Opu Hasnat

আজ ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০২০,

মুন্সীগঞ্জে আলু উত্তোলণ শুরু হলেও লোকশান আতঙ্কে হতাশ কৃষক কৃষি সংবাদমুন্সিগঞ্জ

মুন্সীগঞ্জে আলু উত্তোলণ শুরু হলেও লোকশান আতঙ্কে হতাশ কৃষক

দেশে আলু উৎপাদনের সর্ববৃহত জেলা মুন্সীগঞ্জ। তাই আলু মুন্সীগঞ্জের প্রধান অর্থকরি ফসল। জেলার দুই তৃতীয়াংশ কৃষিজ জমিতে আলুর চাষ করে থাকেন এ জেলার কৃষকরা। এরই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে প্রতিবারের মতো এবারো মুন্সীগঞ্জে আলু চাষ করেছে কৃষকরা। প্রতি বছরের মার্চ মাসে কৃষকের স্বপ্নে রোপন করা এই সোনালী আলু উত্তোলণ করে থাকে। তাই মুন্সীগঞ্জে এখন আলু উত্তোলন শুরু হয়েছে। মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে কৃষকরা আলু উত্তোলন শুরু করেছেন। কৃষককুল আলু তোলায় বেজায় ব্যস্ত মাঠে। সারি সারি আলু তোলার পর বস্তাবন্দি করা থেকে শুরু করে কোল্ড ষ্টোরেজ কিংবা বাজারজাত করনে আলু চাষীদের চারপাশে তাকানোর ফুসরত নেই। উৎপাদন ভালো হওয়ায় আলুচাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে। মৌসুমের শুরু থেকেই আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে।

তবে গত পাঁচ বছরে লোকসানের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া কৃষকরা এখন প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

গত পাঁচ বছরে আলুর ফলন ভালো হলেও বস্তাপ্রতি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লোকসান হওয়ায় এবার লাভের মুখ দেখবেন কিনা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।

এবার মুন্সীগঞ্জে আলুর ফলন ভালো হবার কারণে কৃষকের চোখে-মুখে খুশির জোয়ার লাগলেও গত চার বছর আলুতে লোকসান হবার কারণে। কৃষকের মুখে ফুটে উঠা হাসির ঝিলিক ফিকে হয়ে মলিনতায় রুপ নিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানা গেছে, এবার মুন্সীগঞ্জে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশী জমিতে আলু চাষ করা হয়েছে। বাম্পার ফলন হওয়ার এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে এবার আলুর বাম্পার ফলনে কৃষকের চোখে স্বপ্নের হাতছানি দিচ্ছে ওই গোল আলু। মার্চের শুরু থেকে মুন্সীগঞ্জ সদর সহ জেলার ৬ টি উপজেলা জুড়ে আলু তোলার মহোৎসব শুরু হয়েছে। কৃষকের সঙ্গে আলু তোলার কাজে কৃষানী ও শিশুরাও নেমে পড়েছে মাঠে।

এবার আলুতে গত চার বছরের লোকসান পুষিয়ে বেশ লাভবান হবেন কৃষকরা-এমন আশায় বুকে বেঁধেছেন জেলার হাজারো আলু-চাষী।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-সহকারি কৃষি অফিসার মিয়া আল-মামুন জানান, এবার চলতি মৌসুমে মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার চরাঞ্চলসহ ৬ উপজেলায় ৩৬ হাজার ৪‘শ ৯৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে কৃষকরা জমিতে ৩৭ হাজার ৫’শ ৯০ হেক্টর জমিতে আলু রোপন করেছেন। 

গত বছর আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ উপজেলায়  হাজার ৩৮ হাজার ৮’শ হেক্টর জমি। কৃষকরা জমিতে ৩৮ হাজার ৩’শ হেক্টর জমিতে আলু রোপন করেছেন। 

জেলায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টন আলু বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। জেলার ৭৪ টি হিমাগারে ধারণ ক্ষমতা ৫ লাখ মেট্রিক টন। বাকি আলু বিভিন্নভাবে সংরক্ষণসহ কম মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

গত পাঁচ বছর দেশের বিভিন্ন জেলায় আলু উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হওয়ায় মুন্সীগঞ্জের আলু ব্যবসায়ীরা মনপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করছে।

সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা সহ বিভিন্ন উপজেলার মাঠে গিয়ে দেখা গেছে-কৃষককুল আলু তোলায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।

সদরের চরাঞ্চলের গ্রামে গ্রামে দিগন্ত জোড়া মাঠের পর মাঠ জুড়ে যেন গোল আলুর সমারোহ। চারপাশে যেদিকে দৃষ্টি পড়ে সর্বত্র শুধুই আলু আর আলুর দৃশ্য পলক চোখে পড়ে।

সরেজমিনে আরো দেখা গেছে- কৃষকরা মাঠের মাটি খুঁড়ে তুলে আনছে একেকটি আলু। আবার উত্তোলন শেষে মাঠেই আলুর স্তুুপ করে রাখছেন। পরে এ আলু বস্তাবন্দি করে বিক্রির জন্য বাজারজাত করা হবে। আবার কেউ কেউ এখনই বস্তাবন্দি করে আলু সংরক্ষনের জন্য কোল্ডষ্টোরেজে নিয়ে যাবেন।

জেলা সদরের রামশিং গ্রামের চাষী আব্দুর রহমান জানান, আলু তোলার শুরুতেই আলুর ভালো না মন্দ বোঝা যাচ্ছে না।

এ আলু এখন চাষীর সোনালী স্বপ্ন পুরনের পথ দেখছে। জেলার টঙ্গিবাড়ী উপজেলার ধামারন গ্রামের আলু চাষী আলম শেখ জানান, এবার আলুতে তারা লোকসান নয় লাভবানই হবেন।

আলু তোলায় কৃষককুল মাঠেই দিনরাত সময় অতিবাহিত করছে। রাতের ঘুম পর্যন্ত হারাম হয়ে গেছে তাদের। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষককুল সকাল থেকে সন্ধা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন আলু উত্তোলনে। জেলায় ৭৮ হাজার কৃষক পরিবারের ৪ লাখ ৬৮ হাজার সদস্য কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত।

জেলার সিরাজদীখান, লৌহজং, শ্রীনগর, গজারিয়া, টঙ্গিবাড়ী ও সদরসহ ৬ উপজেলার প্রতিটি গ্রামেই আলু তোলার মহোৎসব চলছে। বিস্তির্ণ মাঠে কৃষকদের অবিরাম আলু তোলার দৃশ্য সত্যি অপূর্ব এক চিত্র।

সদর উপজেলার চরাঞ্চল আধারা ইউনিয়নের তাঁতীকান্দি গ্রামের আলু ব্যবসায়ী মাহমুদ মিয়া জানান, সবে মাত্র আলু তোলা শুরু হয়েছে। মার্চের পুরো মাস জুড়েই এ আলু তোলার মহোৎসবে মেতে থাকবে কৃষকরা।

আলু কেনার জন্য পাইকাররা ইতিমধ্যেই আলু সংগ্রহ করতে মাঠে ঘুড়তে দেখা গেলেও আলুর দর-দাম করে চলে যাচ্ছেন।

এ বছরও কি আলু বিক্রিতেও গত পাঁচ বছরের মতো লোকসান গুনতে  হবে কিনা-এই ভেবে কৃষকরা হতাশা ও দুশ্চিন্তায় দিনযাপন করছেন ।

এদিকে, জেলায় আলু তুলতে আসা শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে জেলা সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় ঘুরে জানা গেছে, অন্যান্য জেলা থেকে আসা নারী-পুরুষ শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি দেয়া হচ্ছে না। তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা অভিযোগ করে বলেন, প্রতিদিন আমাদের মজুরি দেওয়া হয় ৩০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা। কিন্তু স্থানীয় শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হচ্ছে ৪০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা করে। শ্রমিকদের এই মজুরি বৈষম্যের এ বিষয়টি নিয়ে শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে শ্রমের মজুরি সবার জন্য সমান রাখার দাবি জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ কোটি টনের ওপরে আলু উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জে বছরে আলু উৎপন্ন হয় প্রায় ১৩ লাখ ৭৮ হাজার ৮শ ৮৫ টন। বাংলাদেশে ৮০ লাখ টন আলুর চাহিদা রয়েছে। অতিরিক্ত আলু বিদেশে রপ্তানি করা গেলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান এবং আলু চাষে আগ্রহী হতেন। মুন্সীগঞ্জে ডায়ামন্ড, কার্ডিনাল, এষ্টারিক্স, সাগিতা, প্রেটোনিজ, মুলটা, বেনিলা, গ্রানোলা জাতের আলু উৎপাদন হয়ে থাকে। তবে এদের মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলায় ৯০ ভাগ ডায়ামন্ড জাতের আলু আবাদ করে থাকে কৃষকরা।