Opu Hasnat

আজ ১৮ জানুয়ারী শনিবার ২০২০,

ফরিদপুরের ব্রান্ডিং মেলায় উপেক্ষিত ফরিদপুরের ব্রান্ড ফরিদপুর

ফরিদপুরের ব্রান্ডিং মেলায় উপেক্ষিত ফরিদপুরের ব্রান্ড

যে নামটি দিয়ে মেলার এতো সব বড় আয়োজন সেই মেলায় সেই ব্রান্ড পণ্যটি একবারেই উপেক্ষিত। এতে মেলায় ঘুড়তে আসার দর্শনার্থীরা ক্ষোভ জানিয়েছেন। 

ফরিদপুরে গত ৩০ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী ব্রান্ডিং মেলা। ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে ‘মনিপুরি তাঁতি শিল্প ও জামদানি বেনারশি কল্যাণ ফাউন্ডেশন ও গ্রীন ইভেন্টস’-এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ‘পাটপণ্য, তাঁতবস্ত্র, কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের ব্যতিক্রমী আয়োজন’ করেছে ফরিদপুরের জেলা প্রশাসন।

এ মেলা আয়োজনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে  গত ২৯ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেছিলেন, ফরিদপুরের ব্র্যান্ডিং পণ্য পাট ও পাটজাত বিভিন্ন দ্রব্যের স্থানীয় ও বৈদেশিক বাজার সৃষ্টি করে পাটকে বিশ্বে সমাদ্রিত করাই এ মেলার মূল লক্ষ এবং উদ্দেশ্য।

ফরিদপুর জেলার ব্রান্ড সোনালী আঁশ পাট। এ ব্রান্ডিং এর শ্লোগান হচ্ছে, ‘সোনালী আঁশে ভরপুর/ ভালোবাসি ফরিদপুর।’ দেশে পাট উৎপাদনে ফরিদপুর রয়েছে প্রথম অবস্থানে।

কিন্তু জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে যে ব্রান্ডিং মেলার আয়োজন করা হয়েছে তাতে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়েছে পাট ও পাটজাত পণ্য। বুধবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত মেলা প্রাঙ্গনে সরেজমিনে পরিদর্শন করে এবং মেলা প্রাঙ্গনে অবস্থিত ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ঘুরে জানা গেছে এ তথ্য।

জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ওই মেলায় মোট স্টল রয়েছে ১২০টি। পরিদর্শনকালে অন্তত ১০টি স্টল মেলার চারদিনেও চালু হয়নি বলে দেখা গেছে। সমগ্র মেলা প্রঙ্গণ ঘুরে দেখা গেছে মোট ৭৫টি স্টল। এর মধ্যে মাত্র একটি স্টল থেকে পণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে।

মেলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মেলা কার্যালয় ও নিরাপত্তার জন্য পুলিশের একটি করে স্টল রয়েছে।

এছাড়া রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কর্নার, মহিলা অধিদপ্তরের স্বেচ্ছাসেবী মহিলা সমিতির স্টল, গোল্ডেন সিটিজেন কর্নার, বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান রাসিন, সমাজ সেবা অধিদপ্তর, প্রতীক মহিলা সমবায় সমিতি, বাংলাদেশ এজেন্ডা ২০৩০ স্টল। এসব স্টলে কোন পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায় নি।

মেলার বেশির ভাগই স্টল কসমেটিক্সের । এ জাতীয় দোকান এ মেলায় রয়েছে ২২টি। 

পোশাকের দোকান রয়েছে ১১টি। এগুলোর কোনটি শাড়ি কাপড়, শিশুদের কাপড়, থ্রিপিস বিক্রি হয়। আবার ব্রেজার, মোদি কটি, জ্যাকেটও বিক্রি হয় কোন কোনটিতে। 

সমবায় ব্যাংকের নামে একটি স্টল রয়েছে। সেখানে বাটিক ও তাতের শাড়ি প্রদর্শন করা হয়। ওই স্টলের এক কর্মী জানান, যদি কেউ বাটিক ও তাঁতের শাড়ি কিনতে চান তাহলে বিক্রি করা হয়।

ফুচকা, চটপটি, শাহী জিলাপি, চিংড়ির ঝাল ফ্রাই ও শুকনো খাবারসহ খাবারের দোকান আছে মোট ১০টি। এর মধ্যে একটি আছে শীতের পিঠা এবং একটি আছে আইসক্রিমের দোকান। বিসিক পরিচালিত রহমত ট্রেডার্স থেকে শুধু বিক্রি করা হচ্ছে মধু। সেখানে সরিষা, লিচু, মিশ্রিত, সুন্দরবন, বড়ই ও কালোজিরা ফুলের মধু বিক্রি হচ্ছে।

বিসিক পরিচালিত মৃৎ শিল্পের একটি দোকান রয়েছে। সেখানে বিক্রি হচ্ছে মাটির বিভিন্ন শোপিস। ওই দোকানের বিক্রেতা সুজন কুমার পাল জানান, বেচা কেনা তেমন হচ্ছে না। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, মেলা শুরু হয়েছে তিন ঘন্টা। এই তিন ঘন্টায় মাত্র ২০টাকার সামগ্রী বিক্রি করেছি।

জেলা প্রশাসক পরিচালিত ‘বঙ্গবন্ধু কর্ণার’-এ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত নিজের লেখা, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বিভিন্ন বই বিক্রি হচ্ছে। এ কর্নারে বিক্রেতাদের চাপ প্রচুর, কিন্তু সেই ভাবে বই সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানালেন ওই কর্ণারের বিক্রয় প্রতিনিধি মো. মামুনুর রহমান। 

মেলায় বেলুন শুটারের দোকান আছে দুটি, ম্যাজিক শেখার জন্য রয়েছে মান ম্যাজিক শপ, জুতা স্যান্ডেল ও ভ্যানিটি ব্যাগের দোকন রয়েছে তিনটি। 

আকবর সুজ এর বিক্রেতা ফয়সাল হাসান বলেন, মেলা এখনও জমে নাই। বিক্রিও হচ্ছে না তেমন। গত বুধবার (৪ ডিসেম্বর) বিক্রি হয়েছে ১০ হাজার টাকার সামগ্রী।

মেলার আকর্ষণ বাড়াতে বিশেষত শিশুদের জন্য সিরাজগঞ্জ যমুনা শিশু পার্ক বেবীজোনে এক থেকে সাত বছর বয়সী শিশুদের খেলাধুলার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া মিনি ট্রেন, চরকি, ঘোড়া রাইড, নাগরদোলা ও নৌকার দোলনার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেলার মঞ্চে সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে।

এ ব্রান্ডিং মেলায় পাটকল মালিক করিম গ্রুপ, রাজ্জাক জুট ইন্ড্রাস্টিজ লি. ও গোল্ডেন জুট ইন্ড্রাস্টিজ লি. এর তিনটি স্টল রয়েছে। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই পাটের সুতা তৈরি করে। কিন্তু এ তিনটি স্টলে পাট, পাটের সুতাসহ পাটজাত ব্যাগ, চট, স্যান্ডেলসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রদর্শন করা হলেও তার কোনটি বিক্রি করা হচ্ছে না।

করিম গ্রুপের প্রতিনিধি সৈয়দ মো. এনামুল বলেন, আমরা বিক্রি নয়, প্রদর্শনের জন্যই পাটজাত এ সামগ্রী প্রদর্শন করছি। এতে কি লাভ কি তার কোন প্রশ্নর উত্তর তারা দিতে পারেনি। 

তবে এ ব্রান্ডিং মেলার নাম ধরে রাখার জন্য সমগ্র মেলার মধ্যে শুধুমাত্র একটি স্টল থেকে পাটের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করা হচ্ছে। ‘জেলা প্রশাসকের কর্ণার’ নামে পরিচিত এ স্টলটি পরিচালিত হচ্ছে জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে এবং হলিক্রাফস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। 

বুধবার মেলা প্রাঙ্গণ পরিদর্শন কালে দুপুরে ওই স্টলটি বন্ধ দেখা গেলেও আশেপাশের স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানায়, ওই স্টল থেকে পাটের তৈরি ব্যাগ, স্যান্ডেলসহ বিভিন্ন সামগ্রী ভালো বিক্রি হচ্ছে।

ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর সভাপতি শিপ্রা গোশ্বামী বলেন, জেলার ব্রান্ডিং মেলা নাম হয়ে থাকলে এবং আমাদের ব্রান্ড যেহেতু পাট সে কারনে পাটজাত পণ্যের প্রর্দশনী ও বিপননের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তবে পাশাপাশি অন্যন্য সামগ্রীর দোকানও থাকতে পারে তবে তা সীমিত পর্যায়ে। তিনি বলেন, পাটজাত পণ্যের প্রদর্শন ও বিক্রির প্রতি আরও অধিক নজর দেওয়া উচিত ছিল।

এ ব্যাপারে এ ব্রান্ডিং মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আসলাম মোল্লার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ব্রান্ডিং মেলা অবশ্যই পাটপণ্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু পাট পণ্য দিয়ে মেলা করা যায় না বলেই তার সাথে আমরা  তাঁতবস্ত্র, কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের সমন্বয় ঘটিয়েছি। মেলায় ২২টি কসমেটিক্স এর স্টল বিষয়ে তিনি বলেন, এখন শীতকাল এজন্য মানুষ কসমেটিক্স বেশি ব্যহার করে তাই রাখা হয়েছে। আসলাম মোল্লা আরও বলেন, ফরিদপুরে উৎপাদনমুখী ১২টি পাট কল রয়েছে তাদের সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এসেছে মাত্র তিনটি, তবুও তারা কোন সামগ্রী বিক্রি করছে না। তিনি বলেন, তারা প্রদর্শনী করছেন পরে হয়তো চাহিদা অনুযায়ী বড় সরবরাহ দিতে পারবেন।