Opu Hasnat

আজ ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার ২০২০,

করোনায় মৃত্যুর গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার ৩

খাগড়াছড়ির সকল পর্যটন কেন্দ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ির সকল পর্যটন কেন্দ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা

হাসপাতালে আইসোলেশনে থাকা বৃদ্ধা শঙ্কামুক্ত, বিদেশফেরত ২৪৪জন খোঁজ নিতে পুলিশকে নির্দেশ

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত একজনের মৃত্যুর গুজব ছড়ানোর অভিযোগে জেলার মানিকছড়ি ও দীঘিনালা উপজেলায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার বিকেল ৪টার দিকে পৃথক অভিযান চালিয়ে পুলিশ এদের আটক করে।

আটককৃতরা হলেন, মানিকছড়িতে সনাতন সংঘ শক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আদ্রিত্য ভট্টাচার্যি লিংকন, দীঘিনালায় সুজন দাশ ও মিঠু চৌধুরী।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার আব্দুল আজিজ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এই তিনজন পরস্পর যোগ সাজসে খাগড়াছড়িতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত একজনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে জনমনে ভীতি সৃষ্টি করেছে। এদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার আব্দুল আজিজ আটককৃতদের বিষয়টি নিশ্চিত করে আরও জানান, খাগড়াছড়িতে এখনও পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত কোন রোগীই সনাক্ত হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজনের মৃত্যু হয়েছে উল্লেখ করে গুজব ছড়িয়েছে একটি মহল। তাদের সনাক্ত করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় মানিকছড়ি ও দীঘিনালা থেকে ৩যুবককে আটক করা হয়েছে। তাদেরকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ঘটনা রোববার সকাল ১০টায় জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে প্রেস ব্রিফিং-এর আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্থানীয় পর্যায়ের প্রস্তুুতি হিসেবে খাগড়াছড়ির সকল পর্যটন কেন্দ্র অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় জেলা প্রশাসন। বুধবার রাতে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসকের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে পোস্ট করে এ ঘোষণা জারি করা হয়। এছাড়া জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যার যার অবস্থান থেকে সর্তকতা অবলম্বন করার বিকল্প নেই। রাঙ্গামাটির সাজেক ও খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র পরিদর্শনে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খাগড়াছড়িতে পর্যটক আসছেন। পর্যটক ও স্থানীয়দের কথা বিবেচনা করে অনির্দিষ্টকালের জন্য জেলার সকল পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ রাখতে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ রাখার স্বার্থে সাজেকসহ খাগড়াছড়ি ভ্রমণে বিদেশি পর্যটকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। একইসঙ্গে দেশি পর্যটকদের খাগড়াছড়িতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। বুধবার(১৮ মার্চ) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেন জেলা প্রশাসক প্রতাপ চন্দ্র বিশ্বাস।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাস যেহেতু সংক্রামক তাই দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে এই সময়ে যাতে পর্যটকরা খাগড়াছড়িতে না আসে। জনস্বার্থে এবং নিজেদের সঙ্গে আপাতত ভ্রমণ থেকে বিরত থাকায় উত্তম। আর বিদেশি পর্যটকদের আমরা খাগড়াছড়ি ভ্রমণের অনুমতি আপাতত দিচ্ছি না। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক ও সিভিল সার্জনকে সদস্য সচিব করে ১১সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জাতীয় কমিটির নির্দেশনা মোতাবেক কাজ করবে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, খাগড়াছড়ির কোনো নাগরিক যদি বিদেশ থেকে আসে তাহলে তাকে অবশ্যই হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। তারা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকছে কিনা সেটি আমরা মনিটরিং করবো।

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধের সময় শিশুদের বাসায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। 

খাগড়াছড়ির ডেপুটি সিভিল সার্জন মিটন চাকমা বলেন, একদিকে পর্যটন এলাকা। তাছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ যাতায়াত করছে তাই খাগড়াছড়ির করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়াটা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। একমাত্র স্থানীয়দের সচেতনতা করোনা থেকে নিরাপদ রাখতে পারে। বিদেশ থেকে আসা খাগড়াছড়ির নাগরিকদের প্রথমে আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে আসার আহ্বান জানান তিনি। ভারত ফেরত পাঁচজনকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।

অপরদিকে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে ওয়ার্ডে গত ১৬ই মার্চ থেকে ভর্তি বৃদ্ধা বাড়ি ফিরে গেছেন। শুক্রবার সকালে বৃদ্ধা করোনা ভাইরাস মুক্ত থাকার প্রতিবেদন পাওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থাকা বাড়ি ফেরার অনুমতি দেন। খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ডা: নুপুর কান্তি দাশ এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

এরআগে ভারত ফেরত এক নারী খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আসে। তার কাছ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা: নুপুর কান্তি দাশ। আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা রোগীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালোর দিকে অগ্রগ্রতি বলেও জানান তিনি।

গত ১৬ই মার্চ বিকেলে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হন ভারত ফেরত ওই বৃদ্ধা। জ্বর, সর্দি ও কাশি থাকায় তাকে অন্য রোগীদের কাছ থেকে আলাদা করে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। তার কাছ থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ঢাকার রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট(আইইডিসিআর) পরীক্ষা শেষে নিশ্চিত হওয়া যায় তিনি সংক্রামণ মুক্ত।

অন্যদিকে খাগড়াছড়ি জেলায় বিদেশ ফেরত যাত্রীর সংখ্যা ২৪৪জন হলেও হোম কোয়ারেন্টাইন রয়েছে মাত্র ১২জন। খাগড়াছড়িতে বিদেশ থেকে ফিরেছেন ২৪৪জন। এরমধ্যে ১২জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হলেও বাকিদের কোনো খোঁজ নেই। বিদেশফেরতদের খোঁজ নিতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো: আব্দুল আজিজ এ তথ্য জানিয়েছেন।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন দেশে করোনা ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। সংক্রামক থেকে বাঁচতে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, বাহরানসহ বেশ কয়েকটি দেশের ২৪৪জন খাগড়াছড়িতে ফিরেছেন। তার মধ্যে একজনকে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে ও ১২জনকে হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হলেও বাকিদের কোনো খোঁজ নেই। বিদেশফেরতদের মধ্যে খাগড়াছড়ি সদরের ৭০জন, দীঘিনালার ৪৬জন, গুইমারার ১৩জন ও মহালছড়ির ১৪জন বলে জানা গেছে।

পুলিশ সুপার মো: আব্দুল আজিজ বলেন, ইতোমধ্যে ইমিগ্রেশন থেকে আমরা তালিকা পেয়েছি। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব থানাকে অবহিত করা হয়েছে। আমাদের অনুরোধ বৃহত্তর স্বার্থে তারা যেন আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এক্ষেত্রে বিদেশিফেরতদের তথ্য দিয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন নূপুর কান্তি দাশ বলেন, এটি উদ্বেগের বিষয়। সচেতনতা ছাড়া করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার সুযোগ নেই। তাই যারা বিদেশ থেকে ফিরছেন অবশ্যই হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করার অনুরোধ করেন তিনি।

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক ও সিভিল সার্জনকে সদস্য সচিব করে ১১জন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি জাতীয় কমিটির নির্দেশনা মোতাবেক খাগড়াছড়িতে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কাজ করবে। খাগড়াছড়ি পুরো জেলাতে ৮০টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুুত করা হয়েছে। এরমধ্যে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে ৩০টি বেড এবং অন্য উপজেলাগুলোতে মোট ৫০টি বেড প্রস্তুুত রাখা হয়েছে। খোলা হয়েছে কন্ট্রোল রুম।