Opu Hasnat

আজ ৪ জুলাই শনিবার ২০২০,

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে প্রাণহীন ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি’র উৎসব খাগড়াছড়ি

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে প্রাণহীন ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি’র উৎসব

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে প্রাণহীন ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি’র উৎসব করোনার কারনে এই প্রথম সকল সম্প্রদায়ের ঘরোয়াভাবে পালিত হয়েছে। আঁধার কেটে সূর্য যখন স্নিগ্ধ আলো বিলাতে শুরু করে, ঠিক তার আগ মুহূর্ত থেকে পাহাড়ের ঘরে ঘরে বারতা নিয়ে আসে বৈসাবি’র উৎসব। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সবাই মিলে ছোটে নদী, ছড়া, খালের পানে। লক্ষ্য গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানো। চাকমা সম্প্রদায়ের ফুল বিজু, মারমারা পাইংছোয়াই, ত্রিপুরারা হারিবৈসুক নামে পালন করার উৎসবের মধ্য দিয়ে পাহাড়ে শুরু হয় বৈসু-সাংগ্রাইং-বিজু(বৈসাবি)-বিষু-বিহু’র উৎসব। মূলত তিন সম্প্রদায়ের বাৎসরিক প্রধান উৎসবের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে ‘বৈসাবি; নামের সৃষ্টি। বৈ-তে ত্রিপুরাদের বৈসু, সা-তে মারমাদের সাংগ্রাই আর বি-তে চাকমা সম্প্রদায়ের বিজুকে বোঝানো হয়েছে। এতে তংচংগ্যা’র বিষু ও অহমিয়া সম্প্রদায়ের বিহু নামে পরিচিত রেওয়াজ।

প্রাণবন্ত হয়ে উৎসব আসুক আবার ঘরে ঘরে। শুদ্ধ হোক ধরণী। ততদিন ঘরে থেকে নিরাপদ রাখি নিজেকে। নিরাপদ রাখি দেশকে। 

তবে এবারের চিত্র আলাদা। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন ঘরে বসে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের। উৎসব এসেছে ঠিকই, তবে নীরবে। মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে স্নান সব আয়োজন। উৎসবের নগরীতে এখন সুনসান নীরবতা। নতুন কাপড় কেনা, আপ্যায়নের আয়োজন, কিংবা দূর থেকে প্রিয়জনের কাছে ছুটে আসা। এবার কোনোটিই পায়নি পরিপূর্ণতা। যদিও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে বাড়ির পাশের ছড়া কিংবা পানির উৎস আছে এমন স্থানে ফুল দিয়েছেন। প্রতিবছর এসময় বিগত বছরের দুঃখ গ্লানি ভুলে আত্মীয়-স্বজন, দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করা হয়।

১২ এপ্রিল থেকে মূলত শুরু হয় বৈসাবি উৎসব। চাকমা সম্প্রদায়ের ফুল বিজুর মধ্য দিয়ে হয় সূচনা। খাগড়াছড়ির সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় খাগড়াছড়ির খবং পড়িয়া এলাকায় চেঙ্গী নদীর পাড়ে। স্থানীয়দের আগে থেকে দেওয়া ঘোষণার কারণে কেউ ফুল ভাসাতে আসেনি এবার। যে স্থান ফুলে ফুলে ভরে উঠতো, সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হতো সেটি এখন সুনসান। পাহাড়ের আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃ-তান্ত্রিক জাতি(পাহাড়ি) জন গোষ্টির চাকমা সম্প্রদায়ের ফুল বিজু। রোববার(১২এপ্রিল) ফুল বিঝু’ কোনো রকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই ফুল বিঝু উৎসব পালন করলো পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মানুষেরাা। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) এর সংক্রমণ রোধে ও সরকারের নির্দেশনা মেনে কোনো রকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ফুল বিঝু উৎসব পালন করলো পাহাড়ি সম্প্রদায়।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সুধীন কুমার চাকমা বলেন, এমনভাবে উৎসব উদযাপন করতে হবে কোনোদিন ভাবিনি। আমরা সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি বৃহত্তর স্বার্থে অবশ্যই আমাদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। কেউ একজন সংক্রমিত হলে পুরো জেলা বিপদে পড়বে। তাই্ আমরা সবাইকে অনুরোধ করেছি ঘরে ঘরে যেন উৎসব উদযাপন করে। সবাই সুস্থ থাকলে আগামী বছর দ্বিগুণ উদ্দীপনা নিয়ে আমরা উৎসব করবো।

১৩ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলা সদরের বটতলা এলাকায় বসতো মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাই উৎসবের সবচেয়ে বড় আয়োজন। এখানে সাংগ্রাই র‌্যালি, জলকেলি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেতে উঠতো হাজার হাজার মানুষ। তরুণ-তরুণীর বর্ণিল পোশাক নজড়ে পড়ার মতো। পর্যটকদের উপস্থিতিও থাকতো বেশ। এখানেও এবছর উৎসব থাকছে না। এমনকি বৌদ্ধ বিহারেও জনসমাগম না করার জন্য বলা হচ্ছে।

খাগড়াছড়ি মারমা উন্নয়ন সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক বাশরী মারমা বলেন, শুরুর দিকে উৎসব করার একটা সিদ্ধান্ত থাকলেও পরবর্তীসময়ে করোনা ভাইরাসের পরিস্থিতি দেখে তা বাতিল করি। আমরা সবাইকে বলছি যাতে পরিবার নিয়ে ঘরে উৎসব করে। এমনকি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাও যাতে ঘরে করা হয়। বিহারে গেলেও যেন বিক্ষিপ্তভাবে যান।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী গরয়া নৃত্য উৎসব হতো খাগড়াপুর এলাকায়। এছাড়াও এলাকাভিত্তিক উৎসবের আয়োজনতো থাকেই। বৈসাবি শুরুর মুহূর্তে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের র‌্যালিতেও হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি থাকতো। ১৪এপ্রিল নববর্ষের দিনে শহরের হাইস্কুল মাঠ থেকে বের হতো র‌্যালি। যা টাউনহল প্রাঙ্গণে এসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মিলিত হতো। মহামারির দিনে এসবের কিছুই থাকছে না।

অন্তত: কম হলেও তিনদিন করে বৈসাবি উৎসব পালন করে থাকে। চাকমারা রোববার থেকে ফুল বিজু, মূল বিজু ও গজ্জাপয্যা পালন করছে। ওইদিন ঘরে ঘরে চলবে অতিথি আপ্যায়ন। সেই সঙ্গে সব বয়সী মানুষ নদী, খাল কিংবা ঝরনায় গঙ্গাদেবীর পূজা করবে। ত্রিপুরারা হারিবৈসু, বিষুমা, বিচিকাতাল এবং মারমারা পেইংছোয়ে, আক্যে ও অতাদা নামে আলাদা আলাদা নামে উৎসব পালন করে থাকে। 

বৈসাবির প্রথম দিন ফুল বিঝু উৎসবের মধ্য শুরু হয় বৈসাবি। মারমা ভাষায় সাংগ্রাইং, ত্রিপুরা ভাষায় বৈসু, চাকমা ভাষায় বিজু, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বিষু এবং অহমিয়া ভাষায় বিহুু’র সংক্ষেপিত রূপ হচ্ছে বৈসাবি। প্রতি বছর ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে পাহাড়ে শুরু হয় এই বৈসাবি উৎসব। আজকের দিনটিকে চাকমারা ফুলবিঝু, মারমারা পাইংছোয়াই, ত্রিপুরারা হারিবৈসুক নামে পালন করে। এই দিনে চাকমাসহ পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায় এই উৎসবে সামিল হয়ে ভোরে ঘুম থেকে উঠে বিভিন্ন পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ফুল সংগ্রহ করে। এরপর দলবেধে সবাই একসাথে নদীতে গিয়ে মা গঙ্গার উদ্দেশ্য ফুল ভাসায় পাহাড়িরা। দ্বিতীয় দিন মূল বিঝু ও তৃতীয় দিনে গোইজ্জ্যা-পোইজ্জ্যা দিন নামে পালন করে পাহাড়ের চাকমা সম্প্রদায়। একতানা মারমা’রা প্রথম দিন সাংগ্রাই, পরেরদিন আক্যে, এরপরে আতাদা নামে পালন করে।

ঐতিহ্যবাহি বৈসাবি আদিবাসীদের প্রধান সামাজিক উৎসব। করোনা ভাইরাসের পাদুর্ভাবের কারণে প্রতি বছরের ন্যায় ব্যাপক আয়োজনে দিনটি উদযাপন করতে না পারলেও থেমে নেই ধর্মীয় পূজা পার্বণ। বিশেষ করে ১২এপ্রিল এই দিনে আদিবাসী তরুণ-তরুণীরা ছড়া-নদীর পানির ধারে ধর্মীয় রীতিঅনুসারে ফুল পূজা, ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে দিনটির সুচনা করে। বিশ্বব্যাপি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ব্যাপক আয়োজনে ফুল বিজু করতে না পারলেও পরিবার ভিত্তিক নদীতে গিয়ে পালন করেছে এই ধর্মীয় উৎসব।

দিপ শিখা চাকমা বলেন, আমরা প্রতিবছর আজকের দিনে ছোট-বড় সবাই মিলে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ফুল ভাসানোর জন্য চেঙ্গী নদীতে জমায়েত হতাম। তবে এবারের বিষয়টা ভিন্নতম। মহামারী করোনার হাত থেকে নিজে ও সমাজকে বাঁচাতে এককভাবেই ক্ষুদ্র আয়োজনে চাকমা বিজু উৎসব পালন করেছি।

সানন্দা চাকমা, অরুপ ময় চাকমা, ইটালী চাকমা; শেফালীকা মারমাসহ অনেকেই জানান, প্রতিবছরে ন্যায় এই বছরও পালন করা হচ্ছে আদিবাসীদের ঐতিহাসিক বৈসাবিন। আমাদের ব্যাপক আয়োজন নেই, সীমিত থাকায় সেক্ষেত্রে আনন্দটাও আগের মতো নেই। তবে আমাদের অনুরোধ সবাই যেনো নিজের ভালোর কথা চিন্তা করে সকলেই ঘরে অবস্থান করে বিজু পালন করনো উত্তম।

তিন দিন বৈসাবি’র উৎসব হলেও পাহাড়িরা এই উৎসব পালন করে সপ্তাহ ও মাসব্যাপী জুড়ে। এই সপ্তাহ/মাস জুড়ে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায় নানা রকম ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ও খেলাধুলার আয়োজন করে থাকে। চাকমাদের ঘিলে খেলা, নাদেং খেলা, মারমাদের ’ধ’, আলারি, ম্রাগং, পানি খেলা, ত্রিপুরাদের সহ বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজন করে পাহাড়িরা। এই উৎসবের আমেজ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি/ বাঙ্গালী সকল সম্প্রদয়ের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পরে।

এই বিভাগের অন্যান্য খবর