Opu Hasnat

আজ ৬ জুলাই সোমবার ২০২০,

খাগড়াছড়ির পর্যটন কেন্দ্রগুলো ফাঁকা, জেলায় আর্থিক সংকট চরমে খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ির পর্যটন কেন্দ্রগুলো ফাঁকা, জেলায় আর্থিক সংকট চরমে

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর সুনসান নীরব পাহাড়ী জেলার সবকটি পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র। সংক্রমণ প্রতিরোধে গত ১৯মার্চ থেকে পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। তার ধারাবাহিকতায় বৈসাবি-ঈদেও খুলেনি এ দ্বার। এতে চরম দুর্ভোগ ও আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এ খাত সংশ্লিষ্টদের। অন্যান্য বছর পাহাড়ে বৈসাবি অনুষ্টান ও ঈদের আগের দিন থেকে খাগড়াছড়ি ও সাজেকসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ভ্রমণে ভিড় থাকলেও এ বছর তা হয়নি।

বৈসাবি অনুষ্ঠান ও ঈদ মানে আনন্দ। বৈসাবি অনুষ্টান ও ঈদ মানে খুশি। আর প্রতি বছর এই বিশেষ দিনগুলো পরিবার নিয়ে সবাই কমবেশি ঘুরতে যান। পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। তবে এবার মহামারি করোনার কারণে ম্লান বৈসাবি অনুষ্ঠান ও ঈদ উৎসব। তাই পর্যটকদের উপস্থিতি না থাকায় খালি পড়ে আছে খাগড়াছড়ির পর্যটন কেন্দ্রগুলো।

ঠিক এক বছর আগেও এই দিনে ঝাকে ঝাকে, দল বেধে হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটেছে খাগড়াছড়িতে। সকাল হতেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দেশী-বিদেশী পর্যটকবাহী গাড়িতে ভরে যেত জেলার প্রাণকেন্দ্র শাপলা চত্বর। সেখান থেকেই পরিবার নিয়ে পছন্দের পর্যটন স্পটে ছুটতেন পর্যটকরা।

জেলার আলুটিলা, সুরঙ্গ, রিছাং ঝরনা, হর্টি কালচার পার্ক, মায়াবিনী লেকে এখন পর্যটক শূন্য। দেশের অন্যতম ক্রেজি স্পট সাজেকে ভ্রমণপিপাসুরা যাচ্ছে না অনেক দিন। করোনার কারণে গত দুই মাস ধরে মন্দা পর্যটন ব্যবসা। অনেক হোটেল, মোটেল আপাতত বন্ধ রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এমন পরিস্থিতি থাকলে পর্যটন খাতে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার মুখে পড়তে হবে বলে জানান তারা।

যানবাহন, হোটেল-মোটেল বুকিং হয়ে যেত মাসখানেক আগে থেকে। তাৎক্ষণিক এসে হোটেল কিংবা যানবাহন বিড়ম্বনা যেন স্বাভাবিক ছিল। ঠিক এক বছরের মাথায় মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে উল্টো চিত্র খাগড়াছড়িতে। সরকারি নিদের্শনা অনুযায়ী গত দুই মাস ধরে বন্ধ দোকানপাট। চলছে না যানবাহন। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে হোটেল। পর্যটকদের উপস্থিতি না থাকায় খালি পড়ে আছে খাগড়াছড়ির পর্যটন কেন্দ্রগুলো। 

সরকারের নির্দেশনা ও স্থানীয় প্রশাসনের কড়া নজরদারির কারণে বন্ধ এসব কেন্দ্র। পর্যটন খাত সংশ্লিষ্ট পরিবহন, হোটেল মোটেল ও খাবার হোটেলের ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন লাখ লাখ টাকা। অনেকে ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেউলিয়া হওয়ার পথে। সবশেষ চরম হুমকিতে রয়েছে বেসরকারি ভাবে বিনিয়োগকারীরা। ভরা মৌসুমে ব্যবসা বন্ধ থাকায় স্টাফদের বেতন ভাতাসহ অন্যান্য খরচ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা না আসলে বিকাশমান এ খাতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তারা মুখ ফিরিয়ে নিবে বলে মনে করছেন অনেকে। 

মায়াবিনী লেক পরিচালনা কমিটির সভাপতি অংহ্লাপ্রু মারমা জানান, বৈসাবি ও ঈদে আমরা যে পরিমাণ পর্যটক পেতাম তা পুরো বছরের অর্ধেক। করোনা পরিস্থিতির কারণে এ বছর এ দুই মৌসুম কাজে লাগানো যায়নি। এতে করে এ কেন্দ্র চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। স্টাফদের বেতন ও অন্যান্য খরচ চালাতে হচ্ছে। ৩ মাসে ৬ লক্ষাধিক টাকা ক্ষতি হয়েছে। এখন যদি সরকার আমাদের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে ঘুরে দাঁড়ানো যাবে না। 

পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্কের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো: আজিজুর রহমান জানান, নিজের জমানো কিছু ও পরিচিত জনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে এ বছরের শুরুতে দোকান দিয়েছেন। শুরুতে ব্যবসা ভাল চললেও তিন মাস বন্ধ। এখন ধারের টাকা দিতে ও সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়ার উপক্রম। একদিকে ব্যবসা বন্ধ অন্যদিকে দোকানে থাকা মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এক অনিশ্চয়তা অপেক্ষা করছে জানিয়ে সরকারের সহযোগিতা চান তিনিও। 

পরিবহণ চালক মো: আবদুল মান্নান জানান, ৩ মাস ধরে আয় রোজগার বন্ধ। কি ভাবে কাটছে আমাদের কেউ কোন দিন এসে খবর নেয় না। 

পরিবহন সমিতির মো: আবু বকর জানান, বৈসাবি অনুষ্ঠান ও ঈদের আগে-পরে খাগড়াছড়িতে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসা শুরু করতো, কিন্তু এবারে তার উল্টো চিত্র। পর্যটকদের চাপ ২ /৩দিন লেগে থাকতো। বর্তমানে চাহিদা অনুসারে আমাদের পরিবহন সংকটও দেখা দিতো, তা এখন নেই।

 ট্যুরিস্ট পুলিশ খাগড়াছড়ি জোন-এর পরিদর্শক সন্তোষ ধামেই বলেন, খাগড়াছড়িতে আসা পর্যটক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পর্যটন স্পর্টে নিয়োগ করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক সাদা পোশাকের পুলিশ। ফলে পুরো জেলার পর্যটন ষ্পর্টগুলো নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে।

খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম সালাহউদ্দিন জানান, পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে যেন কেউ প্রবেশ না করে সে দিকে নজরদারি রয়েছে। পুলিশ মোতায়ন রয়েছে অনেক কেন্দ্রের প্রবেশমুখে।

পর্যটকদের পছন্দের খাবারের প্রতিষ্ঠান মন টানা হোটেলের পরিচালক রুবেল পারভেজ জানান, বৈসাবি অনুষ্ঠান ও ঈদের বন্ধে আসা পর্যটকদের জন্য প্রতিদিন তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ জনের খাওয়ার আয়োজন করা হতো। কিন্তু এ বছর প্রায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে হোটেল বন্ধ। ২০জন কর্মচারীর অধিকাংশ এখন বেকার।

খাগড়াছড়ি আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সভাপতি কল্যান মিত্র বড়ুয়া বলেন, করোনার প্রভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ পর্যটনখাত। আর পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে হোটেল মালিকরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আড়াই মাস ধরে খাগড়াছড়ির ৩০টির অধিক হোটেল বন্ধ রয়েছে। আয় না থাকায় অনেক হোটেল কর্মীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার আহ্বান জানান।

উল্লেখ্য, বৈসাবি অনুষ্ঠান ও ঈদ-উল-আজহার দীর্ঘ টানা ছুটিতে জেলার ৯টি উপজেলাতে এবার পর্যটকদের ভিড় কমেছে, একেবারেই নেই। প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্য ও তর তর করে বয়ে চলা ঝর্ণার উচ্ছ্বলতায় গা ভাসাতে পাহাড়ি কন্যা খাগড়াছড়িতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসতো লাখো সৌন্দর্য্য পিপাসু পর্যটক। খাগড়াছড়ির মাটিরাংগায় আলুটিলা হৃদয় মেম্বার পাড়া রিছাং ঝর্ণা, দীঘিনালা তৈদুছড়া ঝরণা, হাজাছড়া ঝর্ণা, আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গ, পার্বত্য জেলা পরিষদ পার্কের জুলন্ত সেতু, পানছড়ি কংচাইরী পাড়া মায়াবিনী লেক, মাইসছড়ি নুনছড়ি দেবতা পুকুর, জেলার ভারত সীমান্ত শহর রামগড়ে তৎকালীন মহাকুমা বাংলাদেশ রাইফেলস অথাৎ বিডিআরের বর্তমানে বিজিবি’র ‘জম্ম স্থান’, রামগড় বৃহত্তম চা বাগান, কৃত্রিম লেক ও রামগড় জুলন্ত সেতুসহ প্রতিটি পর্যটন র্স্পটে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের দেখা মেলতো। যার ফলে অতিরিক্ত পর্যটকের ভারে পরিবহন সংকটও প্রায় দেখা দিতো। 

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে নয়নাভিরাম নানান দৃশ্য। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্রময় জীবনধারা, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি তৈরীর নজরকাড়া হাজারো চিত্র। চারপাশে বিছিয়ে রাখা শুভ্র মেঘের চাদরের নীচে রয়েছে সবুজ বনরাজিতে ঘেরা ঢেউ খেলানো অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড়। তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে আঁকা-বাঁকা সড়ক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে খাগড়াছড়িতে আসা পর্যটকদের থাকার-খাওয়ার প্রস্তুত থাকতো বহু হোটেল-রেস্টুরেন্ট।

ঢাকা হতে খাগড়াছড়ির দূরত্ব ৩১৬কি.মি. ও চট্টগ্রাম থেকে ১০৯কি.মি.। রাজধানী শহর ঢাকার কমলাপুর, সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, কলাবাগান, গাবতলী থেকে সরাসরি শান্তি পরিবহন, এস আলম, সোডিয়া, সেন্টমার্টিন, ইকোনোসহ ইত্যাদি অনেক বিলাস বহুল বাসযোগে খাগড়াছড়ি আসতে পারেন আপনি। তবে আসার আগে করোনা কোভিড-১৯ পরিস্থিতির মোকাবিলা সরকারী সব নির্দ্দেশনা মেনে আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আসতে হবে। অন্যথায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে। 

এই বিভাগের অন্যান্য খবর