Opu Hasnat

আজ ২০ জুলাই শুক্রবার ২০১৮,

নিষেধাজ্ঞা শেষে মানিকগঞ্জের পদ্মা-যমুনায়

প্রচুর ডিমওয়ালা মা-ইলিশ ধরা পড়ছে, বিনষ্ট হচ্ছে বংশ বিস্তার মানিকগঞ্জ

প্রচুর ডিমওয়ালা মা-ইলিশ ধরা পড়ছে, বিনষ্ট হচ্ছে বংশ বিস্তার

মানিকগঞ্জের পদ্মায়-যমুনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে ডিমওয়ালা মা ইলিশ। আরিচা ঘাটসহ নদীর তীরবর্তি মাছের আড়ৎগুলোতে ডিময়ালা ইলিশ মাছে ছয়লাব। এসব আড়তের প্রচুর পরিমাণ মাছ রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার পরের দিন এত মাছ কোথা থেকে আমদানী হলো এটাও অনেকের প্রশ্ন ? আড়তে যে সব মাছ দেখা গেছে তার বেশীর ভাগ মাছই ছিল বরফে রাখা।  এতে একদিকে সরকারের ইলিশ রক্ষার অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে ইলিশের বংশ বিস্তার বিনষ্ট হচ্ছে। এভাবে ডিমওয়ালা মা-মাছ ধরা অব্যহত থাকলে ভবিষতে এ দেশ থেকে জাতীয় মাছ ইলিশ বিলুুপ্ত হওয়ার আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা।  তাই ইলিশের এ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞার সময় আরো বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন তারা।

জানাযায়, বর্তমানে চলছে ইলিশ প্রজননের ভরা মৌসুম। এসময় ইলিশ মাছ ডিম ছাড়ার জন্য সমুদ্র থেকে নদীতে ওঠে আসে। স্রোতের বিপরীতে চলতে থাকে এবং ডিম ছেড়ে বংশ বৃদ্ধি করে। প্রজনন মৌসুম হিসেবে ইলিশের বংশ বৃদ্ধির লক্ষে গত ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ০৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ইলিশ মাছ ধরা, পরিবহণ করা এবং বিক্রি করা নিষিদ্ধ করেছিল সরকার। কিন্ত ওই সময়ের মধ্যে মা ইলিশ ডিম নদীতে ছাড়া শেষ করতে পারেনি। ফলে এ নিষেধাজ্ঞা ওঠে যাবার পর মানিকগঞ্জের শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা-যমুনায় জেলেদের জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ডিমওয়ালা মা ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে। এতে একদিকে সরকারের ইলিশ রক্ষার যে পদক্ষেপ তা ভেস্তে গেছে। অপরদিকে বিনষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার টন ইলিশের বংশ বিস্তার। নদীতে জাল ফেললেই ধরা পড়ছে চকচকে রূপালী ইলিশ। ফলে জেলেদের পাশাপাশি অনেক সৌখিন মৎস শিকারীরাও নদীতে এসেছে মাছ ধরতে। বর্তমানে শহর ও গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজারে ইলিশ মাছের ছড়াছড়ি। এর মধ্যে বেশীর ভাগই রয়েছে ডিমওয়ালা মা-ইলিশ। এসব মাছ আর কিছু দিন নদীতে থাকলেই ডিম ছাড়তো। বৃদ্ধি পেতো হাজার হাজার ইলিশ। এভাবে ডিমওয়ালা মাছ ধরা হলে এক সময় এ দেশ থেকে জাতীয় মাছ ইলিশ বিলুপ্তি হয়ে যাবে। ফলে ইলিশের এ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার ওপর সরকারী নিষেধাজ্ঞার সময়  বাড়িয়ে এক মাস করা দরকার বলে অনেকেই মনে করছেন। এতে জেলেদের সময়িক কষ্ট হলেও মা ইলিশগুলো অনায়াসে নদীতে ডিম ছেড়ে বংশ বিস্তার করতে পারবে অনেকেই মনে করেন। এতে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। বিলুপ্তির পথ থেকে রক্ষা পাবে জাতীয় মাছ ইলিশ। নদীতেও সারা বছর পাওয়া যাবে  ইলিশ।  

স্থানীয় জেলেরা জানান, সরকার যদিও ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ০৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিন ইলিশের প্রজনন মৌসুম হিসাবে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্ত এ সময়ে মা ইলিশ তেমন একটা ডিম ছেড়ে ছাড়তে পারেনি। মুলত ইলিশের ডিম ছাড়ার সঠিক সময় হচ্ছে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। যারা নদীতে মাছ ধরে তারাই এক মাত্র ভাল বলতে পারবে কখন ইলিশ ডিম ছাড়বে। ইলিশের প্রজনন মৌসুম নির্ধারণের জন্য স্থানীয় প্রশাসন যদি জেলেদের সাথে আলাপ করে নিতো তাহলে ভাল হতো। এতে সরকারের ইলিশ রক্ষার পদক্ষেপও ভেস্তে যেতনা বলে তারা মনে করেন। ডিমওয়ালা মাছ ধরা বন্ধ করা না হলে আগামীতে এ দেশ থেকে ইলিশ মাছ বিলুপ্তি হয়ে যাবে বলে অনেকেই মনে করছেন। 

শিবালয়ের ছোট আনুলিয়া গ্রামের জেলে রবি হলদার বলেন, আমরা ছোট বেলা থেকে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরি। মাছ ধরাই আমাদের একমাত্র কাজ। মাছ ধরে বিক্রি করে সারা বছর সংসার চালাই। আমরা বুঝতে পারি ইলিশ মাছ কখন ডিম ছাড়বে। সরকার ইলিশের ডিম ছাড়ার যে সময় মনে করেছিল তা আসলে সঠিক ছিলনা। তাই নদীতে ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়ছে।  মুলত এবার অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় ছিল মা ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রকৃত সময়। এসময় যদি ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতো তাহলে সরকারের ইলিশ রক্ষার পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হতো। আমরাও ওই সময় ইলশ মাছ ধরা থেকে বিরত থাকতাম এবং সারা বছর নদীতে প্রচুর ইলিশ মাছ পাওয়া যেতো। 

জাফরগঞ্জের নাঠু হলদার জনান, সরকার নির্ধারিত প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় অনেক অসাধু জেলেরা প্রশসনকে ফাকি দিয়ে নদীতে মাছ ধরেছে। আমরা নদীতে যাইনি। ফলে অনেক কষ্ট করে আমাদের সংসার চালাতে হয়েছে। কিন্ত এখন কোন নিষেধাজ্ঞা নেই বলে ডিমওয়ালা মাছ ধরতে আপত্তি নেই। তাই মা ইলিশ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি।    

তেওতা এলাকার জেলে গোপাল হলদার জানান, নদীতে এখন জাল ফেললেই ডিমওয়ালা মা ইলিশ ধরা পড়ছে। ডিমওয়ালা মাছ মারতে যদিও মায়া লাগে । এরপরও আমরা মা ইলিশ ধরে বাজারে নিয়ে বিক্রি করছি। কারণ এটা আমাদের পেশা। একাজ করে আমরা সংসার চালাই। বিগত ১৫ দিন নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখছিলাম। কিন্ত সরাকার উপকুলীয় এলাকার জেলেদেরকে সাহায্য দিলেও আমারদেরকে কোন সাহায্য সহযোগীতা দেয়নি। ঐ সময় পরিবার পরিজন নিয়ে আমাদেরকে অনেক কষ্ট করে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরিচা ঘাটের জৈনক এক মাছের আড়ৎদার বলেন, সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগীতায় স্থানীয়  কিছু অসাধু জেলেরা নিষেজ্ঞার মধ্যে মাছ ধরে বরফ দিয়ে ফ্রিজাপ করে রাখে। যে মাছ ৯ অক্টোবর নিষেজ্ঞা ওঠে যাবার পরে দিন ১০ অক্টোবর আড়তে এনে বিক্রি করে। যে কারণে নিষেজ্ঞা ওঠে যাবার পরপরই এত মাছের আমদানী হয় আড়তে। এসব অসাধু জেলেদের প্রতিরোধ এবং নিষেজ্ঞার মেয়াদ না বাড়ালে মাছের বংশ বিস্তার বৃদ্ধি পাবেনা বলে তিনি জানান।  

শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলা মৎস বিভাগ সুত্রে জানা যায়, নিষেজ্ঞার মধ্যে অভিযান চালিয়ে 
শিবালয়ে ০.৩৮ মেট্রিক টন মাছ, ৪.৪৫ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়। ৪৪ জন জেলেকে ১ লাখ ৭শ’ ৬৫ টাকা জড়িমানা করা হয়। 

হরিরমাপুরে ৮টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। ১শ’৪৪ কেজি মাছ, ২শ’ ৫০ মিটার জাল জব্দ করা হয়। ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এরমধ্যে ৪জনকে ১ বছর করে কারাদন্ড দেয় হয়। বাকীদেরকে ২হাজার টাকা করে মোট ৩৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। 

দৌলতপুরে ৪টি মোবাইল কোর্ট করে ৫২ কেজি মাছ, ১৯ হাজার ৫শ’মিটার জাল জব্দ করা হয়। ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এর মধ্যে ২ জনের ১৫দিন করে জেল বাকী ৭ জনকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।  

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস কর্মকর্তা নুরতাজুল হক বলেন, এবার গতবারের চেয়ে ৪ দিন বেশী বাড়ানো হয়েছে। তারপরও আরো ২/৪দিন বাড়ালে ভাল হতো। এতে মা ইলিশ মাছগুলো আরো বেশী ডিম ছাড়তে পারতো। আগামী বছর নদীতে আরো বেশী মাছ পাওয়া যেতো। ইলিশের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পেতো।  মাছ ধরার বন্ধের এ সময়ে জেলেদের সহযোগীতার ব্যাপারে উর্দ্ধতন কর্মকর্তাদেরকে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান। এছাড়া বিভিন্ন সভাসেমিনারেও আলোচনা করা হয়ে থাকে।