Opu Hasnat

আজ ৮ ডিসেম্বর রবিবার ২০১৯,

বদলে যাওয়া চুয়াডাঙ্গা সদর মডেল হাসপাতাল

জনবল সংকট হলেও সেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ রোগীদের স্বাস্থ্যসেবাচুয়াডাঙ্গা

জনবল সংকট হলেও সেবায় সন্তুষ্টি প্রকাশ রোগীদের

চুয়াডাঙ্গা সদর মডেল হাসপাতালের মুল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশের সময় মনে হবে বিলাসবহুল বেসরকারি কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ফুলবাগান বা নার্সারি বললেও ভুল হবেনা। পুরো হাসপাতাল ঝকঝকে-তকতকে, মেঝেতে মোজাইক ও টাইলস বসানো। চিরচেনা দুর্গন্ধের বদলে ফুলের সুবাস হাসপাতালের চারিদিকে। বছরদুয়েক আগেও সরকারি এ হাসপাতাল মানেই ছিল অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উৎকট গন্ধ, ব্যবহারের অনুপযোগী টয়লেট। চুরি-ছিনতাই ও দালাল ঠেকাতে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। সেবার মান নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্টি না থাকলেও বর্তমান পরিবেশ দেখে মানুষের মাঝে অভিযোগ করার কথা ভুলে যায়। অন্যান্য সরকারি হাসপাতাল নিয়ে রোগীদের যে বিস্তর অভিযোগ চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে তা নেই। হাসপাতালের চিকিৎসকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিদিন সময়মতো অফিসে আসা থেকে শুরু করে তাদের কর্তব্যপালনে যথাযথ চেষ্টা করেন। আর এর সবকিছুই সম্ভব হয়েছে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন এমপি, পৌর মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু, চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন, হাসপাতালের সকল চিকিৎসক, চুয়াডাঙ্গা জেলার সুধী সমাজ আর যিনি নিরলস ভাবে সবকিছু গুছিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করে শক্ত হাতে তদারকি করেছেন সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শামীম কবীর। শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, সেটাকে বাস্তবে পরিনত করতে সঠিক মানুষের প্রয়োজন হয়। 

স্বপ্নকে বাস্তবে রুপদানকারিরা হলেন- সদর মডেল হাসাপাতাল বাস্তবায়ন কমিটি :
চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন এমপি সদর হাসপাতালকে উন্নতি করতে ২০১৭ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার সুধি সমাজের বিভিন্ন ব্যাক্তিদের সাথে আলোচনায় বসেন তিনি। লক্ষ্য হাসপাতালের বেহাল অবস্থা থেকে ফিরিয়ে এনে একটি মডেল হাসপাতাল হিসাবে গড়ে তোলা, সেবার মান বৃদ্ধি করাসহ সর্বপরি এখান থেকে মানুষ সেবা নিয়ে সন্তুষ্টি থাকবে সেরকম একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা। চুয়াডাঙ্গার সুধি সমাজের সকলে সোলায়মান হক ছেলুন এমপির কথায় সারা দিয়ে একসাথে এগিয়ে আসেন হাসপাতালের উন্নয়নে। পরে সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন এমপিকে সভাপতি ও দেলোয়ার উদ্দিন দুলুকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির নাম দেয়া হয় সদর মডেল হাসপাতাল বাস্তবায়ন কমিটি। বাস্তবায়ন কমিটির পক্ষ থেকে ৫ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী দেয়া হয়েছে, হাসপাতালের উন্নয়ন খাতে ১০ লক্ষ টাকা খরচ করা হয়েছে এ কমিটির পক্ষ থেকে। চালু করা হয়েছে নতুন একটি ডায়রিয়া ওয়ার্ড, সৌন্দয্য বৃদ্ধির জন্য হাসপাতালের গোল চত্বরে টাইলস বসানো হয়েছে। ২২ টি সিলিং ফ্যান, ওষুধ ও ফাইলপত্র রাখার জন্য প্রতিটা ওয়ার্ডে একটা করে র‌্যাক দেয়া হয়েছে। শিতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক মানের লেবার রুম, অপারেশনের পর সার্বক্ষনিক অবজার্ভেশনে রাখার জন্য নতুন শিতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি পোষ্ট অপারেটিভ রুম চালু করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের হয়রানি এড়াতে গোড়ে তোলা হয়েছে একটি হেল্পডেক্স। পুরাতন এসি গুলোকে সচল করা হয়েছে। মুল ফটকের সামনে রাস্তার দুধারে করা হয়েছে লাইটিংয়ের ব্যবস্থা। পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য সবরকম পথ্য দেয়া হয়।

কমিউনিটি সাপোর্ট কমিটি : সদর হাসপাতালকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পৌর মেয়র ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপুর অবদান চোখে পড়ার মতো। প্রথমে তিনি জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মো. জানিফসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে হাসপাতালের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি কমিউনিটি সাপোর্ট কমিটির নামে কমিটি গঠন করে এর মাধ্যমে হাসপাতালের পরিচ্ছন্ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ২২ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী, তাদের তাজের তদারকি করার জন্য সার্বক্ষনিক একজন সুপারভাইজার, প্রতিমাসে পরিস্কার করার জন্য সবরকমের পথ্য দিয়ে থাকেন তিনি। চুয়াডাঙ্গার যেসব শিল্পপতিরা বাইরে থাকেন তাদের সাথে যোগাযোগ করে এবং তাদের নিকট থেকে বিভিন্ন সময় অনুদান নিয়ে মেয়র জিপু হাসপাতালের পরিচ্ছন্ন কাজে ব্যায় করেন। শুধু তাইনা, সময় পেলে নিজেই হাসপাতালে গিয়ে কাজের তদারকি করেন। 

চিকিৎসকদের অনুদান : সদর হাসপাতালের সুন্দর পরিবেশ এবং অসহায় রোগীদের পাশে থাকেন হাসপাতালের সকল চিকিৎসককেরা। কোন গরীব রোগী ওষুধ কেনার টাকা না থাকলে হাসপাতাল সমাজ সেবা রোগী কল্যাণ সমিতির পাশাপাশি চিকিৎসকেরা ব্যাক্তিগত ভাবে তাদের ওষুধ কিনে দেন। শুধু কি তাই, হাসপাতালের চারপাশে ফুলের বাগান করতে প্রতিবছর চিকিৎসককেরা অনুদান দিয়ে থাকেন। 

সাবেক মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন : সদর মডেল হাসপাতালের বিভিন্ন সমস্যায় এগিয়ে আসেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাবেক মেয়র রিয়াজুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার টোটন। হাসপাতালের স্যালাইন সংকটসহ বিভিন্ন সংকটাপন্ন মুহুর্তে তাকে সব সময় পাশে পায় হাসপাতাল কতৃপক্ষ।  

সঠিক তদারকি : সবাই সবকিছু দিলেও তদারকি করার জন্য একজন সঠিক মানুষের প্রয়োজন। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সঠিক পরিচালনা করার জন্য একজন যোগ্য ব্যাক্তিকেই যোগ্য দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি হলেন সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শামীম কবীর। ২০১৭ সালে যোগদানের পর থেকে তিনি হাসপাতালের আগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। তার নিরলস পরিশ্রম আর সঠিক তদারকিতে হাসপাতালের পরিবেশ হয়েছে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। কেবিন গুলো আধুনিক করে গড়ে তোলা হয়েছে এবং কেবিনের সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে। হাসপাতালের চারিদিকে গড়ে তোলা হয়েছে ফুলের বাগান আর বিভিন্ন ফলের গাছ লাগানো হয়েছে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতায় বিশেষ অবদান রাখায় জেরা প্রশাসকের নিকট থেকে স্বর্নপদক পান ডা. শামীম কবীর। 

স্বাস্থ্য সেবা : শুধু চুয়াডাঙ্গা জেলার মানুষইনা, আশপাশের জেলার মানুষও আসে এখানে সেবা নিতে। প্রতিদিন বহি:বিভাগে চিকিৎসা নেয় দুই হাজারেরও বেশী রোগী আর আন্ত:বিভাগে ভর্তি থাকে আড়াইশ থেকে ৩শ’ রোগী। জনবল সংকটের কারনে চিকিৎসা সেবা দিতে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হলেও সন্তুষ্টি নিয়েই বাড়ি ফেরেন রোগীরা। সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মারুফ হাসান নিজেই মাঝে মাঝে জরুরি বিভাগসহ আন্ত:বিভাগে রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।   

জনবল সঙ্কট ও নতুন ভবনের উদ্বোধন : এ ব্যাপারে চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এএসএম মারুফ হাসানের নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল শুরু থেকে ৫০ শয্যার হাসপাতাল। ১শ’ শয্যায় উন্নিত হলেও ৫০ শয্যার জনবল দিয়েই কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। ২২ টি চিকিৎসকের স্থলে ৬ টি পদ শুন্য আছে। নার্স, সুপারভাইজার, ফার্মাসিষ্টসহ প্রতিটা পদেই জনবলের ঘাটতি আছে। দেশের সকল সদর হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ৯ টি করে চিকিৎসকের পদ আছে কিন্তু চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে একটিও নেই। সর্বপরি সরকারি কোন সুযোগ সুবিধাই নেই এখানে। তিনি আরও বলেন, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালকে একটি মডেল হাসপাতালে রুপান্তরিত করতে প্রয়োজন আইসিইউ, আধুনিক এক্স-রে মেশিন, বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষার জন্য একটি অ্যালাইজা মেশিন, সিটিস্ক্যান মেশিন ও সিসিইউ। সিভির সার্জন ডা. এএসএম মারুফ হাসান আরও বলেন, গত একমাসে গাইনী ওয়ার্ডে নরমাল ডেলিভারী করা হয়েছে ১২৮ জন, সিজারিয়ান ৫১ এবং অন্যান্য অপারেশন করা হয়েছে ২৮০ টি। নতুর ভবন সম্পর্কে তিনি বলেন,  নতুন ভবনের উদ্বোধন হলেও চালুর অপেক্ষার প্রহর গুনছে। সেবার মান ও রোগীদের সুচিকিৎসা দিতে অচিরেই নবনির্মিত ভবনটি চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুন ভবনটি চালু করলেই হবেনা দিতে হবে জনবলও। আর এর জন্য প্রয়োজন সরকারের সু-নজর।