Opu Hasnat

আজ ১৮ নভেম্বর সোমবার ২০১৯,

ঢাবির হলে হলে শিক্ষার্থী নির্যাতন, হল সংসদগুলোর মিথ্যাচার ক্যাম্পাস

ঢাবির হলে হলে শিক্ষার্থী নির্যাতন, হল সংসদগুলোর মিথ্যাচার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলগুলোতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও অস্বীকার করছেন হল ছাত্র সংসদের নেতারা। 

গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ ছাত্রলীগের টর্চারসেলে পিটুনিতে নিহত হওয়ার পর একে একে গণমাধ্যমে উঠে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে টর্চারসেল থাকার বিষয়টি।  

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছাত্র সংসদের নেতারা বিষয়টি অস্বীকার করে গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করেছেন। উল্লেখ্য থাকে যে, ছেলে শিক্ষার্থীদের ১৩টি হলের হল ছাত্র সংসদের বেশিরভাগ নেতা ছাত্রলীগেরও নেতা এবং প্যানেল থেকে নির্বাচিত। 

হল ছাত্র সংসদগুলোর নেতারা বিবৃতিতে বলেন, ‘আমরা দ্বিধাহীন চিত্তে জানাচ্ছি যে, হলে এমন কোনো নিপীড়নের স্থল নেই।’  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্দিষ্ট করে টর্চারসেল নামে কোনো কক্ষ না থাকলেও হলের অতিথিকক্ষ, হল শাখা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের শয়নকক্ষ, গণরুম ইত্যাদি মূলত হলে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এখান থেকেই ছাত্রলীগের প্রোগ্রাম বা গেস্টরুম না করলে, মতের বিরুদ্ধে গেলে, বড় ভাইদের কথা না শুনলে এবং অন্যান্য কারণে যেকোনো শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের উপর নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। তবে অনেক সময়ই নিপীড়নের শিকার শিক্ষার্থীরা ভয়ে প্রত্যক্ষদর্শী থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের কাছে অস্বীকার করে বসেন। 

এছাড়া আরও জানা গেছে, হলের গেস্টরুমগুলোতে রাত নয়টা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা বা বারোটা পর্যন্ত মানসিক নির্যাতন করা হয়। মা-বাপ তুলে গালিগালাজ করা হয়। বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা হয়। চড়-থাপ্পর মারা হয়। রড়-স্ট্যাম্প দিয়ে পিটানো হয় এবং ভয় দেখানো হয়। এরপর রাত ১২ টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ঘুরতে বাধ্য করা হয় এবং সংগঠন ও হলের নামে স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। আবার সকাল থেকে মধুর ক্যান্টিনসহ বিভিন্ন প্রোগ্রামে যেতে বাধ্য করা হয়, না গেলে আবার রাতে গেস্টরুমে নির্যাতন করা হয় এবং হল ছাড়া করার হুমকি দেয়া হয়। অনেককে বিভিন্ন সময়ে বের করাও হয়েছে। হলের গণরুমে (যেখানে গেস্টরুম করানো হয়) সরেজমিনে রড়-স্ট্যাম্পও দেখা যায়।

তবে গত মার্চ মাসে ডাকসু নিবার্চনের সময় থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত ক্যাম্পাস ঘুরে ঘুরে স্লোগান দিতে বাধ্য করার বিষয়টি কয়েকটি হলে নিষিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বিগত দিনের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে গত ১৩ জুলাই ছাত্রলীগের কর্মসূচিতে না যাওয়ায় প্রথম বর্ষের ২৪ জন শিক্ষার্থীকে রড-স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো হয়। পরে ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে মুনিরুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থীকে দেড় ঘণ্টা আটকে মানসিক নির্যাতন ও চাপ প্রদান করেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এর আগে ১৮ এপ্রিল ২০১৯ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সারা রাত ক্যাম্পাস ঘুরতে বাধ্য করা হয়, যে তথ্য গণমাধ্যমের হাতে রয়েছে।

মাস্টারদা সূর্যসেন হল সূত্রে কয়েকদিন আগে প্রাপ্ত এক অডিও ক্লিপে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলের ৬২৬ (ক) নং কক্ষে মানসিক এবং শারীরিকভাবে নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায়। তৃতীয় বর্ষের বড় ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীর ‘যোগাযোগ থাকায়’  নানাভাবে হেনস্তা ও জেরা করা হয়। একপর্যায়ে প্রথম বর্ষের এক শিক্ষার্থীকে চড় দেওয়ার শব্দও শোনা যায় অডিও ক্লিপে। এ বিষয়ে সত্যতা ঐ হলের শিক্ষার্থীদের বক্তব্য থেকেও নিশ্চিত হওয়া গেছে।

২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে নিজের ক্যালকুলেটর চাইতে গিয়ে দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী এহসান রফিক নামের এক শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের নির্যাতনে চোখ হারান। এঘটনায় একজনকে স্থায়ীভাবে, পাঁচজনকে দুই বছরের জন্য আর একজনকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কৃতরা হলেই থাকছেন বলে জানা গেছে। এর আগে একই হলে ২০১৬ সালে হাফিজুর নামের মার্কেটিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী গেস্টরুম নির্যাতনের শিকার হয়ে নিউমোনিয়া ও টাইফয়েড এ আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

ছাত্রলীগের নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়ার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদদীন হলের এক শিক্ষার্থীকে মারধর করে ছাত্রলীগ। তাঁরা ওই শিক্ষার্থীর পেটে লাথি মারে, যেখানে সম্প্রতি অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এ ছাড়া ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতাকে এবং জগন্নাথ হলে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থীকেও মারধর করে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ২০১৭ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি (বুধবার) ও ৩রা ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) এসব ঘটনা ঘটে।

২ আগস্ট, ২০১৫ সালে বিজয় একাত্তর হলে হলের ছাত্রলীগ নেতারা হোসাইন, এনায়েত ও মানিক নামের তিন শিক্ষার্থীর হাত বেঁধে, মুখে গামছা ঢুকিয়ে, পেছন থেকে মুখ চেপে ধরে ক্রিকেটের ব্যাট দিয়ে একের পর এক আঘাত করেন। চিৎকার যাতে বাইরে যেতে না পারে, সে জন্য নির্যাতনকারীদের একজন চেয়ারের পেছন থেকে মুখে গামছা চেপে ধরে রাখেন। 

২০১৭ সালে স্যার এ এফ রহমান হলে বেশ কয়েকবার শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি স্যার এ এফ রহমান হল শাখা ছাত্রলীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক হলের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের প্রকাশ্যে রফা দফা করার এবং গেস্টরুম নির্যাতন করার ঘোষণা দেন।

আওয়ামী লীগের বন্ধু সংগঠন ছাত্রলীগের আগেও অন্যান্য দলের ছাত্র সংগঠনের দ্বারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উপর ব্যাপক নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তবে ১১ বছর ধরে টানা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভাগ্যে ছাত্রলীগের দ্বারা তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। গত পাঁচ বছরের হিসেব ঘেঁটেই দেখা গেছে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দের দ্বারা অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে গত ১১ মার্চ শিক্ষার্থীদের আশার বাতিঘর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার পরও আসেনি তেমন কোনো পরিবর্তন। বরং তারাও নির্যাতনকারীদের পক্ষ নিয়ে বিবৃতি দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আস্থা হারাচ্ছেন বলে মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকগণ।

এদিকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে ক্যাম্পাসে উচ্চস্বরে হর্ণ বাজিয়ে মােটর বাইক চালানো, মােটর বাইক শোডাউন, রাতের বেলা সাংগঠনিক কর্মসূচীর বাহিরে মিছিল করা, স্লোগান দেয়া প্রভৃতি নিরুৎসাহিত করা; বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনরত গণমাধ্যমের সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে সদা সম্ভাব বজায় রাখা ও গণমাধ্যমের বন্ধুদের সংবাদ প্রচারে সহযোগিতা প্রদানকে কর্তব্য বিবেচনা করে নেতা কর্মীদের আচরণ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা; আবাসিক হলগুলােতে কথিত গেস্টরুমের নামে পরিচালিত যে কোন অসৌজন্যমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে কেউ জড়িত থাকলে তা থেকে বিরত থাকাসহ সাতটি নির্দেশনা দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন। 

শিক্ষার্থী নির্যাতনের বিষয়ে কথা বললে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের(ডাকসু) সদস্য মোঃ মাহমুদুল হাসান বলেন,‘ গত ৭ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করছি। টর্চারসেল সম্পর্কে নতুন শুনলাম। কেউ ব্যাক্তিগতভাবে কিছু করতে পারে তবে সেটা সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আমার কাছে মনে হয় সম্প্রতিক সময়ে যে টর্চারসেল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তা বেশি বলা হচ্ছে কিংবা নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনকে টার্গেট করে। আমরা ডাকসু থেকে এব্যাপারে বিভিন্ন হল সংসদের সাথে আলাপ করে খোঁজ নিচ্ছি। আমরা জানি টর্চারসেল নেই কিন্ত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আলোচনা করবো আমরা।’

তবে এ বিষয়ে কথা বলতে ডাকসু’র জিএস ও সদ্য সাবেক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি।

এ বিষয়ে ডাকসু’র ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হলগুলোকে ছাত্রলীগের কাছে অলিখিতভাবে ইজারা দিয়েছে। তাই তারা যাচ্ছেতাই করে বেড়াচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে গেলে শিবির ব্লেইম দিয়ে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। যদি হলগুলোতে টর্চার সেলই না থাকত তাহলে হাফিজুরদের মৃত্যুবরণ করতে হতো না। সামান্য একটি ক্যালকুলেটরকে কেন্দ্র করে এহসানের চোখ নষ্ট করা হতো না।’

এ বিষয়ে কথা বলতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য এবং ডাকসু’র সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ আখতারুজ্জামান এর সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।