Opu Hasnat

আজ ২১ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ২০১৯,

ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার প্রথম সাহিত্য সম্মিলন শিল্প ও সাহিত্য

ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার প্রথম সাহিত্য সম্মিলন

বাংলা ভাষা আমাদের অহংকার, আমাদের ঐতিহ্য আমাদের ইতিহাস, আমাদের নিজস্ব ভূখন্ড সৃষ্টির সার্বজনীন অনুপ্রেরণা। হাজার বছরের চর্চায় সমৃদ্ধ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি। আমাদের গুণী কবি-সাহিত্যেকদেও সাহিত্য কর্মেও মাধ্যমে আবহমান বাংলার সংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে। বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ বিশ্ববরেণ্য কবি-লেখকদের অবদানে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের উৎকর্ষ সর্বজন স্বীকৃত। সে পথ ধরেই রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন দেশের লেখকদের অংশগ্রহণে এই উৎসব সাহিত্যের মাত্রাকে প্রসারিত করেছে। পারস্পরিক জানাশোনা বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে সমৃদ্ধির পরিসর বেড়েছে। যে সমৃদ্ধির যাত্রাপথে বয়ে যায় শান্তি ও শুভ বোধের সৌরভ। 

শনিবার (১৯ অক্টোর) দিনব্যাপী এই সচেতনবোধের বার্তা নিয়ে লেখকরা সামিল হয়েছিলেন রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ শাখার আয়োজনে মানবিক চেতনার অঙ্গনে। যেখানে মনুষ্যত্ববোধের চেতনা অস্ত্রের মুখে, সাম্রাজ্যবাদী হুমকির মুখে ধুলোয় মলিন হবেনা। মাতৃভাষার জন্য প্রাণদানকারী জাতি হিসেবে আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। তেমনি বাংলা ভাষার লেখক হিসেবে এই গৌরব মাথায় নিয়ে আয়োজিত এ আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব তরুণ প্রজন্মেও সামনে সাহিত্যেও রঙধনু হয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এগিয়ে আসুক তরুণরা, ভিন্ন দেশের লেখকদের বন্ধুত্বের সৌহার্দ্যরে বন্ধনে গড়ে তুলুক সাহিত্যের অমর বিশ্ব। সাহিত্যের সাংস্কৃতিক বোধে গড়ে উঠুক নতুন ভুবন। এমনটিই বলেলন বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা এ সাহিত্য সম্মেলনের কবি-সাহিত্যিকগণ। 

‘নট জাস্ট ফর ইউর সেলফ্ রাইট ফর আদারস’ এ প্রতিপাদ্য নিয়ে প্রথম রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল সাহিত্য উৎসব-২০১৯ অনুষ্ঠিত হয় মোহাম্মদপুর, ঢাকা। শনিবার (১৯ অক্টোবর) সকালে বেসরকারী সংস্থা পদক্ষেপ ট্রেনিং সেন্টারের সেমিনার হলে দিনব্যাপী রাইর্টাস ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ শাখার আয়োজনে এ সাহিত্য সম্মিলনের কর্মসূচী হিসাবে প্রথমপর্বে ছিল “গ্লোবাল লিটেরেচর এন্ড বাংলাদেশ” এ শিরোনামে অলোচনা সভা, মধ্যাহ্ন ভোজের পর ২য় পর্বে ছিল বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদের সন্মাননা প্রদান, তৃতীয় পর্বে সন্ধ্যায় ছিল কাব্য পাঠ। দিনব্যাপী এ উৎসবে বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা খ্যাতিমান নবীণ-প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকগণের সাথে অংশ নিয়েছেন ভারত, নেপাল এবং ভুটানের কবি ও কথা সাহিত্যিকগণ।

রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ শাখার আয়োজনে এ উৎসবের প্রথম ও ২য় পর্বেও সভা প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন কবি অধ্যাপক এমএ ইউসুফ। এ সাহিত্য উৎসবের প্রধান অতিথী হিসাবে আসন অলংকৃত করেন কবি মাকিদ হায়দার। বিশেষ অতিথী হিসাবে এ সাহিত্য উৎসবে আলোকিত ছিলেন রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট রাজেন্দ্রা গুরাগাঁইন (নেপাল), হারকাবিশ্ব (ভুটান), নিশিকান্ত সিন্হা (ভারত) এবং উক্ত সংস্থার গ্লোবাল সেক্রেটারী জেনারেল সৈয়দা রুখসানা জামান শানু (বাংলাদেশ)। জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা শুভারাম্ভ করা হয়। এরপর সকল অতিথীকে রজনীগন্ধ্যা ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। এ সাহিত্য উৎসবটি উৎসর্গ করা হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে।

রাইটার্স  ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার গ্লোবাল সাধারণ সম্পাদক বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দা রুখসানা জামান শানু তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, ভার্চুয়াল জগতের আর্শিবাদ নিয়ে অসম্প্রদায়িক মানবিক চেতনায় সমুজ্জ্বলের ফসল আজকের রাইর্টাস ইন্টারন্যাশনালের আয়োজনে ‘সাহিত্য উৎসবের আয়োজন ও স্মরণিকা’র প্রকাশ। আমি মনে করি সাহিত্য ও  সংস্কৃতি চর্চা মানুষের মনুষ্যত্বকে সচেতন করে তোলে। সাহিত্যেও পরিধি বিশাল এবং এখানে কোন সীমানা নির্ধারন সম্ভব নয়। তাই আমাদেও পরিধি শুধু কবিতায় এবং দেশের মাটিতে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের সাহিত্য- সংস্কৃতির মূলে যেমন শেকড় গেড়েছি এবং তা বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টায় রয়েছি, তেমনি অন্যেও সাহিত্য-সংস্কৃতিকে ভালোবেসে জানার চেষ্টা করে যাচ্ছি। ফলশ্রূতিতে আজকের ক্ষুদ্র প্রয়াশ অর্থাৎ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে সন্মানিত বরেণ্য কবি ও সাত্যিকদের এ মিলন মেলা। আমাদের সকলের সব সময় উদ্যোগ রয়েছে কিভাবে সবুজ এ পৃথিবী আমাদের সম্মীলিত কলমে আরো সবুজাভ হয়ে উঠবে। পৃথিবীর রাজনীতিতে আজ কালো মেঘের ঘনঘটা। এ মেঘ কবে কাটবে তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে অনন্য জীবন সংগ্রামী, প্রতিবাদী এবং অন্যায়ের বিরূদ্ধে সোচ্চার কলম যোদ্ধারা সমাজ গঠনে তাঁদেও জীবৎকালেই যে অবদান রেখে চলেছেন এ ধারা অব্যহত থাকলে অচিরেই কালো মেঘ কেটে যাবে। বিভিন্ন রাষ্ট্র ও ধর্মের মধ্যে বিভাজনের রাজনীতি যখন মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব, অবিশ্বাস ও ঘৃণা বাড়িয়ে তুলছে তখন সুস্থ সুন্দর সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাই পারে উদার মানববোধকে বাঁচিয়ে রাখতে, মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক মিলন ঘটাতে। সমাজের সকল অশুভ বাঁশির অশুভ সুরের বাঁধাকে পেরিয়ে আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতির ঐক্য, বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের ঐক্য। আমাদের মা আমাদের পৃথিবী। আমাদের পৃথিবী আমাদের ছাতা। সবাই এ মায়ের ছাতায় একে অন্যের সংস্কৃতি ও সাহিত্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্বটুকুই কাঁধে নিয়েছি।  তিনি আরো বলেন, এটি যুক্তরাজ্যের ক্লোরাডো হতে নিবন্ধিত একটি সাহিত্য সংস্থা। রাইটার্স ইন্টারন্যাশনাল আন্তর্জাতিক এ সংগঠনের পথচলা শুরুহয় ২০১৬ সালে। বিশ্বের ১৫টি দেশ এ সংস্থার আওতাভূক্ত এবং ৩২টি দেশের সাথে কথা চলছে, খুব শিঘ্রই সেসব দেশের কবি-সাহিত্যিকগণ এ সংস্থার সাথে যুক্ত হবেন। তবে আজকের এ দিনটি অক্ষয় এবং অমর হয়ে থাকবে সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা কাজ করে যাচ্ছি আগামী প্রজন্মের সাহিত্য সংস্কৃতির  জগতে যোগ্য সংগঠক তৈরীর লক্ষ্যে। সৃষ্টিশীল মানুষ বেঁচে থাকেন তাঁর কর্মের গুণে। এসব বরেণ্যজনের কথা, অভিজ্ঞতা, জীবন দর্শন যাতে কালের বিবর্তনে হারিয়ে না যায়  সে লক্ষ্যে  “রাইটারর্স ইন্টারন্যাশনাল” কাজ করে যাচ্ছে সকল কবি-লেখক, গবেষক, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, ভাষা সৈনিক এঁদের জীবনী সংগ্রহ কওে সংরক্ষনশালায় রাখতে । যাতে আগামী প্রজন্ম খুব সহযে গবেষনার কাজ করতে পারে। পৃথিবীর সর্বত্র্যে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতার এ গণজাগরণ ছড়িয়ে যাক দায়িত্বের সাথে। গ্লোবাল লিটেরেচর এন্ড বাংলাদেশ” এ শিরোনামে আজকের আন্তর্জাতিক মিলন মেলায় আমাদের সকলের এটিই প্রত্যাশা।

সৈয়দা রুখসানা জামান শানু তাঁর শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষ করে যুক্তরাজ্য থেকে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারযোগে পাঠানো এ সংস্থার প্রেসিডেন্ট জ্ঞ্যায়ান্যান্দ্র গাদালের শুভেচ্ছা বার্তা পড়ে শুনান। আলোচনা চলে দুপুর ২টা পর্যন্ত। মধ্যাহ্ন ভোজের পর শুরু হয় বরেণ্য কবি-সাহিত্যিকদে রলিটারেরি এ্যাওয়ার্ড প্রদান পর্ব। এ পর্বে সাহিত্য সন্মান পান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে কবি মাকিদ হায়দার, কবি অধ্যাপক এম.এ. ইউসুফ, বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ মাযহারূল পারভেজ, বহমাত্রিক লেখক মফিদা আকবর, কথা সাহিত্যিক বিলু কবির, এ্যাডভোকেট এনামুল হক মোল্লা, কবি গিয়াস উদ্দিন চাষা, কবি ফরিদ সিফাতুল্লাহ, সাংবাদিক ইমদাদুল হক তৈয়ব। ঠাকুরগাঁও থেকে কবি চঞ্চল রায়, রংপুর থেকে লোক কথা সাহিত্যিক রাজু আনওয়ারুল, পাবনা থেকে মোখলেস মুকুল, মেহেরপুর থেকে কথা সাহিত্যিক রফিকুর রশিদ, কুষ্টিয়া থেকে এম এ. শহিদুল ইসলাম। ভারত থেকে আগত লোককথা সাহিত্যিক প্রমোদ নাথ, কবি ও গল্পকার নিশিকান্ত সিনহা, কবি অধ্যাপক ড. শীলা দত্ত ঘটক। নেপাল থেকে আগত কবি ও অনুবাদক রাজেন্দ্রা গুরাগাঁইন, কবি ও লিটিল ম্যাগ সম্পাদক গোকুল অধিকারী, কথা সাহিত্যিক দেবা অধিকারী এবং লোককথা সাহিত্যিক অধ্যাপক ড. মুকুন্ডা শর্মা। ভুটান থেকে আগত কবি ও শিক্ষাবিদ হারকাবিশ্ব। একই মঞ্চে নেপাল লেখক পরিষধের পক্ষ থেকে দেবা অধিকারী সৈয়দা রুখসানা জামান শানুকে সন্মাননা জানান। প্রানবন্ত এ সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কথা সাহিত্যিক মোাখলেস মুকুল।

আশাকরি এই উদ্যোগ আমাদের জাতীয় চেতনা ও মূল্যবোধকে বিশ্ব দরবাওে তুলে ধরতে সাহায্য করবে এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে এক অনন্য নজীর স্থাপন করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আলোচকগণ। 

এরপর সন্ধ্যায় শুরু হয় কথা সাহিত্যিক রফিকুর রশীদের সভাপতিত্বে তৃতীয় পর্ব অর্থাৎ স্বরচিত কাব্য পাঠ ও সঙ্গীত পরিবেশন। কাব্য পাঠ করেন কবি এম.এ. ইউসুফ, কবি মাকিদ হায়দার, বিলু কবির, সৈয়দ মাযহারুল পারভেজ, মফিদা আকবর, এম শহিদুল ইসলাম, ফরিদ সিফাতুল্লাহ, রাজু আনওয়ারূল, রাজেন্দ্রা গুরাগাইন, গোকুল অধিকারী, দেবা অধিকারী, হারকাবিশ্ব, মোখলেস মুকুল, প্রমোদ নাথ, নিশিকান্ত সিন্হা এবং সৈয়দা রুখসানা জামান শানু। অধ্যাপক ডক্টর শীলা দত্ত ঘটকের একক তিনটি গান পরিবেশেনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষনা করা হয়।