Opu Hasnat

আজ ২৮ অক্টোবর বুধবার ২০২০,

সিংগাইরে পারিবারিক সিদ্ধান্তহীনতায় ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে চেতনানাশক খাইয়ে হত্যার রহস্য মানিকগঞ্জ

সিংগাইরে পারিবারিক সিদ্ধান্তহীনতায় ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে চেতনানাশক খাইয়ে হত্যার রহস্য

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার শায়েস্তা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান  ইঞ্জিঃ মোজাম্মেল হোসেন খান সুদূর আমেরিকা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক স্ট্যাটাসে তার ছোট বোনকে খাবারের সাথে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে হত্যার রহস্য উৎঘাটনসহ বিচার দাবী করেছেন। তার পরিবারের ৮ সদস্য রাতের খাবার খেয়ে অচেতন হওয়ার ঘটনা এখনো রয়েছে রহস্যাবৃত। এর মধ্যে ৩ সন্তানের জননী সেলিনা হকের (৫৫) মৃত্যু হলেও পরিবারের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি কোনো অভিযোগ বা মামলা। লাশটি দাফনও হয়েছে ময়না তদন্ত ছাড়াই।

সরেজমিন  শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে উপজেলার মোসলেমাবাদ গ্রামে ওই পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ৮ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যানের বাবা গৃহকর্তা কাজী মকবুল হোসেন খান (৮৮) সন্ধ্যার আগে খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে সাভারস্থ এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে ওই রাতেই ঢাকাস্থ ধানমন্ডির রেঁনেসা হাসপাতালে ভর্তি করে আইসিইউতে রাখা হয়। এদিকে, পরিবারের অন্য সদস্য গৃকর্তার স্ত্রী শামছুন্নাহার (৭৮), দু’ মেয়ে সেলিনা হক (৫৫), দেলোয়ারা খানম (৪৫), ছোট ছেলে কাজী আমিনুল ইসলাম (৫২), দু’ নাতনী রওজাতুল জান্নাত (১৩), তামিন জান্নাত (৯) ও নাতনীর মেয়ে অন্যন্যা তানহা (১৩) রাতের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরদিন সকালে গৃহকর্তার বড় ছেলে তাজুল ইসলামের স্ত্রী রহিমা খাতুন তার নাতনী অন্যন্যাকে ওই বাড়ি থেকে আনতে গেলে সবাইকে ঘরের মধ্যে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখতে পান। এ সময় তার ডাক-চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসেন। পরে তাদেরকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে সেলিনা হকের অবস্থার অবনতি হলে  তাকে ঢাকাস্থ শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাকিরা ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন। তবে ওই পরিবার থেকে কোনো টাকা-পয়সা কিংবা মালামাল খোয়া যায়নি বলেও জানা গেছে।

এদিকে, ১০ সেপ্টেম্বর সেলিনা হকের অবস্থার আরো অবনতি হলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিকেল ৪ টার দিকে অন্য হাসপাতালে নেয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যরা ওই অবস্থায় নিকটস্থ একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত ডাক্তার তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে নিহতের লাশ বাড়িতে এনে স্থানীয় চন্দননগর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিহত সেলিনা হকের পুত্র মাহমুদুল হাসান গোলাপ (৩০) বলেন, নানার অসুস্থতার খবর পেয়ে আমার মা তার বাবাকে দেখতে গিয়ে ওই বাড়ির রাতের খাবার খেয়ে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তিনি আরো বলেন, রেঁনেসা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আমার নানা  কাজী মকবুল হোসেন খানের বিভিন্ন প্যাথলজিক্যাল পরিক্ষার রিপোর্টে  খাবারের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত চেতনানাশক ওষুধের প্রমাণ মিলেছে। তার মাকে খাবারের সাথে চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন। তবে নিকটাত্মীয়দের মধ্য থেকে কেউ এমন ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে গোলাপের ধারনা। 

গৃহকর্তা মকবুল কাজীর ছোট ছেলে আমিনুল ইসলামকে তার বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি  রিসিভ করেননি। তবে তার স্ত্রী জাকিয়া হক লিনা বলেন, ঘটনার দিন বিকেলে আমি রাতের খাবার হিসেবে ডাল, ভাত ও ডিম রান্না করে আমার বড় মেয়েকে  তার শ্বশুরবাড়িতে দেখতে যাই। ওই খাবার খেয়ে পরিবারের অন্যদের সাথে আমার দু’মেয়ে ও স্বামী অজ্ঞান হয়ে পড়ে। আমার ধারণা, শত্রুতা করে ওই খাবারে কেউ চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়েছে।

সেলিনা হকের মৃত্যু ও অন্য সদস্যদের অজ্ঞান হওয়া প্রসঙ্গে পরিবারের লোকজন জানান, তারা ঘটনার  সাথে জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে না পারায় সিদ্ধান্তহীনতায় কোনো আইনী প্রক্রিয়ায় যেতে পারছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় লোকজন ও ১ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মোঃ বোরহান উদ্দিন জানান, পরিবারের মধ্য থেকে কেউ এ পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটিয়েছে। তাই তারা বিষয়টি চেপে যাচ্ছেন।  ঘটনার রহস্য উম্মোচনসহ জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবী জানান তারা। 

এ ব্যাপারে সহকারি পুলিশ সুপার (সিংগাইর সার্কেল) মোঃ আলমগীর হোসেন বলেন, আলামত জব্দ করার পর একাধিকবার ওই পরিবারকে মামলা দেয়ার জন্য  অনুরোধ করা হয়েছে। তাতে তারা সম্মত না হওয়ায় কোনো আইনী প্রক্রিয়ায় যাওয়া সম্ভব হয়নি বিধায় রহস্য উদঘাটনসহ জড়িত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি।