Opu Hasnat

আজ ৩ জুলাই শুক্রবার ২০২০,

সমবায় খাতকে ১৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার দাবি মতামত

সমবায় খাতকে ১৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেওয়ার দাবি

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব আর্থিক সংকটের সম্মুখীন। সারা বিশ্বের ন্যায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করার জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। সাথে শিল্প কল-কারখানা, অফিস আদালত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে সারা বিশ্ব এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চরম সংকটের সম্মুখীন। করোনা ভাইরাস মোকাবেলা ও পরবর্তী আর্থিক সংকট দূর করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও বাস্তবসম্মত।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বাংলাদেশের সমবায় খাতও সংকটের সম্মুখীন। আগামী দিনে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশংকা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ২৯ প্রকারের সমবায় সমিতি রয়েছে এবং ১ লক্ষ ৭৭ হাজার নিবন্ধিত সমবায় সমিতি রয়েছে এবং প্রায় এক কোটির অধিক সমবায়ী রয়েছে। যারা কৃষি উৎপাদন, বিপণন, মৎস্য উৎপাদন, দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন ও সমবায় দুগ্ধ ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্র কুটির শিল্প, ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ ও নানা ধরণের কাজের সাথে জড়িত।

দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ লিঃ (কাল্ব) সমগ্র বাংলাদেশে সমবায় অঙ্গনে ১০৪৮ টি ক্রেডিট ইউনিয়ন বা সমবায় প্রতিষ্ঠান গঠন করে ১৯৭৯ সাল থেকে ক্রেডিট ইউনিয়নসমূহের শীর্ষ সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। যার সদস্য সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ, মূলধন প্রায় ৩৭০০ কোটি টাকা এবং কর্মী সংখ্যা ৩৬৬১ জন। কাল্ব-এর ৮৩২ জন কর্মী রয়েছে এবং মূলধন ৯০০ (নয়শত) কোটি টাকার অধিক। প্রতি মাসে ১ কোটি ৭২ লক্ষ টাকা বেতন-ভাতা প্রদান করতে হয়। সমবায় সমিতি বিধিমালার সংজ্ঞানুসারে কাল্ব তার উপর অর্পিত মূল ৩টি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে আসছে। সদস্য ক্রেডিট ইউনিয়নসমূহের অডিট কার্যক্রম, আন্তঃঋণ কার্যক্রম, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, সম্প্রসারণ কার্যক্রম, মিউচ্যুয়াল এইড, তথ্য প্রযুক্তি সরবরাহ ও অন্যান্য কার্যক্রম সম্পাদন করে আসছে।

কাল্ব তার সদস্য ক্রেডিট ইউনিয়নের মাঝে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা ঋণ বিনিয়োগ করেছে। বর্তমান মহামারী অবস্থায় সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী দেশে সাধারণ ছুটি চলছে এবং সকল কার্যক্রম বন্ধ আছে। ফলে সমবায়ীদের সকল কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকার ফলে বিনিয়োগকৃত ঋণের কিস্তি ও মুনাফা আদায়ও বন্ধ আছে। সদস্যদের আয় বন্ধ হওয়ায় সদস্যগণ আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে বিধায় ঋণের কিস্তি ও মুনাফা ফেরত প্রদানে অনীহা প্রকাশ করছে। ঋণের কিস্তি ও মুনাফা আদায় না হওয়ায় কাল্ব বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন ঋণ প্রদান করতে পারছে না। ফলে ক্রেডিট ইউনিয়নসহ কাল্ব ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পরে দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমবায়কে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় সংবিধানে ৩টি মালিকানা খাতের মধ্যে সমবায়কে ২য় মালিকানা খাত হিসেবে স্থান দিয়েছেন। এরপর থেকে বিভিন্ন প্রকার সমবায় গড়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সমবায়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে নানাপ্রকার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সমবায়কে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

করোনা পরবর্তী অর্থনীতি মোকাবেলায় যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে কিন্তু এতে খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। উন্নত দেশের প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথ বাস্তবায়ন হলেও তৃতীয়, নিম্নমধ্য ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর প্রণোদনা প্যাকেজ যথাযথ বাস্তবায়নে নিশ্চয়তা নেই। সেক্ষেত্রে সমবায় খাতের নিবন্ধিত সমবায়সমূহ উক্ত প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সারা বিশ্বে উদ্যোক্তা সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ বিপর্যয় রোধকরণ ও দুযোর্গ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে সমবায়কে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সারা বিশ্বে ৭৭৭ কোটির অধিক জনসংখ্যা। জাতিসংঘের হিসাব মতে বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ সমবায়ের মাধ্যমে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে। বাংলাদেশে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা না হওয়ায় সমবায়ীর সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কম।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের এই দুর্যোগ মোকাবেলা করার জন্য শিল্প, কল-কারখানা, গার্মেণ্টস্ খাতে স্বল্প মুনাফায় ৯২ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এনজিওদের ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রম সচল রাখার জন্য ৩০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছেন। এনজিও দেশের নিম্ন আয়ের জনগণকে সহায়তা করছে, কিন্তু স্বল্প সুদে ঋণ নিয়ে তারা উচ্চহারে নিম্ন আয়ের জনগণের কাছ থেকে অধিক হারে মুনাফা আদায় করে এনজিও মালিকগণ প্রচুর লাভবানও হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনের মুল হাতিয়ার সমবায়কে টিকিয়ে রাখার জন্য কোন প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়নি। প্রায় ১৭ কোটি জনগণের ১ কোটির বেশী জনগণ সরাসরি সমবায়ের সাথে জড়িত। করোনার কারণে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী চাকুরী হারিয়ে দেশে চলে এসেছে। অনেক গার্মেণ্টস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক গার্মেণ্টস কর্মীরাও চাকুরী হারাবে। ফলে দেশে সামাজিক বিশৃঙ্খলা এবং খাদ্য সংকট বৃদ্ধি পাবে। চাকুরী হারানো প্রবাসী ও গার্মেণ্টসের জনগণদের নিয়ে সমবায় গঠন করে তাদের মধ্যে ক্ষুদ্র ঋণ সহায়তা প্রদান করে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে সামাজিক বিশৃঙ্খলাও রোধ করা যেতে পারে।

এমতাবস্থায় কাল্ব তার ১০৪৮টি সদস্য ক্রেডিট ইউনিয়নের সাড়ে ছয় লক্ষ সদস্য এবং তাদের সাথে জড়িত ২৫ লক্ষ সাধারণ জনগণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ হতে সমবায় অধিদপ্তরের নিকট ৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছে। সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক মহোদয় কাল্বসহ তার অধিন নিবন্ধত ১ লক্ষ ৭৭ হাজার সমবায়ের জন্য ১৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা সহায়তা চেয়ে সমবায় মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। নিবন্ধক মহোদয়কে তার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দেই। সেই সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ১ কোটির অধিক সমবায়ীদের বাঁচানোর জন্য সমবায় খাতকে আপনার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজ হতে ১৫০০ কোটি টাকা সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।

লেখক : আলফ্রেড রায়, সেক্রেটারি, কাল্ব