Opu Hasnat

আজ ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার ২০২০,

সনৎ বসু’র একগুচ্ছ ছড়া শিল্প ও সাহিত্য

সনৎ বসু’র একগুচ্ছ ছড়া

একটি দিনে

 আমি তখন ফোর- এ পড়ি, ইস্কুলে যাই বাসে
এক গাড়িতেই তনয় বিতান ঈপ্সিতারাও আসে ৷
সেদিন ছিল দুপুর বেলা আকাশ মেঘে ঢাকা, 
হঠাৎ করে ঝড় উঠতেই
মুহূর্তে সব ফাঁকা ৷
গুড়ুম গুড়ুম মেঘের আওয়াজ, কানফাটানো বাজ
জানলা কপাট বন্ধ সবই, বন্ধ পড়া আজ ৷
এমন সময় কারেন্ট উধাও, অন্ধকারে ডুবে
ভূতের মতো স্কুলবাড়িটা 
দাঁড়িয়ে গেল পুবে ৷

ঝড়ের পরে বৃষ্টি এল 
বৃষ্টি না টাইফুন
সোঁসোঁ গোঁগোঁ ফুঁসছে দানব
করবে বুঝি খুন ৷

দুপুর গেল বিকেল গেল
রাতটাও যায় যায়,
আমরা তখন বন্ধ ঘরে
কাঁদছি বসে হায় ৷
ক্ষুধাকাতর তৃষ্ণাকাতর
হাজার খানেক শিশু,
দু’চোখ বুজে করছি প্রেয়ার
সেভ আস সেভ আস যীশু ৷

আন্টি এবং স্যাররা তখন
সবাই মিলে বসে
বললে শোনো যা হয় হোক
চেঁচাও গলা কষে ৷
হো হৈ হৈ হল্লা ওঠে
তিন প্রহরের রাতে,
অমনি দেখি স্কুলবাড়িটা
এক পা দু- পা হাঁটে ৷

হাঁটতে হাঁটতে রাজভবনে রাজ্যপালের হাতে
স্মারকলিপি দিয়ে যখন
ফিরছে সে মৌতাতে,
ওমা, দেখে অবাক কান্ড
স্কুলবাড়িটাই নেই
তার জায়গায় বিরাট পুকুর
হারিয়ে গেল খেই ৷

এসব যখন ঘটছে তখন আমি তপঙ্কর
তিনতলাতে একটি ঘরে কাঁপছি ভয়ঙ্কর
বাবা মা ভাই কেউ এল না
কি যে ব্যাপার ছাই
আমার মতো সবারই কি
বাড়িতে লোক নাই!

ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ি
যখন ভাঙে ঘুম
তাকিয়ে দেখি লিখছি ছড়া
স্বপ্ন দেখার ধুম ৷৷
************

কুসংষ্কারের বিরুদ্ধে

ছোট্ট খোকা মাটির দাওয়ায়
দিচ্ছে নতুন হামা
মুখের ভেতর কাদার ডেলা
গায়ে নতুন জামা

খেলছে খোকা খেলছে
খেলতে খেলতে পায়ের চাপে
ঘুটের ঝুড়ি ঠেলছে

হঠাৎ সে কী চিৎকার
আছাড় পিছাড় গড়ায় শিশু
মা দেয় কাকে ধিক্কার

কাকড়াবিছে কাকড়াবিছে
বলেই মাতা ছুটলোয
ছুট্টে গিয়ে ওঝার পায়ে
নিজের মাথা কুঁটলো

মন্ত্র পড়ে ওঝা
তেলসিঁদুর আর পানসুপাড়ি
ক্ষতস্থানে গোঁজা

তাবিজ পড়ায় ওঝা
দু-চোখ বুঁজে ঘুমায় শিশু
যায় না কিছু বোঝা

দু-ঘন্টা পার খোকার যখন
সারা শরীর কাঁপছে
হাত পা শীতল নাকের ফুটোয়
গ্যাজলা এসে ঢাকছে

হাসপাতালে হামলে পড়ে
ওদোলচোয়া গ্রামটা
কিন্তু যে হায় সময় কোথায়
স্তব্ধ খোকার প্রাণটা ৷

অজ্ঞতা আর অশিক্ষাতে
কতই জীবন ঝরছে
মায়ের ভুলে বাবার ভুলে
শিশুরা সব মরছে

তাবিজ কবচ ঝাঁড়ফুকেতে
অন্ধকারের রাস্তা
বিজ্ঞানে আর যুক্তিবাদে
ফেরাও সবার আস্থা

অসুখ হলেই হাসপাতালে
ওঝা গুনীন আর না
বলছে শিশুর নিথর শরীর
কুসংষ্কারের বাড় না ৷৷

************

ধলাই গাঁয়ের বলাই

পোনাইপুরের ধলাই গাঁয়ের
বলাইচরণ সরকার
মাটির দেশের সবুজ কিশোর
নামটি জানা দরকার ৷

বাবা যে তার মুনিষ খাটে
মা নিয়েছে শয্যা
পেটের দায়ে হকার সে আজ
নেই দ্বিধা লাজ-লজ্জা ৷

ট্রেন ঘুরে সে লজেন্স বেঁচে
সংগে বেঁচে হজমি
রাত জেগে তার চলছে পড়া
আমরা ক-জন খোঁজ নি!

সকাল থেকে দুপুর
রোদ বৃষ্টি টাপুর টুপুর
বোয়েম কোলে ছুটছে বলাই
হাওড়া থেকে হাপুর ৷

ইসকুলে রোজ হয় না যাওয়া
রোলের খাতায় ব্যাডবয়
বলাই তবু পরীক্ষাতে
সব বিষয়েই ফার্স্ট হয় ৷

ফাইট বলাই ফাইট
জিততে তোমায় হবেই বাছা
পৌনে পাঁচফুট হাইট ৷

ফাইট বলাই ফাইট
মাটির চালায় টেমির আলো
গাঁয়েতে নেই লাইট ৷

ফাইট বলাই ফাইট
মাধ্যমিকে পাঁচটি লেটার
নিন্দুকেরা টাইট ৷

ধলাই গাঁয়ের বলাই
লড়াই করে চাকরি পেল
পূর্ণ ষোলোকলাই ৷

মা-র হাসিমুখ হাসপাতালে
বাবার মনেও দুখ নাই
ধলাই গাঁয়ের বলাইচরণ
রাখবি কোথায় সুখ ভাই!