Opu Hasnat

আজ ২১ জুলাই শনিবার ২০১৮,

পাহাড়ে তিন পার্বত্য জেলার পর্যটন ব্যবসায় ধস, প্রতিদিন গড়ে দেড়কোটি টাকা গচ্ছা খাগড়াছড়ি

পাহাড়ে তিন পার্বত্য জেলার পর্যটন ব্যবসায় ধস, প্রতিদিন গড়ে দেড়কোটি টাকা গচ্ছা

রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, অতিবৃষ্টি ও পর্যটক অপহরণের ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলা পর্যটন শিল্পে ধস নেমেছে। ভরামৌসুমেও পর্যটক শূন্য হযে পড়ে রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নীলাভূমি খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-বান্দরবানের পর্যটন স্পটগুলো। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আগমন না থাকায় হোটেল-মোটেল গুলোও রয়েছে খালী পড়ে। এতে খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-বান্দরবানে হোটেল-মোটেল ও পরিবহণ মালিকদের প্রতিদিন গড়ে দেড়কোটি টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শীঘ্রই এ শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অক্টোবর থেকে শুরু করে এপ্রিল মাস পর্যন্ত পর্যটকের পদচারনায় মুখরিত হয়ে থাকে খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-বান্দরবান। প্রতিবছর এই মৌসুমে প্রকৃতির নির্মল ছোঁয়া পেতে পর্যটন স্পটগুলোতে ঢল নামে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের। কিন্তু খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-বান্দরবানে এবারের বর্ষায় রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়। কিছু জায়গায় সড়ক ধস ও খানা-খন্ডসহ বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় স্বাভাবিক যান চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। তাছাড়া মৌসুমের শুরুতেই ভারত সীমান্তবর্তী বান্দরবান-রাঙামাটির বিলাইছড়ি থেকে দুই পর্যটকসহ চারজনকে অপহরণের কারণে কমে গেছে পর্যটকের সংখ্যা। 

পর্যটকের ভরামৌসুম আসার সাথে সাথে খাগড়াছড়ির রিছাং ঝর্না, আলুটিলা রহস্যময় গুহা, দীঘিনালা তৈদুছড়া, নুনছড়ি দেবতা পুকুর(নেহ কেইং), রাংগামাটির সুভলং ঝর্না, সাজেক ভ্যালী, বান্দরবান’র চিম্বুক, নীলগিরি, নীলাচল, মেঘলা, স্বর্ণ মন্দির, শৈল জলপ্রপাত, রিজুক ঝর্ণা, নাফাকুম ও কিংবদন্তি বগালেকসহ ছোট-বড় অর্ধশত পর্যটন কেন্দ্রগুলো নতুন সেজে প্রকৃতি প্রেমীদের বরণে প্রস্তুত থাকলেও পর্যটক না আসায় পর্যটন ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।

খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলের কর্মকর্তা ক্যচিং মারমা জানান, অপহরন হওয়ার আগেও দেশী/বিদেশী পর্যটন পদচারনায় সপ্তাহ/মাস খানিক আগে বুকিং করে আসতো এবং থাকতে ভিড় জমে যেতো পর্যটকরা। এখন হাতে-গোনা কিছু সংখ্যক ছাড়া একেবারেই নেই বললেই চলে ।    

বান্দরবান হিলসাইট রিসোর্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মনসুর বলেন, গত বছর দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায়ও বান্দরবানের পর্যটন শিল্পে যে ক্ষতি হয়েছে তা দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরে এসেও এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছেনা। তার মধ্যে পর্যটক অপহরণের কারণে কোন পর্যটকই আসছেনা বান্দরবানে। 

এদিকে ব্যাবসায়ীরা জানান, খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-বান্দরবানে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট সেন্টার,পরিবহণ, মার্কেট ও পর্যটন স্পটগুলোতে সংস্কার ও রক্ষণা-বেক্ষণে লক্ষ কোটি টাকা পুঁজি দিয়েও লাভের মুখ দেখছেননা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যাবসায়ীরা। বরঞ্চ শুধুমাত্র খাগড়াছড়ি-রাংগামাটি-বান্দরবানে এইসব ব্যবসায় প্রতিদিন গড়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায়     দেড়কোটি টাকা। আরো কিছুদিন এভাবে চললে লোকসানের কারণে এইসব শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ফারুক পাড়ার মিনথাং হস্তশিল্পের স্বত্তাধিকারী লালমিনথাং বম জানান, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আগমন না থাকায় কোমর তাঁতে তৈরি কম্বল, মাফলা, বিভিন্ন পোষাক ও বাঁশের তৈরি হস্ত শিল্পের হরেক রকম জিনিসপত্রগুলো বিক্রি না হওয়ায় এর উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। আর তাঁত-হস্ত শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজার হাজার মানুষ আর্থিক সংকটে ভূগছেন।

মাষ্টার গেষ্ট হাউজের মালিক থোয়াইংচপ্রæ মাষ্টার বলেন, ঈদের ছুটিতে বান্দরবানে দুই থেকে তিনদিন পর্যটকের ভরপুর থাকলেও প্রায় পনেরদিন ধরে গেষ্ট হাউজের প্রতিটি রুম খালি পড়ে রয়েছে। অগ্রিম বুকিং করা রুমের টাকাও ফেরত নিয়ে যাচ্ছেন পর্যটকরা। কিন্তু কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত প্রদান করতে হয়। এভাবে চলতে থাকলে অনেক কর্মচারীকে বাধ্য হয়ে ছাটাই করতে হবে।

বান্দরবান হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, বান্দরবানে পর্যটন, রিসোর্ট সেন্টার ও হোটেল-মোটেল ব্যবসায় প্রতিদিন গড়ে ব্যাবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। সহসা এ পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে এবং শীঘ্রই এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

খাগড়াছড়ি আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বেষ্টিত খাবার প্রতিষ্টান সিষ্টেম রেষ্টুরেন্ট এন্ড হোটেলের মালিক অং মারমা জানান, সামান্য ঘটনাতে কেই ভিতস্থ নয় । যারা বেড়াতে চাই তারা কোন বাধা মানবেনা আসতে থাকবে । সুদুর সাজেক ভ্যালী, রিছাং ঝর্না, আলুটিলা গুহাসহ ইত্যাদি পর্যটন ষ্পট ঘুরে ঝাকে ঝাকে জীপ/মাইক্রো গাড়ীতে করে পাহাড়ী খাদ্য আহার মেতাতে প্রতিদিন আসছে ।

খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার মোঃ মজিদ আলী জানান, বান্দরবান রুমা অপহরনে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া আইন শৃংখলা ভাল অবস্থা থাকলেও খাগড়াছড়ির জেলাসহ অন্যান্য পর্যটন স্পট এলাকায় পুলিশের পাশাপাশি ডিবি/ডিএসবি মোবাইল টিম জোরদারভাবে তহল বাড়ানো হয়েছে ।

রাংগামটির পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞলিক পরিষদের সদস্য মংনুচিং মারমা মনু জানান, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে এই সব ঘটনার অন্তরায় হয়ে থাকতো না, বরং পাহাড়ী-বাংগালী সৌহাদ্যপূর্ন ভ্রাতৃত্ববোধ সম্পর্ক আরো বেশী করে বাড়তো । 

বান্দরবান জেলা প্রশাসক মিজানুল হক চৌধুরী বলেন, পর্যটন মৌসুমের কথা বিবেচনা করে পর্যটন স্পটগুলোতে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে। তাছাড়া দুই পর্যটক অপহরণের পর থেকে পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমনের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৩অক্টোবর শনিবার বিকালে রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার বড়থলি ইউনিয়নে নতুন পুকুর এলাকা থেকে ঢাকার দুই পর্যটক ও স্থানীয় দুই গাইডসহ চারজনকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে ভারত সীমান্তের এলাকায় নিয়ে যায় স্ত্রাসীরা।