Opu Hasnat

আজ ২ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০২০,

কুষ্টিয়ায় তামাকের পরিবর্তে তরমুজে স্বপ্ন দেখছেন চাষীরা কৃষি সংবাদকুষ্টিয়া

কুষ্টিয়ায় তামাকের পরিবর্তে তরমুজে স্বপ্ন দেখছেন চাষীরা

কুষ্টিয়ার মিরপুরে গত ১০ বছর ধরেই যেসব জমিতে তামাকের দাপট দেখা গেছে সেসব জমিতে আজ নেই তামাকের অস্তিত্ব। তামাকের পরিবর্তে মাটির বুক চিরে উঁকি দিচ্ছে রসালো তরমুজের চারা। একসময় আঁখের দখলে থাকা যেসব জমিতে দখল নেয় তামাক সেই জমিতে এখন নতুন ফসল তরমুজ। বিভিন্ন তামাক কোম্পানীর প্রনোদরার ফলে বিগত দিনে তামাক চাষে ঝুঁকতো কৃষক। তবে এবছর তামাক চাষ থেকে অনেকটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন কৃষক। বিগত দিনে তামাক চাষের কারন হিসাবে কোম্পানীর প্রলোভন ও কৃষকদের অসচেতনতাকে দায়ী করছেন। এলাকায় একেবারেই নতুন হলেও তরজুম চাষে বেশ আগ্রহ দেখিয়েছেন কৃষকরা। কৃষকরা বলছেন যে কোন আবাদ করেই তামাককে নীল চাষের মতো বিতাড়িত করার পরিকল্পনা করছেন তারা।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের কাকিলাদহ এলাকার কৃষক শেরেগুল ইসলাম। লেখাপড়া শেষে চাকুরী করতেন একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানে। পাশাপাশি ৫ বছর ধরে তামাক চাষ করে আসছিলেন তিনি। গত বছর চাষ করেছিলেন ৩ বিঘা জমিতে তামাক। তবে এবছর কোন তামাক চাষ করেননি। 

শেরেগুল ইসলাম বলেন, “তামাকে মুলত লাভ হয়না। নিজে কাজ করতে পারলে এক সাথে কিছু টাকা পাওয়া যায়। তবে লেবার নিলে কিছুই পাওয়া যায় না। পরিবারের সকলে মিলে পরিশ্রম করা লাগে। বাড়ীতে রোগ-জীবানুর উপদ্রব বেশি হয়।”

তিনি বলেন, “তামাক কোম্পানী আমাদের সার, বীজ, কীটনাশক ও পরামর্শ দিয়ে তামাক চাষে উৎসাহী করেছিলো। তবে গতবার আমার তিন বিঘা জমির তামাক শিলা বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কোম্পনী সেই তামাক আর কিনেনি। তাই এবছর রাগ করে আর তামাক লাগাইনি।” 

যতদিন বাঁচবেন এই তামাক চাষ করবেন না উল্লেখ করে বলেন, “কোনদিন আর এই তামাক করবো না। আমি এবছর তামাকের পরিবর্তে দেড় বিঘা জমিতে তরমুজের চাষ করেছি। আর এক বিঘা জমিতে বেগুন ও ১০ কাঠা জমিতে ফুলকপির চাষ করেছি। নতুন হলেও তরমুজ গাছ বেশ ভালই হয়েছ। কৃষি অফিসের পরামর্শে আমি তরমুজের সাথি ফসল হিসাবে একই জমিতে টমেটো চাষ করেছি।”

শেরেগুলকে দেখে তামাকের পরিবর্তে একই মাঠে ২০ বিঘা জমিতে তরমুজের চাষ করেছেন কৃষকরা। এ এলাকায় নতুন ফসল তরমুজ হওয়ায় কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দিচ্ছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাঈম উদ্দিন। 

সরোজমীনে কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের পুরাতন আজমপুর মাঠে গিয়ে দেখা যায়, যেসব জমিতে গতবছর তামাক চাষ হয়েছিলো সেসব জমিতে এখন তরমুজের চারা। 

কৃষক বাবলু জানান, “আমি তামাকের একন পাঁকা চাষী। গত বছরও আমার ৫ বিঘা জমিতে তামাক ছিলো। শিলা বৃষ্টির কারণে আমার সব শেষ। প্রায় প্রতিবছরই শিলা বৃষ্টিতে ক্ষতি হয় আমাদের। কিন্তু তামাকের চাষ করি বলে কেউ কোন সহায়তা করে না। তামাকের ক্ষতি হলে তামাক কোম্পানীরাও মুখ ফিরিয়ে নেই। তাই এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছি তামাক করবো না। তামাকের পরিবর্তে এবছর তরমুজ চাষ করেছি। দেখি শুনেছি ভালো লাভ হয় তরমুজে। দেখি কি হয়। শিল পড়ে তো আর তামাকের মতো নষ্ট হওয়ার নেই।”

আরেকজন কৃষক হোসেন আলী জানান, “গতবছর শিলে আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। ঋণ নিয়ে তামাক করি, কিন্তু কোম্পানীও আর পাশে থাকে না। তাই এবছর তরমুজ চাষ করছি। আর তরমুজের জমিতে আমরা অনান্য সবজিও করতে পারছি।”

মাঠের মাঝেই দেখা যায় আলেয়া নামের এক কৃষানী প্লাস্টিকের ঘটি/বদনা হাতে নিয়ে তরমুজের গাছের গোড়ায় গোড়ায় পানি দিচ্ছেন। 

কৃষানী আলেয়া খাতুন বলেন, “লোক করে গত বছর দুই বিঘা জমিতে তামাক করেছিলাম। সেখান থেকেই ঘটি সেচ দেওয়ার অভ্যাস রয়েছে। তবে শিলে নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারনে এবছর আর তামাক করিনি। এবছর নিজের ১০ কাঠায় পাশের জমির মালিকের দেখা দেখি তরমুজ লাগিয়েছি। তবে তরমুজে ঘটি দিয়ে সেচ দিলে ভালো হয়। তাই ঘটি দিয়ে সেচ দিচ্ছি।”

এবছর উক্ত এলাকার সবচেয়ে বড় তরমুজ চাষী নিয়াত আলী লালু। বিগত বছর তিনি ছিলেন তামাক চাষী এবং তামাক ব্যবসায়ী। এলাকার কৃষকদের মাঝেও রয়েছে তার প্রভাব। 

চাষী নিয়াত আলী লালু জানান, “আমরা মুলত এই অঞ্চলে আঁখের চাষ করতাম। আঁখ নিয়ে সুগারমিলের অনিয়ম আর হয়রানি কারনে আমরা আঁখ চাষ বন্ধ করে দিয়েছি। সেই সুযোগটা কাজে লাগায় তামাক কোম্পানী গুলো। তারা আমাদের বীজ, সার, কীটনাশক, পরামর্শ, চাষের জন্য লোনসহ নানা প্রলোভন দেখায়। আর কৃষকরা তামাকে ঝুঁকে পড়ে।”

তিনি বলেন, “আমরা কোম্পানীর প্রলোভনে পড়ে তামাক চাষ শুরু করি। কিন্তু আমাদের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে কোম্পানী গুলো। তামাক ক্রয়ের ক্ষেত্রে কার্ড চালু রয়েছে। আমরা কোম্পানীর বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই কার্ড কেটে যাবে এই ভয় থাকতাম আমরা।” 

তিনি বলেন, “তামাক চাষ করে আমরা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে ফেলেছি প্রায়। আমরা একটা বিষয় লক্ষ করেছি যে, তামাক কোম্পানী গুলো তাদের লাভের জন্য আমাদের প্রলোভন দেখায়। তবে তাদের কথা মতো কৃষক তামাক চাষ করে আমরা কৃষকরা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে যায়। কারন তারা ছাড়া তো তামাক কেনার কেউ থাকে না।”

তিনি আরো বলেন, “বিগত কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি শিলা বৃষ্টিতে তামাকের ক্ষতি হয়। কিন্তু কোম্পানী চাষীদের দিকে তাকায় না। ফলে চাষীরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আবার নানা নিয়োম চাষীদের উপরে চাপিয়ে দিতে চাই কোম্পানীগুলো। তাই আমরা এলাকার চাষীরা একত্র হয়েছি। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই অঞ্চল থেকে চিরোতরে তামাক চাষকে না বলবো। মাদককে যেমন আমরা না বলেছি ঠিক তেমনি তামাক চাষকে না বলছি।”

তিনি বলেন, “আমরা তরমুজের জমিতে সাথি ফসল হিসাবে কপি, পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁকড় করেছি। এবছর আমি এক দাগেই ১৫ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে তরমুজের চাষ করেছি। আমার দেখা দেখি আমাদের এলাকার কৃষকরা প্রায় ৫০-৬০ বিঘা জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। যে গুলো বিগত দিনে তামাক চাষ হতো।”

তিনি বলেন, “বিঘা প্রতি তরমুজে প্রায় ১৮-২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। বিঘাতে প্রায় আশা করছি আমরা তরমুজ চাষ করে বেশ লাভবান হব। কারন বাজারে তরমুজের দাম অনেক ভালো গেছে এবার। তবে তরমুজের বীজের সহজপ্রাপ্যতা হলে কৃষকরা আরো আগ্রহী হবে।”

মিরপুর উপজেলার ফকিরাবাদ এলাকার কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, গত বছর আমি ২৫ কাঁঠা জমিতে মাচা করে তরমুজ চাষ করেছিলাম। ক্রেতা ও ব্যাপারীরা জমি থেকেই ৫০-৬০ টাকা কেজি দরে তরমুজ কিনে নিয়ে গিয়েছিলো। এতে আমার প্রায় দুই লাখ টাকার মতো তরমুজ বিক্রি করেছিলাম। 

কাকিলাদহ এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নাঈম উদ্দিন জানান, “এই অঞ্চলের কৃষকরা নতুনভাবে তরমুজ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমি প্রতিনিয়ত কৃষকদের খোঁজ খরব নিচ্ছি। আমরা তরমুজ চাষ সম্পর্কে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি। সেই সাথে চেষ্টা করছি বিষমুক্ত উপয়ে কৃষকদের তরমুজ চাষ করাতে। আগামীতে ব্যপকভাবে এই এলাকায় তরমুজ চাষ হবে বলে আশা করছি।”   

মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, “মিরপুর উপজেলার কৃষকরা এক সময় তামাক চাষের দিকে বেশি ঝুঁকতো। কিন্তু বর্তমানে কৃষি অফিসের পরামর্শে এবং তামাক চাষের কুফল সম্পকে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে অনেকটাই তামাক চাষ থেকে বেরিয়ে আসছে। তামাকের বিকল্প ফসল চাষাবাদে ঝুঁকছেন।”

তিনি বলেন, “তরমুজ চাষ খুবই লাভজন। আমরা তরমুজ চাষ সম্প্রসারণের জন্য কৃষকদের পরামর্শ ও উৎসাহ দিচ্ছি। এবছর মিরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের সদরপুর, আজমপুর, কাকিলাদহ, মল্লিকপাড়া সহ বেশ কিছু এলাকায় তামাকের পরিবর্তে তারা তরমুজ চাষ করেছেন। এলাকায় নতুন হওয়া সত্ত্বেও তরমুজ চাষ খুবই সাড়া ফেলেছে চাষীদের মাঝে। আমরা চেষ্টা করছি সার্বক্ষনিক চাষীদের পাশে সেবা দেওয়ার জন্য।”