা শরিরীক, মানসিক, যৌন এবং অর্থনৈতিকভাবেও নির্যাতনের স্বীকার হয়ে থাকে। তাই, সমাজে পুরুষ এবং নারী উভয়ই সচেতন হলে নির্যাতন হ্রাস করা যাবে।” জাবারাং নির্বাহী পরিচলিক, মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, “আমাদের সমাজে সামাজিক বিভিন্ন কুসংস্কার এবং কিছু অপ-সংস্কৃতির কারণে নারী নির্যাতন হচ্ছে। তাই, আমাদেরকে কুসংস্কার থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে এবং নতুন প্রজন্মকে সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে হবে। সচেতন মহিলারাই পারে নারী সহিংসতা কমাতে।” মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মনিতা ত্রিপুরা বলেন, ‘‘সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নারী নির্যাতন কমছেনা, নারীরা শিক্ষিত এবং সচেতন হলেই নির্যাতন কমতে পারে। নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও সচেতন হলে নারী নির্যাতন কমবে বলে মনে করি।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: তৌহিদুল ইসলাম সভাপতির বক্তব্যে বলেন, “নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। বাড়ির নারী গৃহকর্মী পরিবারে নির্যাতিত হচ্ছে। যৌতুক প্রথা নারী নির্যাতনের অন্যতম কারণ। পার্বত্য অঞ্চলে মদের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে পরিবারের মধ্যে অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়।” তিনি আরো বলেন, “নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষদের ভূমিকা যেমনি অপরিহার্য তেমনি নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।” তিনি বলেন, পরিবারে নারী যদি বাড়ীর কাজের মেয়েকে নির্যাতন না করেন বা নির্যাতনে সহায়তা না করেন, নিজের সন্তানকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেতন করেন, নিজের পুত্রবধুকে যৌতুকের জন্য চাপ না দেন এবং নির্যাতন না করেন তাহলে প্রাথমিক অবস্থায় অনেক নির্যাতন কমে যাবে।” তিনি বলেন, বাঙ্গালী সমাজে অনেক পরিবারে বাড়ীর পুত্রবধুকে যৌতুকের জন্য বেশি চাপ দেন এবং নির্যাতনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখেন শাশুরী ও ননদেরা । অথচ শাশুরী বুঝতে চাইনা নিজের মেয়ের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি হলে কী অনুভূতি হবে, ননদ বুঝতে চাইনা তার ক্ষেত্রেও একই পরিনতি হতে পারে।” পরিশেষে তিনি বলেন, “যাইহোকনা কেন নারী-পুরুষ উভয়কেই নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে হবে। প্রসাশন নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সচেষ্ট এবং এ বিষয়ে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”

মহালছড়ি উপজেলা : খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির যৌথ আয়োজনে ‘নারীর জন্য বিশ্ব গড়ো, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করো, সহিংসতা প্রতিরোধ করো’ এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৫ নভেম্বর)  সকাল সাড়ে ১০টায় সিঙ্গিনালা উচ্চ বিদ্যালয় অডিটোরিয়ামে স্বপ্না চাকমার সঞ্চালনায় খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির সভাপতি শেফালিকা ত্রিপুরা’র সভাপতিত্বে মহালছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা দত্ত প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, মহালছড়ি উপজেলা মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান সুইনুচিং চৌধুরী, উপজেলা তথ্য আপা প্রকল্পের তথ্যসেবা কর্মকর্তা মুনিরা জাহান, মহালছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ জাহাঙ্গীর, সিঙ্গিনালা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মংমং মারমা প্রমূখ। এ সময় স্বাগত বক্তব্য রাখেন, খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির প্রকল্প সমন্বয়ক কাজল বরণ ত্রিপুরা।

আলোচনা সভায় বক্তারা বিভিন্ন সময়ে নারী নির্যাতনের কথা তুলে ধরেন এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।

দীঘিনালা উপজেলা : ‘‘নারীর জন্য বিশ্ব গডড়ো, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করো, সহিংসতা প্রতিরোধ করো” এ প্রতিপাদ্য নিয়ে দীঘিনালায় আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস-২০২০ উপলক্ষে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার (২৫ নভেম্বর) তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থা’র উদ্দ্যোগে উপজেলার শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গনে এক ঘন্টার মানববন্ধন OLHF প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কিশোরী ক্লাব হতে নারী ও কিশোরীরা অংশগ্রহন  করেন। পরে ২নং বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদ মিলনায়তনে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার OLHF প্রকল্পের প্রকল্প ম্যানেজার স্যুইচিংঅং মারমার সভাপতিত্বে, প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, দীঘিনালা উপজেলা পরিষদ নারী ভাইস-চেয়ারম্যান মিসেস সীমা দেওয়ান। এসময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, ২নং বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদের মহিলা সদস্য মিসেস কনিকা চাকমা, রনিকা দেওয়ান ও রহিমা আক্তার, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার কমিউনিটি ফেসিলিটেটরএজেন্সি চাকমা প্রমূখ।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস-চেয়ারম্যান সীমা দেওয়ান বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পারস্পারিক সম্প্রীতির মাধ্যমে  নারী নির্যাতন, সহিংসতা, ধর্ষণ, বাল্য বিবাহ ইত্যাদির  বিরুদ্ধে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।  তিনি  আরও বলেন, নারী সমাজের যে উন্নয়ন তার পিছনে পুরুষ সমাজের সহযোগিতা ও সুযোগ সৃষ্টিকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষদের সহযোগিতা না থাকলে নারী সমাজের আজকের এ অগ্রগতি এবং  বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে নারীর অংশগ্রহণ কল্পনা  করা কঠিন। পুরুষ সমাজের এ ভালো কাজকে তিনি সাধুবাদ জানান এবং আহ্বান জানান ভবিষ্যত দিনগুলোতে  পুরুষ সমাজ যেন সর্বদা নারীদের পাশে থেকে বর্তমান সরকাররের নারী সমাজের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সকল কাজে সহযোগিতা থাকে।  

সভাপতির বক্ত্যেবে স্যুইচিংঅং  মারমা  OLHF প্রকল্পের আগামী চার বছরের বিভিন্ন কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন। তিনি এ প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে আগামী চার বছর পর অত্র এলাকায় নারী সমাজের আরও অনেক ইতিবাচক পরিবর্তন হবে যা নারী সমাজের অগ্রগতিকে প্রভাম্বিত করবে।