Opu Hasnat

আজ ১৭ নভেম্বর রবিবার ২০১৯,

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছে মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়ার হাজারো জনসাধারণ মুন্সিগঞ্জ

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মেঘনা নদী পাড়ি দিচ্ছে মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়ার হাজারো জনসাধারণ

নদীবেষ্টিত মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলাটি ৫১ বর্গমাইল আয়তনের। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পার্শ্ববর্তী গজারিয়া উপজেলার দূরত্ব মাত্র ৭ কিলোমিটার, কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা নাজুক হওয়ায় সড়ক পথে ৭০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। 

প্রায় দেড় বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়া ফেরি সার্ভিস উদ্বোধন করে জনসাধারণকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু তিন মাস চালু থাকার পর বন্ধ হয়ে যায় সেই ফেরী সার্ভিসটি। তাই বাধ্য হয়ে প্রতিদিন দুই উপজেলাবাসী ঝুঁকি নিয়ে মেঘনা পাড়ি দিচ্ছেন। এই রুটে এতটাই দুর্ঘটনা ঘটেছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রতিদিন ফিটনেসবিহীন আর হালকা এসব ট্রলারে চেপে মেঘনা পাড়ি দিচ্ছেন যাত্রীরা। 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার হিসেবে দেয়া গজারিয়া ফেরি সার্ভিস এখন আর নেই। ২০১৮ সালের ৩ জুন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ‘স্বর্ণচাপা'-নামের মিনি ইউটিলিটি টাইপ ফেরি উদ্বোধনের মাত্র তিন মাস চালু থাকার পর সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ফেরি সার্ভিসটি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই রুটের হাজারো যাত্রী। বর্তমানে সেই ফেরিটি বরিশাল-ভোলা রুটে চলাচল করছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। 

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ সদরের দক্ষিণ ইসলামপুর থেকে যোগনীঘাট ব্রিজ হয়ে চরকিশোরগঞ্জ এলাকার মেঘনা ঘাট গজারিয়া উপজেলায় প্রবেশের অন্যতম একটি যোগাযোগ মাধ্যম। এ সড়ক পথে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এখন প্রধান বাহন। বর্তমানে দক্ষিণ ইসলামপুর থেকে মেঘনাঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কটির সংস্কারের কাজ চলছে। এছাড়া কাজ চলছে গজারিয়ার অভ্যন্তরীণ ঘাটের সড়কের। এর কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২০ সালে।

গজারিয়া লঞ্চঘাটে গিয়ে জানা যায়, মেঘনাঘাট দিয়ে প্রতিদিন শহশ্রাধীক মানুষ যাতায়াত করে। গজারিয়া-মুন্সীগঞ্জ রুটে ১০-১৫টির মতো ট্রলার রয়েছে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলাচল করে এসব ট্রলার। 

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সদর থেকে প্রতিদিন গজারিয়াগামী স্কুল শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারী, ব্যবসায়ী, বেসরকারি চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। ফেরি বন্ধ থাকায় মেঘনাঘাট থেকে গজারিয়াঘাট যাওয়ার একমাত্র ভরসা এখন ট্রলার। কিন্তু তাও সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চালু থাকে। ছোট বড় দুর্ঘটনা এই রুটের প্রতিদিনকার ঘটনা। 

এদিকে, বর্ষা এলেই মেঘনা নদী উত্তাল হয়ে যায়, সঙ্গে দেখা দেয় ঝড়ো হাওয়া। প্রচন্ড ঢেউ থাকায় ট্রলারের যাত্রীরা ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে নদীপথ পাড়ি দেয়। কখনও বা প্রবল ঢেউয়ে উল্টে যায় এসব ট্রলার। অধিকাংশ ট্রলারই লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন। এসব ট্রলারে নেই জীবন রক্ষাকারী কোনো সরঞ্জাম। ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী নিয়ে এই নৌরুটে চলাচল এবং রাতে অবৈধ বাল্কহেড চলাচলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।

গজারিয়া থেকে মুন্সীগঞ্জ সদরে এসে অফিস করেন অনেক সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা। তারা জানান, মুন্সীগঞ্জ থেকে গজারিয়ার দূরত্ব মাত্র ৭ কিলোমিটার। মৃত্যুঝুঁকি এড়িয়ে প্রাননাশের ভয়ে ৭০ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে দেখা যায় অনেককেই। প্রতিদিন অফিস করতে হয় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে। অনেক সময় অফিস শেষ করে স্বল্প সময়ের জন্য ট্রলার মিস হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর ট্রলার চালককে বাধ্য হয়ে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা দিয়ে নদী পার হতে হয়। ট্রলারগুলো অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে একমাত্র রুট হওয়ার কারণে। ফেরি চালু করার পর কিছুটা হলেও সুফল পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু ফেরি বন্ধের পর শুরু হয় আবার দুর্ভোগ। দুই উপজেলাবাসীর সুবিধার্থে এখন যদি আবার ফেরিটি চালু করা হয় তাহলে সুফল পাওয়া যাবে। 

ট্রলার চালক আসলাম হোসেন জানান, বিকেল থেকে যাত্রীদের সমাগম কমতে থাকে। এছাড়া তেল খরচ এবং সন্ধ্যার পর ট্রলার চালালে প্রভাবশালী একটি মহলকে মোটা অংকের চাঁদা দিতে হয়। তাই অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। 

বাল্কহেডের কারণে দুর্ঘটনার ব্যাপারে গজারিয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান জানান, বাল্কহেড চলাচলের ব্যাপারে নজরদারি রাখা হয়। 

এই রুটে প্রতিদিন যাতায়াতকারী যাত্রী গজারিয়া থানা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এই পথটি। অভিযোগ দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা নেই। ছোট ট্রলারগুলোও ২০-২৫ জন যাত্রী বহন করে। কয়েক মাস আগেও একজন মাঝি ট্রলার থেকে পড়ে গিয়ে মারা যায়। সেখানে সাধারণ যাত্রীদের কি অবস্থা। ট্রলারগুলোতে যদি লাইফ জ্যাকেট ও ফিটনেস পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় তাহলে যাত্রীরা সুফল ভোগ করবে। এছাড়াও মেঘনা দিয়ে অনেক বাল্কহেড চলাচল করে, এসবের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ফেরি যখন চালু ছিল তখন সুফল পাইনি। রাস্তা ভালো ছিল না, গাড়ি আসতো না। তাই ট্রলার চালকদের কাছে জিম্মি সাধারণ যাত্রীরা।  

মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়া ফেরির চালক ফজলুর রহমান জানান, বরিশাল লাহারহাট ফেরি টার্মিনালের 'স্বর্ণচাপা' ফেরিটি এখন বরিশাল-ভোলা রুটে যাতায়াত করে। ৭-৮ মাস হবে মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়া রুটের স্বর্ণচাপা ফেরিটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফেরিটি সরিয়ে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, রাস্তাঘাট নেই, গাড়ি নেই। কোটি টাকার সম্পদ এখানে তো লস দেওয়া যায় না। ১৪ জন স্টাফদের প্রতিদিন বেতন দিতে হয়। ৩ মাস ফেরিটি চালিয়ে ২৪টি গাড়ি পার করা হয়েছিল। ফেরিটি আসা যাওয়া করতে ৫০ লিটার তেল প্রয়োজন হতো, এভাবে ফেরি চালিয়ে পোষানো যেতো না। সরকারের যদি লাভ না হয় তাহলে তো আর বেতন দেবে না। সরকারের যেখানে লাভ হবে সেখানে পাঠিয়েছে ফেরিটি। রাস্তা নির্মাণ হোক, গাড়ি বাড়লে তখন ফেরি চালু করা হবে। 

তিনি আরো জানান, ফেরি চালুর পর স্টাফদের ট্রলার চালকরা মারধর করেছিল, হুমকিও দিয়েছিল। যাত্রীরা ফেরিতে উঠলে শাসানো হতো। 

জেলা মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, এই নৌরুটে একটি বড় ট্রলারের ব্যবস্থা করা হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এ ব্যাপারে নজর রাখতে বলা হবে। বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ-গজারিয়া দুই ঘাটের সড়কের কাজ চলছে, অগ্রগতি ভালো। রাস্তার কাজটি শেষ হলে ফেরি আবার চালুর ব্যাপারে কাজ করবে জেলা প্রশাসন।

প্রসঙ্গত, গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের আধার মানিক গ্রামের আওলাদ হোসেনের মেয়ে সোনিয়া। গত ৩১ মে ট্রলারে চেপে জীবনের প্রথম প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা দিতে মেঘনা পার হয়ে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট আসছিলেন। পথে বাল্কহেডের ধাক্কায় ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয় সোনিয়া, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছিল আরো ২০ জন যাত্রী। এছাড়া অনেক যাত্রী আহত হয়ে প্রাথমিক নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।