Opu Hasnat

আজ ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার ২০২০,

দুর্নীতি বিরোধী অভিযান : ফরিদপুরের ভয়ংকর ত্রিরত্ন নামা ফরিদপুর

দুর্নীতি বিরোধী অভিযান : ফরিদপুরের ভয়ংকর ত্রিরত্ন নামা

শুনলেই চমকে উঠতে হয় ফরিদপুরের ভংকর ত্রিরত্ন প্রবল ক্ষমতাধর এপিএস ফুয়াদ, বরকত ও রুবেল এর দূর্নীতির কথা। আর এই গাঁ শিউরে উঠা এক দূর্নীতির মহা উপাদ্যায় এর গল্প আজ বলবো। গত ৭জুন রাতে এই গল্প শুরু হয় ফরিদপুরে বহুল আলোচিত দুই ভাই বরকত ও রুবেল সহ ৯জন গ্রেফতারের মধ্যে দিয়ে। এতে একের পর এক রুই-কাতলা ধরা পড়ে। সর্বশেষ ঈদের আগের দিন পুলিশের অভিযানে আটক হয় শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার নাজমুল হাসান লেভী, জেলা শ্রমিক লীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক বিল্লাল হোসেন ও শহর যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আসিবুর রহমান ফারহান।

আটক তালিকায় আছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের বেশকিছু প্রভাবশালী নেতাসহ জনপ্রতিনিধি, চাকরিজীবী, সাংবাদিকসহ কমপক্ষে অর্ধ শতাধিক ব্যক্তি। তবে এখনো দূর্নীতির মহা রাজপুত্র এপিএস ফুয়াদকে আটক করা যায়নি। এপিএস ফুয়াদ আটক হলে ফরিদপুরের দূর্নীতির হাড়িঁর আরো গা শিউরে উঠা কথা জানতে পারবে ফরিদপুর সহ সারাদেশ। 

দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ফরিদপুরের আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতারের খবরটি এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রিতে’ পরিণত হয়েছে। এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে ফরিদপুরবাসী স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি তারা কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। একই সাথে এই অভিযান চলমান রাখার উপর তাগিদ দিয়েছেন আওয়ামীলীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মি সহ সাধারন মানুষ। 

এপিএস ফুয়াদ নামা :  
জেলার নগরকান্দার উপজেলার বিলনালিয়া এলাকার স্বাধীনতা বিরোধী মোজদার চোকদারের পুত্র এই ফুয়াদ। কলেজ পড়াকালিন সময়ে তার ফরিদপুরে আগমন ঘটে। এসেই বিরোধী পন্থি দুই নেতার সাথে বন্ধুত্ব গড়ে রাজনীতি শুরু করেন তৎকালিন বাকশাল। শুরু করেন বাড়ি বাড়ি প্রাইভেট পড়ানো। ওই সময়েই তিনি আওয়ামীলীগের খাতায় নাম লেখান। পরে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তিনি দায়িত্ব পান তৎকালিন প্রবাসী কল্যানমন্ত্রীর পিও পদে। এরপর আর তাকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এরমাঝে পথের কাটা এপিএস সত্যজিৎ মূখার্জিকে পদ থেকে সড়িয়ে সেই পদ তিনি বাগিয়ে নিয়ে তিনি হয়ে উঠেন ফরিদপুরের একছত্র অধিপতি। একের পর এক ফরিদপুরের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে জামাত, বিএনপি ও ক্যাডার বাহিনীর সদস্যদের দলে নিয়ে রাজনীতির পাক্কা খেলোয়ার হয়ে উঠেন। একই সাথে ফরিদপুরের শুধু এলজিইডি বাদে সকল অফিস তার নিয়ন্ত্রনে নিয়ে নেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এপিএস হওয়ার সুবাদে তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয় সহ দেশের জেলার সকল অফিস গুলোতে চলে তার তদবির রাজত্ব। নিজ জেলায় তার সঙ্গি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শহর আওয়ামীলীগ নেতা লেভী, ব্যবসায়ী নেতা সিদ্দিকুর রহমান, জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারন সম্পাদক ফাইন, হাইব্রিড নেতা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সরোয়ার হোসেন সন্টু। এই স্বেচ্ছাবেকলীগ নেতা ফাইনের বাবা ও মা দুজনেই জামাতের ফরিদপুর সদর থানার রোকন। এ ফুয়াদ চক্রটির হাতে ক্ষমতা থাকায় তারা দিনকে রাত আর রাতকে দিন করতে থাকেন। এহেন কোনো অপকর্ম নেই যা এই চক্রটি করেনি। কথিত আছে, বিগত ১০ বছরে ফরিদপুরে বিএনপির নেতারা যতটা নির্যাতনের শিকার না হয়েছেন, তার চেয়ে বেশি নির্যাতন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতারা তার হাতে। ‘হাতুড়ি বাহিনী, ‘হেলমেট বাহিনী’ গঠন করে দলের ত্যাগী ও সরব নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দলীয় কর্মকান্ড থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। প্রবীণ নেতাদের প্রতি পদে পদে লাঞ্ছিত আর অপমান করা হয়। আওয়ামী লীগ আমলেই অনেক নেতাকে সরিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন থেকে। সেখানে বসানো হয় এমপিপন্থি নব্য হাইব্রিডদের। অপমান এবং লাঞ্ছিত হয়ে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হন কেউ কেউ। অনেকেই আবার রাজনীতি থেকে নীরবে বিদায় নেন। আর এই মহা সুয়োগে তিনি সাবেক মন্ত্রীর প্রশ্রয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। তার রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ নামে বেনামে ফরিদপুর সহ সারা বাংলাদেশে।  

বরকত ও রুবেল নামা :
ফরিদপুরের ব্রাহ্মণকান্দা গ্রামের বিএডিসির স্টোরকিপার আবদুস সালাম মন্ডলের চার ছেলের মধ্যে বরকত ও বরুবেল মেঝ ও সেঝ। বরকত এসএসসি আর রুবেল এইচএসসি পাস। রুবেল একটি ছোট চাকরি করলেও বরকত ছিলেন বাবু কসাই নামের এক সন্ত্রাসীর ক্যাডার। এলাকায় তারা খোকন রাজাকারের ভাগনে হিসেবে পরিচিত। তাঁদের মামা জাহিদুর রহমান ওরফে খোকন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। ফরিদপুরের নগরকান্দায় মামার টিভি শোরুমে কাজ নেন বরকত। পরে হাইওয়েতে বাস থেকে চাঁদা তোলার কাজ পান। ছোট ভাই রুবেল একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কম বেতনে চাকরি নেন। সাজ্জাদ হোসেন বরকত ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ছোট ভাই ইমতিয়াজ হাসান ওরফে রুবেল তাঁর সহযোগী। তাঁদের বড় পরিচয়, দুজনই সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ঘনিষ্ঠ। এই ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে তাঁরা চাঁদাবাজি, জমি দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। শহরের এমন কোনো মহল্লা নেই, যেখানে তাঁদের জমি নেই। তারা দুই ভাই ২০১৪ সালে সাবেক মন্ত্রী মোশারফ হোসেনের হাত ধরে দলে ঢুকেন। দলে ঢুকেই দলটির প্রবীণ ও ত্যাগী নেতা কর্মিদের বাদ দিয়ে এপিএস ফুয়াদ এর সাথে দল পরিচালনা করতে থাকেন। এসময় তারা দলে অনুপ্রবেশ ঘটাতে থাকেন তাদের পূর্বের দলের বিএনপি-জামায়াত থেকে আসা সুযোগ সন্ধানীদের। এসব হাইব্রিডের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েন একসময়ের তুখোড় নেতারা। যারা ফরিদপুরে আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করতে জীবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন, তাদের নিগৃহীত হতে হয়। করা হয় অপমান, লাঞ্ছিত। দলের প্রবীণ-নবীন কয়েক নেতাকে কুপিয়ে আহত করা হয় তাদের বাহিনী দিয়ে। আর এই সুযোগে তার হয়ে উঠেন কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক। 

তাদের আটকের পর খোজঁ পাওয়া গেছে এ পর্যন্ত আবাদি ও বসতি জমি ৫৭৩ বিঘা, চরের জমি ৮০০ একর, পাথরভাঙ্গা কারখানা ১৫ একর, পেট্রল পাম্প ৩টি, পরিবহন বাস ৩০টি, ব্যক্তিগত গাড়ি ৫টি, ট্রাক ও মিনিট্রাক ১৪টি, জমির দলিল ১১৩টি, রোলার -ট্রাক্টর ৮টি, বাড়ি ও ভবন ৪টি, রেস্ট হাউজ ২টি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ১২টি, ব্যাংক হিসাব ৪৪টি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের, দুজনের স্ত্রী, শ্বশুর সহ আত্মীয় স্বজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। আর তদন্তাধীন রয়েছে তাদের টাকা লেনদেনের বিষয়টি।  

দূর্নীতিবাজদের গ্রেফতার হওয়ায় ফরিদপুর আওয়ামীলীগ সহ সাধারন মানুষের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তারা আটক হলে দলের বড় একটি অংশ শহরে আনন্দ মিছিল বের করে। বিতরণ করা হয় মিষ্টিও। বরকত-রুবেল আটকের পর গা ঢাকা দেয় বিতর্কিত কয়েকশ নেতা-কর্মী। এখন তারা ফরিদপুর ছাড়া এবং পলাতক রয়েছে। তবে তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা ও সহযোগিদের দ্রত আটক হবে এই প্রত্যাশা সকলের। 

ফরিদপুরে আওয়ামী লীগের জাদরেল নেতাদের আটক সম্পর্কে পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান জানান, গত ১৮মে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবল চন্দ্র সাহার বাড়িতে হামলার ঘটনায় আটক করা হয় সাজ্জাদ হোসেন বরকত, ইমতিয়াজ হাসান রুবেলসহ কয়েকজনকে। পরবর্তীতে দুই হাজার কোটি টাকা মানি লন্ডারিং মামলা করে ঢাকার সিআইডি। সেই মামলায় বরকত-রুবেলের স্বীকারোক্তিতে অনেকের নাম এসেছে। সিআইডির চাহিদা মোতাবেক তালিকা অনুযায়ী তাদের আটক করা হচ্ছে। আটকের তালিকায় আরও অনেকেই রয়েছেন। তাদের আটকের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।

এই বিভাগের অন্যান্য খবর