Opu Hasnat

আজ ১ এপ্রিল বুধবার ২০২০,

সাংস্কৃতিক মৌলবাদ ধর্মীয় মৌলবাদের থেকেও নিকৃষ্ট : আহমেদ সাব্বির মতামত

সাংস্কৃতিক মৌলবাদ ধর্মীয় মৌলবাদের থেকেও নিকৃষ্ট : আহমেদ সাব্বির

শিল্প, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির হিংসাত্বক চর্চা এবং তার বহিঃপ্রকাশই হল সাংস্কৃতিক মৌলবাদ বা কালচারাল ফান্ডামেন্টালিজম। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উচ্চ শিক্ষিত মানুষগুলোর মধ্যেই এধরণের মৌলবাদের চর্চা সবচাইতে বেশী। শুধুমাত্র সাহিত্যের দিকটা খেয়াল করলেই সাংস্কৃতিক মৌলবাদের একটা স্পষ্ট উদাহরণ চোখে পড়ে।

জন্ম থেকেই জেনে এসেছি শিল্প সাহিত্যের কোন দেশ কাল পাত্রের গন্ডি নেই। এখানটায় মানুষের বিচরণ মুক্ত স্বাধীন। কিন্তু ক্রমশ বড় হতে হতে জানলাম এখানেই সবথেকে বড় পরাধীনতা। এখানেই সবথেকে বেশী মৌলবাদের আবাদ।

আমি যখনই কিছু লিখবার চেষ্টা করি তখনই আমাকে চারদিক থেকে চেপে ধরা হয়। আমাকে ফেলে দেয়া হয় নিয়মের বেড়াজালে।

ধর্মীয় মৌলবাদীরা মানুষকে ধর্মের একেবারে ভেতরে প্রবেশ করানোর জন্য বরাবরই চাপ সৃষ্টি করেছে; একথা সবারই জানা। কেননা তাদের মতে জীবনের মত মানুষের চিন্তা ভাবনাও সীমাবদ্ধ। এর বাইরে ভাবার চেষ্টা বা ইচ্ছা কোনটাই তাদের নেই।

সাংস্কৃতিক মৌলবাদীরাও ঠিক একই ধরণের পথের পথিক। তাদের চিন্তা ভাবনা আটকে গেছে পুরাতনের সোঁদা গন্ধে ভরা নস্টালজিয়ায়। আর দরুন তারা প্রতিনিয়ত বাধার সৃষ্টি করেছে নতুন সৃষ্টির পথে।

সাহিত্যাঙ্গনে সাংস্কৃতিক মৌলবাদীরা জীবনভর আমাদের আটকে রাখতে চেয়েছে রবী ঠাকুর, নজরুল কিংবা সুনীলের ভেতরেই। নতুন তাদের কাছে উপেক্ষিত, বেদআত কিংবা হারামের মত পাপ সমতুল্য। তাদের এই চিরায়তের চর্চাই সাহিত্যের সম্মুখযাত্রার বড় বাধা। তারা কখনোই অগ্রসর ছিল না তাদের গতি সর্বদা পশ্চাদমুখী।

রবী ঠাকুর বা সে সময়ের অন্যান্য কবি সাহিত্যিকদের কথা বলতে গেলে একথা বলতেই হয় যে তাঁরা সবসময় শৃঙ্খলা ভেঙে নতুনের কথা বলেছেন। তার আগেও সাহিত্যিক সমাজে এ প্রবণতা ছিল। এবং তাদের মাধ্যমেই সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে বারংবার। তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে কেন আমাদের ভেতর জেঁকে আছে মৌলবাদ? কেন স্বাধীনভাবে কোন বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে এত বাধা বিপত্তি; তাও সেটা শিক্ষিত সমাজের ভেতর থেকেই। আমি, আমি হতে পারবো না, সে সে হতে পারবেনা। পূর্বতনদের পুরাতনের চর্চায় যেন আমাদের বাধ্য থাকতে হবে!

নতুন মানেই কি খারাপ ?

শিক্ষিত সমাজের ভেতর এত গোড়ামী কি করে থাকে ?

কেন আমাদের এটা ভাবতে হবে যে সাহিত্যের সবথেকে সম্মৃদ্ধ আর ভালো কাজগুলো আগেই হয়ে গেছে; নতুন করে ভালো কাজ হবার সম্ভাবনা নেই।

রবীন্দ্রনাথ কবি ছিলেন বটে নবী তো নন।

মুহাম্মদের (স:) আগমনের সাথে সাথে ইসলাম ধর্মে খাতামুন নাবিয়্যিন বা নবুয়াতের পরিসমাপ্তি হয়েছিল। সুতরাং মুসলিমরা দাবী করতেই পারে যা নবীজির পর ইসলাম ধর্মে আর কেউ কোন নিয়ম জারি করতে পারবেনা। তাঁর দেখানো পথেই মুসলিমদের চলতে হবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত। কিন্তু খাতামুন সাহিত্য বলে কোন কিছুর আবির্ভাব হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর যদি সাহিত্যের ধারার পরিসমাপ্তি না হয়ে থাকে তবে সাহিত্যঙ্গনে বর্তমানের প্রতি এত অনীহা কেন ? শুধু বইমেলা নিয়ে ভাবতে গেলেই আজকাল গা শিউরে ওঠে। নতুন একটা বই আসলো, অমনি সাংস্কৃতিক মৌলবাদীরা রব তুলল, ‘বাংলা সাহিত্য রসাতলে গেলরে।’ কি আজব এক মৌলবাদ! 

 

লেখক : আহমেদ সাব্বির

লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা