Opu Hasnat

আজ ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার ২০২০,

আলোচনা সভা ও অ্যাডভোকেসি ক্যাম্পেইন উদ্বোধন

ট্রান্স ফ্যাট নির্মূলে কমে যাবে হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি স্বাস্থ্যসেবা

ট্রান্স ফ্যাট নির্মূলে কমে যাবে হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি

[দেশে বছরে ২ লক্ষ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যায়, অন্যতম কারণ ট্রান্সফ্যাট]

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাট নির্মূল করতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব জাহিদ মালেক এমপি। রোববার (১৫ ডিসেম্বর) সিরডাপ মিলনায়তনে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত ‘ট্রান্স ফ্যাট নির্মূল করি, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাই’ শীর্ষক অ্যাডভোকেসি ক্যাম্পেইন উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশ নির্ধারণ করতে নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করাও জরুরি। 

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ডাঃ মোঃ হাবিবে মিল্লাত এমপি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় আমরা নিশ্চয় ২০২৩ সালের মধ্যে খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারব। একজন সংসদ সদস্য হিসেবে ট্রান্স ফ্যাট নির্মূল করতে নীতি প্রণয়নে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও তিনি দেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ক্যাব এর সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, আমদানি পর্যায়ে যেসব তেলে উচ্চ মাত্রার ট্রান্স ফ্যাট পাওয়া যাবে সেগুলো আমদানি নিরুৎসাহিত করতে হবে। অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার (অব:) আব্দুল মালিক বলেন, এখন ৫০ বছর বয়সের নিচে প্রচুর মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যার অন্যতম কারণ ট্রান্স ফ্যাট। এটি নির্মূল করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বছর ২ লক্ষ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগের কারণে মৃত্যুবরণ করে। হৃদরোগের অন্যতম প্রধান কারণ অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ। খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে ট্রান্স ফ্যাট (ট্রান্স ফ্যাটি এসিড) নামক একধরনের চর্বি জাতীয় পদার্থ ধমনির রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে হৃদরোগজনিত মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করে। ট্রান্স ফ্যাট নির্মূল করার মাধ্যমে ২০২৩ সালের মধ্যে ট্রান্স ফ্যাটমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে এই ক্যাম্পেইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করেন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এর ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর এর বাংলাদেশ কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস এবং প্রজ্ঞা’র ট্রান্স ফ্যাট বিষয়ক প্রকল্পের টিমলিডার মো: হাসান শাহরিয়ার। বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টারস ফোরাম এর সভাপতি তৌাফিক মারুফ এর সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন, অধ্যাপক ডাঃ এ.এইচ.এম. এনায়েত হোসেন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; মো. মুয়াজ্জেম হোসাইন, মহাপরিচালক, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন; সৈয়দা সারওয়ার জাহান, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ; গোলাম রহমান, সভাপতি, ক্যাব; এবং এবিএম জুবায়ের, নির্বাহী পরিচালক, প্রজ্ঞা।

আলোচনায় জানানো হয় মাত্রাতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ হৃদরোগ, স্ট্রোক ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস এ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার রক্তে  ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বাড়িয়ে ‘ভালো’ কোলেস্টেরল কমিয়ে দেয় এবং মানুষকে অসুস্থ করে ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর মতে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। সাধারণত ভাজা পোড়া ও বেকারি খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট (Industrially-produced trans fats) থাকে। ভেজিটেবল অয়েল (পাম, সয়াবিন ইত্যাদি) এর সাথে হাইড্রোজেন যুক্ত (হাইড্রোজেনেশন) করলে তেল জমে যায় এবং ট্রান্স ফ্যাট উৎপন্ন হয়। এই পারশিয়াল হাইড্রোজেনেটেড অয়েল বা PHO আমাদের দেশে ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। ভাজা পোড়া খাদ্যে একই তেল উচ্চ তাপমাত্রায় বারবার ব্যবহারের কারণেও খাদ্যে ট্রান্স ফ্যাট সৃষ্টি হয়। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির দৈনিক ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণের পরিমাণ হওয়া উচিত মোট খাদ্যশক্তির ১ শতাংশের কম, অর্থাৎ দৈনিক ২০০০ ক্যালোরির ডায়েটে তা হতে হবে ২.২ গ্রামের চেয়েও কম। ট্রান্স ফ্যাট এর ব্যাপক স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে ডেনমার্ক বিশ্বে প্রথম ২০০৩ সালে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে। অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, ইরান, ভারতসহ মোট ২৮টি দেশে খাদ্য দ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ সীামা নির্ধারণ কার্যকর করেছে। অন্যদিকে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর  আমেরিকা এবং কানাডা ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উৎস পিএইচও এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্টান্ডার্ডস অথরিটি ২০২২ সালের মধ্যে ট্রান্স ফ্যাটের সর্বোচ্চ মাত্রা ২ শতাংশে কমিয়ে আনার পাশাপাশি খাবারে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট পরিহার করার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এখনও ৫০০ কোটি মানুষ শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণজনিত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাস করে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৮ সালে REPLACE অ্যাকশন প্যাকেজ ঘোষণা করে যেখানে ২০২৩ সালের মধ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটমুক্ত বিশ্ব অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে ট্রান্স ফ্যাট নির্মূল সংক্রান্ত কোন নীতি না থাকায় খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি রয়ে যাচ্ছে, যা হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়ংশে কমিয়ে আনা সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (লক্ষ্য ৩.৪) অর্জন কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাই হৃদরোগ প্রতিরোধসহ জনস্বাস্থ্যের কার্যকর উন্নয়নের জন্য ট্রান্স ফ্যাট নির্মূলের কোনো বিকল্প নেই।

এই বিভাগের অন্যান্য খবর