Opu Hasnat

আজ ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার ২০২০,

নড়াইলে লাখ লাখ টাকা নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ নড়াইল

নড়াইলে লাখ লাখ টাকা নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ

নড়াইলে চাকুরী দেয়ার নামে লাখ লাথ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে এনজিও কর্মকর্তা গোলাম আকবর (৫০) এর বিরূদ্ধে। তিনি নিজেকে উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতি’র খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে নড়াইল সহ খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এ সংস্থার জাল বিস্তার করেছেন। জেলা, উপজেলা ও শাখা ব্যবস্থাপক নিয়োগ দিয়ে তাদের মাধ্যমে মাঠ কর্মী ও সুপারভাজার সহ বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগ দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। পদের গুরুত্ব হিসেবে ৩ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে নিচ্ছেন। চাকুরী প্রার্থীর আর্থিক অবস্থা বুঝে টাকা নিচ্ছেন। কৌশল হিসেবে প্রত্যেকের নিকট হতে অঙ্গিকার নামায় সাক্ষর করে নিচ্ছেন। যে অঙ্গিকার নামায় লেখা রয়েছে চাকুরী দেয়া বাবদ উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতি’র কোন কর্মকর্তা টাকা নেয়নি বা দাবি করেননি। পরবর্তীতে এ সংক্রান্ত কোন অভিযোগ করলে এ সংস্থার কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষের উপর তার দায় বর্তাবে না। বরং যিনি টাকা দাবি করবেন তিনি দোষি সাব্যস্ত হবেন। 

দীর্ঘ অনুসন্ধানে আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি হুমায়ুন কবীর রিন্টু জানান, খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তা গোলাম আকবর প্রায় দেড় বছর ধরে শুধু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে অর্থ হাতিয়ে চলেছেন। এ পর্যন্ত কাউকেই কোন বেতন ভাতা দেননি। তাদের কি কাজ তাও তারা ভালো করে জানেন না। প্রথম দিকে জানানো হয়েছে জলবায়ু’র উপর কাজ করতে হবে। এরপর বলেছেন স্বাস্থ্যের উপর কাজ করতে হবে। বর্তমানে বলছেন গণশিক্ষার উপর কাজ করতে হবে। এভাবে বার বার কাজের নাম পরিবর্তন করে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শান্তনা দিয়ে আসছেন। গত ২ মাসে শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নুতন করে নিয়োগ দেয়ার পর তাদের চাপের মুখে দ্রুতই জলবায়ুর কাজ শুরু করা হবে বলে জানানো হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর নড়াইল শহরের ঐশী কমিউিনিটি সেন্টারে নড়াইল জেলায় নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা করে দ্রুতই কাজ দেয়ার শান্তনা দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ কর্মশালার ব্যানারে লেখা হয় উদয়ন সমাজ কল্যাণ সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত আধুনিক ও নৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও জনসাধারনের মাঝে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কর্মশালা। ব্যানারে প্রধান অতিথি হিসেবে নড়াইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন খান নিলু’র নাম ব্যবহার করা হলেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন। নড়াইল জেলা ব্যবস্থাপক মোঃ তৌহিদুর রহমান তহিদ এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই কর্মশালায় ব্যানারে লেখার সাথে প্রশিক্ষনের কোন মিল ছিল না। শুধুমাত্র সংস্থা ও সংস্থার কর্মকর্তাদের গুণ কীর্তন করে তাদের প্রতি আস্থা বিশ্বাস বাড়ানোর উৎসাহ দেয়া হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের আরোও মাঠকর্মী এনে নিয়োগ নেয়ার জন্য উৎসাহিত করা হয়। কাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করতে বলা হয়। মোটা বেতনের প্রলোভন দেয়া হয়। দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ হওয়ার কথা থাকলেও সাংবাদিকদের আনাগোনা দেখে ১১টায় শুরু হওয়া প্রশিক্ষণ কর্মশালা ১২ টায় শেষ করা হয়। ওই দিন সাংবাদিকরা ব্যানারে লেখা প্রকল্পের অনুমোদনের কাগজপত্র দেখতে চাইলে তারা তা দেখাতে ব্যার্থ হন। উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতি’র খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তা গোলাম আকবর কাজ পাওয়া প্রকল্পের সরকারি অনুমোদন সহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর জন্য বার বার সময় নিলেও অদ্যাবধি তা দেখাতে পারেননি। ধূর্ত এই গোলাম আকবর নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের কাঠালবাড়িয়া গ্রামের জহুর মোল্যার ছেলে। নিজ বাড়ির এলাকা নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া বাজারে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে সেখানে উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতি’র খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। কিন্তু সেখানে কোন সাইনবোর্ড নাই। মুলত: গোলাম আকবর মাইজপাড়া বাজারের অমলেন্দু’র কম্পিউটারের দোকানে বসে থাকেন। কেউ টাকা দিলে অমলেন্দুকে বলে তার নামে নিয়োগপত্র প্রিন্ট দিয়ে দেন। নিয়োগ বাণিজ্য করে অর্থ হাতানো এ চক্রটি ২০১৯ সালে প্রথম ঘাটি গাড়ে নড়াইল শহরের হামিদ ম্যানসনে। বিভিন্ন লোকজনের নিকট হতে প্রতারনা করে টাকা নেয়ার অভিযোগে গোলাম আকবর মামলা ও হামলার শিকার হয়। মামলায় আকবর গ্রেফতার হয়। তারপর অফিস গুটিয়ে নিয়ে আকবর গা ঢাকা দেয়। পরবর্তীতে সদরের মাইজপাড়া বাজারে ঘাটি গাড়ে। তাছাড়া গোলাম আকবরের নামে নড়াইল ও মাগুরা আদালতে একাধিক চেক প্রতারনা মামলা রয়েছে। 

উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতি’র নড়াইল জেলা ব্যবস্থাপক পদে নিয়োগ নিয়েছেন নড়াইল পৌরসভার কুড়িগ্রামের লুৎফর মোল্যার ছেলে মোঃ তৌহিদুর রহমান তহিদ। তিনি জেলা কার্যালয় করেছেন নড়াইল শহরের বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্টেডিয়ামের বিপরীত পাশের ভবনের দ্বিতীয় তলায়। অফিসের কোন সাইনবোর্ড নেই। মাগুরা জেলা ব্যবস্থাপক হিসেবে নিয়োগ নিয়েছেন নড়াইল পৌরসভার আলাদাতপুর এলাকার সৈয়দ আব্দুর রাজ্জাক মাষ্টারের ছেলে সৈয়দ নাঈমুল ইসলাম রোমেন। তিনি মাগুরা সদর উপজেলার জগদল বাজারে এ সংস্থার জেলা কার্যালয় করেছেন। সেখানেও কোন সাইনবোর্ড নেই। একইভাবে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতি’র সাইনবোর্ড বিহীন অফিস খুলে নিয়োগ বাণিজ্য চলছে। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার প্রত্যেক গ্রামে মাঠ কর্মী নিয়োগ দেয়ার নামে প্রতি গ্রামের অন্তত: ১০ জনের নিকট হতে ৩ হাজার টাকা হতে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়েছে। কোন কোন ওয়ার্ডে ৪/৫ জনের নিকট হতে টাকা নিয়েছে। নড়াইল সদর উপজেলার দত্তপাড়া গ্রামের রূপালী জানান, তার নিকট হতে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে তাকে একটি নিয়োগ পত্র দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দিন তিনি গোলাম আকবরের কাছে ধর্না দিচ্ছেন, তাকে কোন কাজ বা বেতন ভাতা না দেয়ায় তিনি টাকা ফেরত চাইলেও তা পাননি। একই ভাবে জেলার লোহাগড়া উপজেলার নলদী ইউনিয়নের মতিনগর গ্রামের দীপংকরের কাছ থেকে ২২ হাজার ১শ টাকা নিয়ে একটি নিয়োগ পত্র দেয়া হয়েছে। যশোর সদর উপজেলার বসুন্দিয়া গ্রামের মুন্নীর নিকট হতে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে তাকে একটি নিয়োগপত্র ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। এদের কাউকেই কোন বেতন ভাতা দেয়া হয়নি। তাদের মত অনেকেই টাকা দিয়ে ধরা খেয়েছেন। 

মাগুরা জেলার ব্যবস্থাপক নাঈমুল ইসলাম রোমেন জানান, এ প্রতিষ্ঠানের সকল কাগজপত্র সঠিক জেনে বুঝে তিনি চাকুরী নিয়েছেন। কিন্তু তিনি প্রকল্পের কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। নড়াইল জেলা ব্যবস্থাপক তৌহিদুর রহমান তহিদ বলেন, তাকে নিয়োগ দেয়া হলেও কোন কাগজপত্র তার নিকট দেয়া হয়নি। আর এ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তিনি ভালো কিছু জানেন না। 

এ প্রতিষ্ঠানের খুলনা বিভাগীয় কর্মকর্তা পরিচয়দানকারি গোলাম আকবর জানান উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতির প্রধান কার্যালয় রাজধানী ঢাকার নয়াপল্টন। তিনি দাবি করেন তার নিকট প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র আছে। তবে তিনি কোন কাগজ দেখাতে পারেননি। এদিকে চাকুরী পেতে টাকা দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া বেকার যুবক যুবতীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। তারা চাকুরীর জন্য দেয়া টাকা ফেরত পেতে বিভিন্ন মহলে ছুটাছুটি করছেন। উদয়ন সমাজ কল্যাণ সমিতির প্রধান কার্যালয়ের ০১৭০৭৬৩৭৬৫৮ নং মোবাইলে কল দিলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নিজের নাম ইব্রাহিম পরিচয় দিয়ে বলেন, গোলাম আকবর খুব ভালো মানুষ তাকে খুলনা বিভাগের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে। প্রকল্প পরিচালনার প্রয়োজনীয় সকল কাগজ আছে। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে টাকা নেয়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এ কাজ কেউ করলে তার বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরোও বলেন নড়াইল জেলা ব্যবস্থাপক তহিদ এর বিরূদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের কিছু অভিযোগ তার নিকট গিয়েছে। তিনি তার বিরূদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন। 

নড়াইল জেলা সমাজসেবা অফিসের উপ-পরিচালক রতন কুমার হালদার জানান, উদয়ন সমাজকল্যান সমিতি’র কোন কেউ তার সাথে নড়াইলে কোন প্রকল্পের কাজ করার ব্যাপারে কোন যোগাযোগ করেননি। নড়াইলের কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুল হুদা জানান সরকারের অনুমতি ছাড়া এ ধরনের কোন কার্যক্রম পরিচালনা করলে বা অর্থ আত্মসাৎ করলে তাদের বিরূদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুকুল কুমার মৈত্র জানান ক্ষতিগ্রস্থরা অভিযোগ দিলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। নড়াইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালমা সেলিম বলেন, টাকার বিনিময়ে নিয়োগ নেয়া ক্ষতিগ্রস্থদের কেউ অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা জানান, কোন এনজিও’র নামে কোন কেউ যদি নিয়োগ বাণিজ্য করে তার বিরূদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর উদয়ন সমাজ কল্যান সমিতির নামে নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। মাগুরা জেলা প্রশাসক ড.আশরাফুল আলম জানান, এ সংস্থার কোন কার্যক্রম মাগুরাতে চালানোর ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। তবে খোঁজ নিয়ে কোন অসংগতি পেলে ব্যবস্থা নিবেন।