Opu Hasnat

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ২০২০,

ব্রেকিং নিউজ

তিন পার্বত্য জেলায় বারি মাল্টা-১ এর ব্যাপক চাষ, সফল প্রান্তিক জুমিয়ারা কৃষি সংবাদখাগড়াছড়ি

তিন পার্বত্য জেলায় বারি মাল্টা-১ এর ব্যাপক চাষ, সফল প্রান্তিক জুমিয়ারা

খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, বান্দরবান তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের বুকে মুখে পয়সা চিহ্ন বারি মাল্টা-১ জাতের বাগান করে ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছে প্রান্তিক চাষীরা। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের পরীক্ষামূলক ভাবে বান্দরবানের পাহাড়ের বুকে মিশ্র ফল বাগানে উন্নত জাতের বারি মাল্টা-১ চাষ শুরু হয়। স্বল্প খরচে অধিক লাভজনক হওয়ায় এচাষে ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠেছে পাহাড়ের জুমিয়া চাষীরা। বর্তমানে বান্দরবানে বাণিজ্যিক ভাবে এই চাষ করতে শুরু করেছে জুমিয়া চাষীরা। এই মুখে পয়সা আকৃতির খুবই উন্নত জাতের বারি মাল্টা-১ রোপন করার দুই বছরের মধ্যে ফলন পাওয়া যাচ্ছে। মে মাসে গাছে ফুল আসতে শুরু করে। অক্টোবর-নভেম্বর মাস থেকে এই মাল্টা ফল বিক্রি করা যায়। এছাড়াও বান্দরবানের পাহাড়ে পরীক্ষামূলক থাই মাল্টা চাষেও ব্যাপক সফলতা পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, বান্দরবানের আবহাওয়া ও মাটি লেবু জাতীয় ফলের জন্য খুবই উপযোগি। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, বান্দরবানের মাটি এসেটিক জাতীয় হওয়ায় লেবু জাতের ফল চাষে সবচেয়ে বেশি সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করেন কৃষিবিদরা।

কৃষি বিভাগ আরো জানায়, খাগড়াছড়ি, রাংগামাটি, বান্দরবানে দিন পার্বত্য জেলা পাহাড়ে কমলা, জাম্বুরা ও লেবু চাষের সফলতা দীর্ঘ বছর আগে থেকে রয়েছে। তবে মাল্টা জাতীয় ফলের চাষাবাদ খুবই কম ছিল।

খাগড়াছড়ির, রাংগামাটি দুর্গম সাজেকসহ প্রান্তিক জনগোষ্টি ও কৃষকদের সাথে আলাপকালে জানা গেছে, মাল্টার চাষাবাদ পদ্ধতি ও চারা সমস্যার কারণে এই চাষ এখানে এতদিন করা যায়নি। তবে কিছু কিছু এলাকা বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউট’র পাহাড়ি কৃষি গবেষনা কেন্দ্র মাধ্যমে চাষাবাদ করতে উদবৃদ্ধ করে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে।

রোয়াংছড়ি উপজেলার কৃষি অফিসার হাবিবুন নেছার সাথে আলাপকালে তিনি জানান, প্রতিবছর বিদেশ থেকে প্রায় ৪’শ কোটি টাকার মাল্টা আমদানী করা হয়। তাই কৃষি বিভাগ সে আমদানী নির্ভরতা কমিয়ে আনতে দেশে এই চাষের আবাদ সম্প্রসারণ ও বৃদ্ধি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর “সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প ও রাজস্ব খাত” হতে মাল্টা চাষ সম্প্রসারণ যথাক্রম হাতে নেয়। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বান্দরবান কৃষি বিভাগ উন্নত জাতের বারি মাল্টা-১ মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সরবরাহ করেছে।

তিনি আরো জানান, বারি মাল্টা-১ ফলটির মুখে পয়সা চিহ্ন রয়েছে। এটি খুবই উন্নত জাতের মাল্টা। পাহাড়ে ব্যাপক ফলন হচ্ছে। এটি সাইজে বড়, রসালো ও খেতেও খুব সুস্বাদু। বাজারের চাহিদা বেশি থাকায় বাজারমূল্য অন্যান্য জাতের চেয়ে অনেক ভালো।

বান্দরবান কৃষি বিভাগ জানান, ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের পরীক্ষামূলক ভাবে প্রথম বান্দরবান জেলা সদর, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম ও লামা উপজেলায় ১৫০ জন কৃষকের মাধ্যমে জমি ও চাহিদা অনুসারে মিশ্র ফলের বাগানে মাল্টা চাষের আবাদ শুরু করা হয়। এই মাল্টা স্বল্প খরচে অধিক লাভজনক ও ভালো ফলন হওয়ায় এই চাষে জুমিয়া চাষীরা সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বর্তমানে প্রায় ১হাজার চাষী এই বারি মাল্টা-১ চাষে সংযুক্ত হয়েছে। চলতি বছর বান্দরবান জেলা ৩৭৬ হেক্টর পাহাড়ী জমিতে মাল্টার আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাগানে ফলনও এসেছে প্রচুর পরিমান। এতে খুশি চাষীরাও। এবার কৃষি বিভাগ মাল্টা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৪ হাজার ৫শ মে:টন।

সদর উপজেলার চাষী অংজাইউ মারমা জানান, চার বছর আগে কৃষি বিভাগের সাইট্রাস ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প ও রাজস্ব খাতের আওতায় তিনি মিশ্র ফল বাগানে ১২০টি বারি মাল্টা-১ জাতের চারা রোপন করেন। গতবছর থেকে গাছে ফল আসলেও এবছর প্রায় সব গাছেই ফলন এসেছে এবং ফলনও হয়েছে অধিক।

রোয়াংছড়ি চাষী আনন্দ সেন তঞ্চঙ্গ্যা জানান, তিনি ২০১৭সালে তার মিশ্র ফল বাগানে ৫০টি মাল্টা চারা লাগিয়ে ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। ২০১৮সাল থেকে মাল্টা চাষ আরো সম্প্রসারণ করেন। বর্তমানে তার বাগানে ৫’শ এর অধিকার মাল্টা গাছ রয়েছে। চলতি বছরের তার বাগানে ৫০টি গাছে প্রচুর পরিমান ফলন এসেছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অধিক বেশি।

সদর উপজেলার নারী জুমিয়া মাল্টা চাষী মেসাচিং মারমা জানান, ৫০শতক পাহাড়ী জমিতে ১৫০টি মাল্টা গাছ রয়েছে তার। গত বছর এই বাগানের মাল্টা বিক্রি করে ৩৫হাজার টাকা আয় করেছেন তিনি। এবার বাগানে প্রচুর পরিমান মাল্টা ফল আসায় স্থানীয় ব্যপারীরা চলতি বছর অগ্রিম ৫০হাজার টাকা দিয়ে ক্রয় করার প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে।

রোয়াংছড়ি উপজেলার বøকে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষকদের উৎসাহ যোগাতে মিশ্র ফল বাগান, মাল্টা চাষ, বিনামুল্যে চারা প্রদান ও বিভিন্ন চাষাবাদে পরার্মশ, সারসহ অন্যান্য উপকরণ কৃষি বিভাগ সহযোগিতা করছে। এতে পাহাড়ে মাল্টা চাষ ও ফলজ বাগানের আবাদ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে।

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: ওমর ফারুক জানান, বান্দরবানে অনেক উচু-নীচু জমি অনাবাদি হয়ে পতিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনতে কৃষি বিভাগ চেষ্টা চালাচ্ছে। এখানকার মাটি এসেটিক হওয়ায় লেবু জাতীয় ফসলের জন্য খুবই উপযোগি। একারণে পাহাড়ের চাষীদের বারি মাল্টা-১সহ লেবু জাতীয় ফসলের চাষাবাদে আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি বিভাগ চাষীদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণ, চারা, সারসহ বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করছে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, পাহাড়ের লেবু জাতীয় ফলজ চাষাবাদে ব্যাপক সফলতা পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি বিভাগ কর্তৃক বাণিজ্যিকভাবে এই চাষাবাদে উদ্যোগ নিয়ে কৃষকদের উদ্ভুদ্ধ করা গেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্র অর্জন করা সম্ভব।

এই বিভাগের অন্যান্য খবর