Opu Hasnat

আজ ৭ ডিসেম্বর শনিবার ২০১৯,

সাইক্লোন শেল্টারে জন্ম নেওয়া বুলবুলির পাশে মমতাময়ী ইউএনও খুলনা

সাইক্লোন শেল্টারে জন্ম নেওয়া বুলবুলির পাশে মমতাময়ী ইউএনও

তখনও ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানেনি এলাকায়। বৈরী আবহাওয়া ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টির মধ্যে মাইকে প্রচার করা হচ্ছে ঝড়ের পূর্বাভাস। ১০ নম্বর মহা বিপদ সংকেত। যে কোন সময় ঘূর্ণিঝড় “বুলবুল” আঘাত হানতে পারে। ‘সবাই আশ্রয় কেন্দ্রে যান। নিরাপদ আশ্রয় নিন।’ এ ধরণের মহা বিপদ সংকেত শোনার পর প্রতিটি মানুষের মধ্যে ভীতি কাজ করবে কিংবা আতঙ্কিত হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে রাবেয়া একজন নারী। শুধু নারী নয়, তিনি ছিলেন গর্ভবতী মহিলা এবং বসতবাড়ীটিও ছিল শিব্সা নদীর কিনারে। বসতঘর সেতো ফুটো টিনের চালের ছাউনী। যাতায়াতের সরু মাটির রাস্তাও ছিল ভাঙ্গাচুরা। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই অন্য সাধারণ মানুষের চেয়ে রাবেয়ার মধ্যে অনেক বেশি ঘূর্ণিঝড় ভীতি ও আতঙ্ক কাজ করছিল। তাই ঝড়ের আগে ভাগেই শনিবার দুপুর ২টার দিকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে আশ্রয় নেয় সোলাদানা সাইক্লোন শেল্টারে। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত যত ভারি হয় রাবেয়া ততো উদ্বিগ্ন হতে থাকে। ঝড় শুরু হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে সময় অনুযায়ী তখন রাত ১টা বাজে। চারিদিকে তখন ঘোর অন্ধকার, বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। ঠিক এমনই সময় প্রসব বেদনা শুরু হয় রাবেয়ার। একদিকে রাবেয়ার প্রসব যন্ত্রণা, অন্যদিকে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। প্রাকৃতিক এ দুর্যোগের মধ্যে পরিবারের লোকজন ছুটে যায় পাশ্ববর্তী গ্রাম্য ডাক্তার গৌর’কে আনতে। ঝড়ের ভয়ে ডাক্তার আসতে রাজি না হওয়ায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এসএম এনামুল হককে দিয়ে ফোন করানো হয় ডাক্তারকে। শেষ মেষ ভোর রাতের দিকে ডাক্তার চলে আসে সাইক্লোন শেল্টারে। অনেক চেষ্টার পর সকাল ৭টার দিকে যখন ঘূর্ণিঝড় প্রবল গতিবেগ নিয়ে আঘাত হেনেছে এমন সময় চিকিৎসক ইপিসিওটমি এর মাধ্যমে স্বাভাবিক ডেলিভারী করেন রাবেয়ার। এ সময় রাবেয়ার একটি ফুটফুটে কন্যা সন্তান ভ‚মিষ্ট হয়। বাবা-মা সহ পরিবারের লোকজন তার নাম দেয় “বুলবুলি”। 

রাবেয়ার শারীরিক অবস্থা স্বাভাবিক না থাকায় আশ্রয় নেওয়া অন্যান্য মানুষ ঝড় শেষে বাড়ি ঘরে ফিরলেও রাবেয়া থেকে যায় আশ্রয় কেন্দ্রে। পরিবারের লোকজন তাকে সোমবার সকালে বাড়ী নিয়ে আসে। এ খবর পেয়ে মঙ্গলবার সকালে মমতাময়ী পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার জুলিয়া সুকায়না উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে ছুটে যান খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা গ্রামস্থ শিব্সা নদীর তীরে অবস্থিত রাবেয়ার বাড়ীতে। ফুটো টিনের চালের ঘরে চাঁদের আলোর মত ফুটফুটে বুলবুলিকে দেখেই তার মায়ের কোল থেকে নিজের কোলে নেন ইউএনও জুলিয়া সুকায়না। অনেকটা সময় নিজের কোলে রেখে বুলবুলিকে মমতা মাখা আদর ও স্নেহ দিয়ে ভরিয়ে দেন ইউএনও। এ সময় ইউএনও বুলবুলির বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন নানা রকম উপহার সামগ্রী। তাৎক্ষণিক ভাবে ফুটো টিনের চালের ঘর মেরামতের যাবতীয় দায় দায়িত্ব নেন জুলিয়া সুকায়না। ফুটো টিনের চালের ঘরে ইউএনও’র মত একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে কাছে পেয়ে আবেগ আফ্লুত হয়ে পড়েন বুলবুলির পরিবার। হতবাক হয়ে যান উপস্থিত এলাকাবাসী। 

সবাই ইউএনও’কে ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, দেশের প্রতিটি উপজেলায় যদি জুলিয়া সুকায়নার মত একজন মানবিক ও মমতাময়ী ইউএনও থাকে তাহলে দেশের কোন বুলবুলির মমতা, ভালবাসা, স্নেহ ও আদরের অভাব থাকবে না। 

উল্লেখ্য, রাবেয়া উপজেলার সোলাদানা গ্রামের কামাল গাজীর মেয়ে। তারা দুই বোন। ছোট বোন গ্রামের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনা করে। রাবেয়া ছোট থাকতে তার পিতা তাদেরকে ফেলে রেখে অজানার উদ্দেশ্যে চলে যায় যে আজও ফিরে আসেনি। ৪ বছর আগে পাশের দেলুটি ইউনিয়নের আমজেদ গাজীর ছেলে দিনমজুর আমিন গাজীর সাথে বিয়ে হয় রাবেয়ার। দুই বছর আগে তার একটি পুত্র সন্তান হলেও জন্মেরপর সে মারা যায়। এ জন্য ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের মধ্যে সাইক্লোন শেল্টারে জন্ম নেয়া বুলবুলি’কে আশির্বাদ এবং আশার আলো হিসেবে দেখছে এবং নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করছে রাবেয়া।