Opu Hasnat

আজ ৮ ডিসেম্বর রবিবার ২০১৯,

স্বামীর পরকীয়ায় বাঁধা দেয়ায় স্ত্রী পারভীনের জীবনে নেমে এলো অন্ধকার সুনামগঞ্জ

স্বামীর পরকীয়ায় বাঁধা দেয়ায় স্ত্রী পারভীনের জীবনে নেমে এলো অন্ধকার

বিয়ের আগে গ্রামের লালা মিয়ার বাড়ীতে কাজ করতেন আমার স্বামী। সে সুবাদে তিনি আমাদের দোকানে আসা যাওয়া করতেন। এ ভাবেই আমাদের পরিচয়। এক পর্যায়ে আমার চাচাত ভাইয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দেন। পারিবারিক ভাবে বিয়ে ঠিক হয়। কিন্ত বিয়ের দু’দিন আগে আমার শশুড়ির হার্ট অ্যাটাক হয়েছে অজুহাতে তারিখ বদলানোর জন্য বলেন তারা। তবে আমার এক চাচাত ভাইয়ের মাধ্যমে জানতে পারি কাবিনে জায়গার পরিবর্তে টাকা দেয়া হবে তাই তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। তখন আমার পরিবারের লোকজন তাদের সাথে আত্মীয়তা করবেন না জানিয়ে দেন। তার কয়েক মাস পর আমি এস এস সি পরিক্ষার ফি পরিশোধ করার জন্য বাড়ী থেকে বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বের হই। যাবার পথে স্থানীয় একটি টেইলারিং দোকানে বোরকার মাপ দিয়ে বের হলে একটি সিএনজিতে আমাকে জোর করে তুলে তাদের বাড়ীতে নিয়ে আমার স্বামী ও তার এক ফুফাত ভাই। তিন দিন একটি কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। বিয়েতে রাজি হওয়ার জন্য অনেক বুঝানো হয়। শেষে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় আমি বিয়েতে সম্মতি প্রদান করি। তার পর তাদের বাড়েিতই কাবিন ও বিয়ে হয়। কিন্ত বিয়ের পর তিনমাস আমাকে আমার পিত্রালয়ে যেতে দেয়া হয়নি। শেষে স্থানীয় মুরব্বিদের মধ্যস্থায় আমার পিত্রালয়ে যাই। এর পর হতে আমাদের সংসার ভালই চলছিল। আমার স্বামী প্রবাসে যেতে চাইলে আমার বোন ও আমি গ্রামীন ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে তাকে বাহরাইন পাঠাই। সে দেশে গিয়ে ইউরোপের দেশে যাবেন মর্মে টাকা চাইলে আবারো ব্যাংক থেকে টাকা তুলে পাঠাই। প্রবাসে থাকা অবস্থায় জানতে পারি তিনি পরকীয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েছেন। আর এই পরকীয়ায় বাঁধা দেওয়ার কারনে আমার জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। এর পর থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

এখন আমার তিন সন্তানের ভবিষৎ কি হবে? কান্না বিজড়িত কন্ঠে এ সব কথা বলেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ছৈলা-আফজালাবাদ ইউনিয়নের শিবনগর গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজের মেয়ে তিন সন্তানের জননী হতদরিদ্র পারভীন বেগম। 

এ দিকে পরকীয়ায় আসক্ত প্রবাসী যৌতুক লোভী প্রবাসী স্বামী কতৃক মামলা প্রত্যাহার ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় পারভীন বেগম গত ২৮ নভেম্বর ২০১৯ ইং তারিখে ছাতক থানায় জিডি নং ১৩২৭ এন্ট্রি করা হয়। এতে একই উপজেলার পিরপুর গ্রামের মৃত. তছবির আলীর ছেলে আক্তার হোসেনকে প্রধান আসামীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। 

জিডি সুত্রে জানা যায়, গত ২৫ নভেম্বও ২০১৯ ইং তারিখে বিকাল অনুমান ৪ টার দিকে আক্তার হোসেন বাহরাইন থেকে পারভীন বেগমের মোঠো ফোনে কল দিয়ে হুমকি প্রদান করে বলেন, মামলা প্রত্যাহার না করিলে তার লোকজন দিয়ে পারভীন বেগমকে মারপিট করে খুন জখম করিবেন।

এর আগে ওই নারী গত ১৭ নভেম্বর ২০১৯ ইং তারিখে আক্তার হোসেনকে প্রধানসহ ১০ জনকে আসামী করে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ সুত্রে জানা য়ায়, পারভীন বেগম গত ০৯.১২.২০০৬ ইং তারিখে ২ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য্য করে ইসলামী শরীহা বিধান মোতাবেক রেজিষ্টারী কাবিন নামা মুলে প্রবাসী আক্তার হোসেনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ১২ বছরের দাম্পত্য জীবনে, স্মৃতি, মুন্না, মাহফুজ হোসেন মুহিত নামে তিনটি সন্তানও রয়েছে। তার স্বামী আক্তার হোসেন প্রবাসে থাকা অবস্থায় ইউরোপের দেশে যাবেন মর্মে তার কাছে ৩ লক্ষ টাকা চেয়েছিলেন। টাকা না নিলে তাকে তালাক দিবেন বলে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন। তার তিন সন্তানের দিকে থাকিয়ে গ্রামীন ব্যাংক থেকে মোট ২লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা তুলে দেন পারভীন। কিন্ত ব্যাংকের কিস্তিগুলো এখনো তিনি পরিশোধ করিতে পারেননি। প্রায় দুই বছর আগে পারভীন জানতে পারেন জগন্নাতপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের ঘি-পুরা গ্রামের আরজ আলীর মেয়ে শিমলা বেগমের সাথে তার স্বামী প্রবাসী আক্তার হোসেন পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি এতে বাধা দিলে শিমলা বেগমকে বিয়ে করবেন এবং তাকে তালাক দিবেন বলে হুমকি দেন আক্তার হোসেন অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এর পর থেকে স্ত্রী সন্তানদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন আক্তার হোসেন। শেষে তিনি নিরুপায় হয়ে গত ০৩ নভেম্বর ২০১৮ ইং তারিখে সহকারী জজ ও পারিবারিক আদালত ছাতক, সুনামগঞ্জ মোকদ্দমা নম্বর (৩৮/২০১৮) দায়ের করেন। এর পর আক্তার হোসেন দেশে ফিরে তার কাছে ৫ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন এবং মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দেন। যৌতুকের টাকা না দিলে আক্তার হোসেন পালভীন বেগমকে সংসারে ফিরে নিবেননা এর্ব আরেকটি  বিয়ে করবেন বলে হুমকি প্রদান করেন। বিশাল অংকের টাকা দেয়ার কোন সামর্থ পারভীনের না থাকায় অসহায় হয়ে আবারো ০২ নভেম্বও ২০১৯ ইং তারিখে আমল গ্রহনকারী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, ছাতক, সুনামগঞ্জ মোকদ্দমা নং (১/২০১৯) দায়ের করেন। কিন্ত মামলা দায়ের করার পর আক্তার হোসেন আবারো প্রবাসে ফিরে যান।

এর কিছুদিন পর বিভিন্ন মাধ্যমে পারভীন জানতে পারেন গত ১৭/১২/২০১৮ ইং তারিখে সুনামগঞ্জ নোটারি পাবলিকে তার অজান্তে তালাক সংক্রান্ত হলফনামা সম্পাদন করে একই তারিখে সুনামগঞ্জ নোটারি পাবলিকে শিমলা বেগমের সাথে বিবাহের হলফ নামা সম্পাদন করেন আক্তার হোসেন। হলফনামা সংক্রান্ত কাগজ পত্র সংগ্রহ করে তার শশুড় বাড়ীর লোকজনকে দেখাতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, আপনারা বললেন কোন বিয়ে সাদি করেন নাই বা আমাকে তালাক দেননি। তাহলে এই কাগজপত্রগুলো কি? এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শিমলা বেগম, মাালেছা বিবি, নূর হোসেন গং তাকে মারপিট করে এবং মামলা তুলে নেযার হুমকি দিয়ে বাড়ী থেকে বের করে দেয়। এ ঘটনায়ও তিনি গত ২৯ জুলাই ২০১৯ ইং তারিখে ছাতক থানায় নন জি আই আর প্রসিকিউশন মামলা নং ২০৭/১৯ দায়ের করেন। কিন্ত গত ১৩ অক্টেবর ২০১৯ তারিখে মাালেছা বিবি (শাশুড়ী) কতৃক তার বিরুদ্ধে দায়েরী মামলায় সুনামগঞ্জ কোর্টে হাজিরা দিতে গেলে শিমলা বেগম গং অতর্কিত ভাবে তার উপর হামলা ও বেধড়ক মারপিট করে এবং মামলা তুলে নেয়ার হুমকি দেয় তারা। মামলা প্রত্যাহার না করলে তাকে সুনামগঞ্জ থেকে ফিরতে দেবেনা বলে হুমকি দেয়া হয়। এ অবস্থায় মামলা পরিচালনা, ব্যাংক লোনের কিস্তি পরিশোধ ও তিন সন্তানের লেখা পড়াসহ বরণপোষন নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি। অপরদিকে বিবাদীগণের অব্যাহত হুমকিতে তিনি ও তার সন্তানদের জীবন প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে আক্তার হোসেন প্রবাসে থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে তার মা ও পারভীন বেগমের শাশুড়ি মালেছা বিবি বলেন, বেঠি আমরার বিরুদ্ধে মামলা দিয়া থানা পুলিশ বাড়িত আইন্না হান্ডি-বাসন ভাঙ্গাইছে। এর লাগি মান সম্মান বাঁচাইতে গিয়া আমরাও মামলা দিছি। ফুয়া (ছেলে) বিদেশ থাকে, তারা বেঠা-বেঠি খেনে লাগছে আমি হারাম কোনতা জানিনা। মরনা (মোহরানা) টেখাা ফুয়ায় দিলে দিতো, ইতা আমি কোনতা জানিনা।

গ্রামীন ব্যাংক ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ ব্রাঞ্চ এর ফিল্ড অফিসার রুবি রায় বলেন, পারভীন বেগমের কাছে গ্রামীন ব্যাংকের ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে। 

এডভোকেট হানিফ সোলেমান বলেন, আক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে পারভীন বেগমের দায়েরী মোকদ্দমা নং সি আর ১/২০১৯ যৌতুক মামলায় ওয়ারেন্ট হয়েছে। তার পর মাল ক্রোকের আদেশ হওয়ার পর পত্রিকা বিজ্ঞপ্তির জন্য কোর্টের নির্দেশ আছে। পারভীন বেগম সরকারী খরছে পত্রিকা বিজ্ঞপ্তির প্রকাশের জন্য আবেদন করেছেন।

এ ব্যাপারে ছাতক থানার এস আই আতিকুল ইসলাম বলেন, আক্তার হোসেনের নামে মাল ক্রোকের আদেশ পাওয়ার পর থানা থেকে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি দেশে নাই এবং তার নামে স্থাবর-অস্থাবর কোন সম্পদ নাই। এ বিষয়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। 

এ ব্যাপারে ছাতক থানার ওসি মোস্তফা কামাল জিডি এন্ট্রির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যাবস্থা নেয়া হবে।