Opu Hasnat

আজ ১৮ নভেম্বর সোমবার ২০১৯,

৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার চেক উদ্ধার : ডিসি অফিসের ফাইল উদ্ধার

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সাবেক কর্মরত নজরুল আটক চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার সাবেক কর্মরত নজরুল আটক

নগরীর ষোল শহরের চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সের দ্বিতীয় তলার ‘আনুকা ফ্যাশন’ নামে দোকানে বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়ে গ্রাহক থেকে অগ্রিম নেওয়া ঘুষের নগদ সাড়ে ৭ লাখ টাকাসহ ৯১ লাখ ৮৩ হাজার টাকার চেক উদ্ধার করা হয়েছে। একইসাথে ভূমি অধিগ্রহণের ফাইলও উদ্ধার করা হয়েছে । এ সময় আটক করা হয় মূল হোতা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখায় সাবেক কর্মরত ও ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কার্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত নজরুল ইসলাম বাবু (৫৫) ও জেলা প্রশাসনের পিয়ন তার সহযোগী অফিস কর্মচারী তছলিম উদ্দিন (৩৩)। তছলিম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাগের টাকা নিতেই এসে ধরা খান বলে জানা গেছে। 

দুদকের চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক রতন কান্তি দাস জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা অভিযান চালিয়ে নগদ টাকা, স্বাক্ষর করা চেক উদ্ধার করেছি। নজরুলের সঙ্গে আরো একজনকে আটক করা হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার বেশ কিছু এলএ মামলার ফাইল উদ্ধার করা হয়েছে। জানতে পেরেছি ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকার বড় একটি অংশ নজরুল কমিশন হিসেবে নিতেন। কমিশনের টাকার লেনদেন হতো এই শো-রুমে। ফাইল প্রসেসিংয়ের কাজও হতো এখানে। দুর্নীতির সঙ্গে আর কারা জড়িত তা জানতে নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাকে রিমান্ডে আনা হবে। শো-রুমটির পেছনে বড় বড় তাকে থরে থরে সাজানো ছিল ফাইল। 

প্রসঙ্গত, আটককৃত নজরুলের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার মির্জাপুরে। জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার চেইনম্যান থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকেসহ তিনজনকে তাৎক্ষণিক বদলির নির্দেশ দেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এমপি। এরপর তার কর্মস্থল হয় ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদে। কিন্তু তিনি দিনের অধিকাংশ সময় শপিং কমপ্লেক্সে থাকেন বলে অনেক ভুক্তভোগীই অভিযোগ করেছেন।

দুদক সূত্রে জানা যায়, হটলাইন-১০৬ এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের এনফোর্সমেন্টের একটি টিম অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।

দুদক জেলা সমন্বিত কার্যালয় চট্টগ্রাম-২ উপ-সহকারী রিয়াজ উদ্দিন বলেন, গ্রেপ্তার নজরুল ইসলামের চিটাগাং শপিং কমপ্লেক্সে ৩টি দোকান রয়েছে। সেখানে প্রতিদিন বিকালে ভূমি অধিগ্রহণ, জায়গাজমির দলিলসংক্রান্ত কাজে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে অবৈধ লেনদেন হয়। এতে বিভিন্ন গ্রাহক থেকে অগ্রিম নেওয়া ঘুষের টাকার ১২টি চেক ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। এসব দোকানগুলোর ২টি তার নামে ও একটি স্ত্রীর নামে নেওয়া হয়। এছাড়া স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাট ও একটি প্রাইভেট কারও রয়েছে বলে জানা যায়। 

নগরীর ২ নম্বর গেট চিটাগাং শপিং সেন্টারের দ্বিতীয় তলার ‘আনুকা ফ্যাশন’ নাম মাত্র । এ শো-রুমের আড়ালেই চলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার (ভূমি অধিগ্রহণ) সকল অবৈধ লেনদেন। যেখানে কৌশলে দোকানের ভেতর তৈরি করা হয়েছে ছোট্ট কামরা। এই কামরাতেই প্রতিদিনের যাতায়াত রয়েছে স্বয়ং এলএ শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের। অভিযোগ রয়েছে, দিনের বেলায় জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে অফিস করেই সন্ধ্যার পর থেকেই ‘আনুকা ফ্যাশন’র ছোট্ট কামরায় বসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের রাতের অফিস। যেখানে বসে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে থাকা ভূমি শাখার টাকা লেনদেনের ভাগাভাগিও হয়ে থাকে। আর এসব কাজ হয় জেলা প্রশাসকের প্রথম সারির এক কর্মকর্তার নেতৃত্বেই। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা নজরুল ইসলাম বাবুকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ও বিভিন্ন গ্রাহকের কমিশনের কোটি টাকার চেকসহ গ্রেপ্তারের পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

এলএ শাখার অন্তত ১০ কর্মকর্তা-কর্মচারীই এই সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রণ করেন। মূল হোতা এলএ শাখার প্রথম সারির কর্মকর্তা হলেও তার নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন গ্রেপ্তার হওয়া নজরুল ইসলাম। ভূমি অধিগ্রহণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সরকারের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ যে টাকা পান, সেই টাকা ছাড় করাতে এই চক্রকে কমিশন দিতে হয়। এই চক্রটি কমিশন না দিলে মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করে। নজরুলের ‘আনুকা’ নামের দোকানটি সবার কাছে পরিচিত মিনি এল এ শাখা হিসাবে। যেখানে ছুটির দিনেও চলে এমন অবৈধ লেনদেন। যাতে কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের কাগজপত্র নিয়ে এখানে আসতে বলা হতো। কমিশন পেলেই তবে টাকা ছাড় পেতেন। যা অগ্রিম দিয়ে দিতে হয় ক্ষতিগ্রস্তদের। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নানাভাবে হয়রানি করে এই সিন্ডিকেট।

দুদক ও এলএ শাখার সূত্রে জানা যায়, কোন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি তার প্রাপ্যতা আদায়ে জেলা প্রশাসনের এলএ শাখায় যোগাযোগ করলে সার্ভেয়ার ও কর্মকর্তারা এই নজরুলের সাথে প্রথমে যোগাযোগ করতে বলেন। আর নজরুল তাদের শপিং কমপ্লেক্সের এই দোকানে নিয়ে এসে কমিশনের বিষয়টি প্রস্তাব দেন। কমিশনের চেক বা নগদ টাকা হাতে পেলে নজরুল ‘সিগন্যাল’ দিতেন এলএ শাখায়। এ সিগন্যাল পাওয়ার পর অফিস সহকারী (নজরুলের আপন চাচাতো ভাই) সায়েম চেক ইস্যু করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তা হস্তান্তর করতেন। আর এসব কাজে সহযোগিতা করেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের একাধিক কর্মচারী। এছাড়া এই সিন্ডিকেটে নাম রয়েছে এলএ শাখার একাউন্ট অফিসার লালু ও অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা নিপুতি শীলের। যারা নিয়মিতই ‘আনুকা’ ফ্যাশনের যাতায়াত করেন।

এদিকে এলএ শাখার এই কর্মচারীর নগদ ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ এবং গাড়ির সন্ধান পেয়ে বিস্মিত হন স্বয়ং দুদক কর্মকর্তারা। 

কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, এটা কিভাবে সম্ভব। জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার ফাইল কিভাবে অফিসের বাইরে গেল। কি পরিমাণ দুর্নীতি হলে এ অবস্থা হতে পারে।