Opu Hasnat

আজ ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৯,

স্মরণসভায় চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সালাম

ডিসেম্বরেই ফ্লাইট সার্জেন্ট শহীদ মহিআলমের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প কাজ শুরু চট্টগ্রাম

ডিসেম্বরেই ফ্লাইট সার্জেন্ট শহীদ মহিআলমের স্মৃতি সংরক্ষণ প্রকল্প কাজ শুরু

চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এম.এ. সালাম বলেছেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে যারা রণাঙ্গনে আত্মাহুতি দিয়েছেন তাঁদের রক্তের ঋণ কিছুতেই শোধ হবে না। তবে তাদের ত্যাগ-তিতীক্ষার স্বীকৃতি-মর্যাদা-সম্মান নিশ্চিত না হলে আমরা অকৃতজ্ঞ জাতি হিসেবে পাপবিদ্ধ হবো। এই পাপমুক্তিই আমাদের রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। এই দায়বদ্ধতা থেকে রণাঙ্গণের সফল সমরনায়ক ফ্লাইট সার্জেন্ট শহিদ এ.এইচ.এম মহিআলম চৌধুরী’র স্মৃতি সংরক্ষণ, মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবী। এ প্রেক্ষিতে তিনি ঘোষণা করেন যে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের উদ্যোগে বিজয়ের মাস ডিসেম্বরেই শহীদ ফ্লাইট সার্জেন্ট শহীদ এ.এইচ.এম মহিআলম চৌধুরীর স্মৃতি সংরক্ষণে বাঁশখালীর সাধনপুরে স্মারক স্থাপনা নির্মাণ বাস্তবায়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। তিনি ফ্লাইট সার্জেন্ট শহিদ মহিআলম চৌধুরী’র শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত নাগরিক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন।

তিনি আরো বলেন, শহিদ মহিআলম বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী উলানিয়া চৌধুরীর বাড়ীর সন্তান হলেও মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের ৫টি এফ.এফ গ্রুপের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং ’৭১এর ১৭ নভেম্বর বাঁশখালীর সাধনপুরে শহিদ হয়ে চট্টগ্রামের মাটিতেই শুয়ে আছেন- এই তথ্যটি তাঁর সহযোদ্ধা ছাড়া অনেকেই জানেন না; নতুন প্রজন্মের কারো জানার কথাও নয়। কারণ তাঁকে আমরা বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে ফেলেছি, এমনকি এর আগে চট্টগ্রামে কখনো তাঁর শাহাদাত বার্ষিকীটিও পালিত হয়নি। এই লজ্জায় আমাদের মাথা নত হয়ে যায়। শহিদ মহিআলম চৌধুরী’র স্মৃতি রক্ষা, তাঁর কবরস্থান স্থানান্তর এবং প্রাপ্য সম্মান, স্বীকৃতি ও মর্যাদা আদায়ে যাঁরা উদ্যোগী হয়েছেন তাঁদের এবং শহিদের পরিবারের প্রতি সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, শহিদ মহিআলমের স্মৃতি সংরক্ষণে এ ধরণের উদ্যোগ অনেক আগেই নেয়া উচিত ছিলো কিন্তু পারিনি, তাই আত্মধিক্কারে আমরা ক্ষত-বিক্ষত। বিলম্বে হলেও মহিআলমের স্মৃতি সংরক্ষণে যে জনআকাক্সক্ষা আজ জোড়ালো হয়েছে তার প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়েছে। 

তিনি জানান, ইতিমধ্যেই বিভিন্ন উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা স্মারক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়েছে, আমার কাছে শহিদ মহিআলমের স্মৃতি সংরক্ষণে যে প্রস্তাবনা এসেছে তা আমি গুরুত্বের সাথে আমলে এনেছি। সকলের পরামর্শে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ মহিআলমের স্মৃতিরক্ষায় যা- কিছু করা প্রয়োজন তাকে বাস্তবে রূপ দিতে আগ্রহী। আমি মনে করি এটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ক্ষমতাসীন সরকার, রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির একটি ইতিবাচক অঙ্গিকার। এজন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে শহিদ মহিআলমের মত বীর মুক্তিযোদ্ধার জন্ম না হলে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হতো না। তাই চট্টগ্রামের মাটিতে শহিদ মহিআলমের স্মৃতি সংরক্ষণ ও স্মারক স্থাপনা হবে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের অহংকারের ভিত্তি সোপান এবং এই কাজটি আমাদের করতেই হবে। 

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, শহিদ ফ্লাইট সার্জেন্ট এ.এইচ.এম মহিআলম চৌধুরী আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের এক বীর সমরনায়ক হিসেবে আত্মাহুতি দিলেও তাঁকে হৃদয়ে গেঁথে রাখতে পারিনি। তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন বরিশালের ঐতিহ্যবাহী উলানিয়া চৌধুরী পরিবারে। এ পরিবারেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরী ও কবি আসাদ চৌধুরী। অথচ আমরা এই শহীদ বীরকে স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমলে নেই নি। এই অপ্রিয় সত্যটি স্বীকার করতেই হবে। মনে রাখতে হবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে যে- অনাকাঙ্খিত উল্টোযাত্রা ঘটে তার কুপ্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলো দ্রুত ছিনতাই হয়ে যায়। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় পাকিস্তানী ভাবধারায়। শুরু হয় ইতিহাস বিকৃতির জঘন্য অধ্যায়। এ কারণে দীর্ঘ ২১ বছর বাঙালি একাত্তরের পরাজিত শক্তির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিলো। এই দুর্বিনীত দুঃসময়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় এবং আমাদের স্বাধীন জাতিসত্তা শৃঙ্খলিত হয়ে পড়ে। 

তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাঙালি জাতিসত্তার উজ্জ্বল উদ্ধার সম্পন্ন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনী ও মানবতা বিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়েছেন এবং জাতিকে পাপমুক্ত করেছেন। তাঁর কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। তিনি এসব পূরণও করছেন। আমরা বিশ্বাস করি, ফ্লাইট সার্জেন্ট শহিদ মহিআলম চৌধুরী’র স্মৃতি সংরক্ষণ সহ তাঁকে প্রাপ্য মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদানে আর কোনো বাধা থাকতে পারে না। বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন আহমেদ রাশেদের সভাপতিত্বে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নজরুল ইসলাম মোস্তাফিজ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত নাগরিক স্মরণসভায় পরিবারের পক্ষে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শহিদ মহিআলম চৌধুরী’র ভ্রাতস্পুত্রী মারজান বেগম বলেন, আমার চাচার স্মৃতি সংরক্ষণে মুক্তিযোদ্ধা ও চট্টগ্রামবাসীর উদ্যোগে আমি অবিভূত। এ উদ্যোাগ বাস্তবায়নে অনেকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন আয়োজক পরিষদের সদস্য সচিব নজরুল ইসলাম মোস্তাফিজ। যাঁরা এ আয়োজন করেছেন তাঁদের প্রতি শুধু কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমি কৃতার্থ হতে চাই না, তাদের অবদান আমাদের পরিবারের কাছে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকবে। 

শহিদ মহিআলমমের নাগরিক স্মরণসভায় আরো বক্তব্য রাখেন, বীর শহীদ সার্জেন্ট মহিআলমের বড় ভাই মাউসুদ চৌধুরী, ২নং সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকা, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: আবুল কাশেম, বীর মুক্তিযোদ্ধা মো: হোসেন বাবু, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু বক্কর, বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের, বীর মুক্তিযোদ্ধা পান্টু লাল সাহা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুভাষ চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা সুখেন্দু বিকাশ ধর, বীর মুক্তিযোদ্ধা বিজয় ধর, এড. সাইফুন নাহার খালেক, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম, ভাস্কর ডি কে দাশ মামুন, সংগীত শিল্পী রুপম মুৎসুদ্দী টিটু, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান জাহেদ আনোয়ার, আবদুল ওয়াজেদ সিদ্দিকী, মুজিবুর রহমান প্রমুখ।