Opu Hasnat

আজ ৬ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১৯,

সৈয়দপুরে ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হলো পবিত্র আশুরা নীলফামারী

সৈয়দপুরে ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হলো পবিত্র আশুরা

নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে সৈয়দা রুখসানা জামান শানু : নীলফামারীর সৈয়দপুরে কঠোর নিরাপত্তা আর যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ৩ দিনব্যাপি মহররমের নানা আনুষ্ঠানিকতা। মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) শিয়া ও সুন্নী উভয় মতের অনুসারিরা পৃথক পৃথক কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে দিনটি পালন করেন। সৈয়দপুর অবাঙ্গালি অধ্যুষিত জনপদ হওয়ায় ভিন্ন আঙ্গিকে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে যথাযথ মর্যাদায় আশুরা পালন করে। ব্রিটিশ শাসনামল পেরিয়ে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরও বংশ পরম্পরায় সৈয়দপুরের এসব বাসিন্দারা ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী বিশেষভাবে আশুরার দিনটি পালন করে আসছেন। তাদের মধ্যেও শিয়া ও সুন্নি উভয় মতের অনুসারী রয়েছে। তাই অনুষ্ঠান উদযাপনের তরিকাতেও রয়েছে ভিন্নতা। সৈয়দপুরে রয়েছে ৪৬টি ইমামবাড়া। ইমামবাড়ার দায়িত্বে থাকা মুরব্বীকে বলা হয় খলিফা। এবং সেই খলিফার তত্বাবধানে প্রতি ইমামবাড়ায় চলে ৩ দিন ব্যাপি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা। এর আগে মহররমের ৭ তারিখে শহরের হাতিখানায় অবস্থিত প্রতিকি কারবালা থেকে কিছু মাটি আনা হয়। বিশেষ নিয়ম অনুযায়ী সে মাটি একটি পাত্রে করে প্রতিটি ইমামবাড়ায় তাজিয়ার নিচে সংরক্ষিত রাখা হয়। এর পর তাজিয়াকে কেন্দ্র করে চলে অন্যান্য রীতিনীতি পালন। মহররমের ১০ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন মাটি যেখান থেকে আনা হয়েছিল সেখানেই রেখে আসা হয়। সে মাটি রাখার জন্য যেতে হয় শোকাবহ মিছিল নিয়ে।

কারও কারও শরীর রঙিন রশি, জরির ফিতা ও ছোট ছোট ঘুন্টির মালা দিয়ে পেঁচানো। প্রত্যেকের মাথায় সাদা ও সবুজ কাপড়ের টুকরো দিয়ে ঢাকা। হাতে লাল সবুজ আর সাদা রংয়ের পতাকা নিয়ে শত শত  লোকের খন্ড খন্ড মিছিল প্রদক্ষিন করে শহরের ৪৬টি ইমামবাড়া। এবং আশুরার দিন সকল পাইকওয়ালা একত্রিত হয়ে ছুটে যান প্রতিকি কারবালায়। তখন তিল ধরনের জায়গা থাকে না। শহরের গুরুত্বপর্ণ জায়গাগুলোয় চলে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা, তলোয়ার ও আগুনের বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা। কেউ কেউ ইমাম হোসেনের স্মরণে রাস্তায় রাস্তায় পানি ও শরবত নিয়ে বসে মানুষের পিপাসা মিটান।

মহররমের ১০ তারিখ আনুষ্ঠানিকতার শেষ দিন হওয়ায় এদিন শরের হাতিখানায় প্রতিকি কারবালায় মানুষদের ঢল নামে। ইয়া হুসাইন জিন্দাবাদ ধ্বনীতে পাইকওয়ালাদের দলে দলে আগমন এক অন্যরকম আবহ তৈরি করে পুরো কারবালার মাঠে। প্রতিকি কারবালার তওয়াফ করে পাইকওয়ালারা তাদের পাইক খুলে আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি করেন। পাইকওয়ালাদের এ আগমন দেখতে এ সময় আশপাশের বিভিন্ন শহর থেকেও বিপুল মানুষ আসেন শেষ আনুষ্ঠানিকতা দেখতে। কানায় কানায় পূর্ণ কারবালায় ইয়া হুসাইন, হায় হুসাইন ধ্বনীতে মুখোরিত হয়ে উঠে পুরো মাঠ প্রাঙ্গন। বিকাল গড়াতেই দল বেধে কারবালার দিকে ছুটে আসেন পাইকওয়ালারা। ফলে আশে পাশের ২ কিলো পর্যন্ত জামে পড়ে মানুষ। 

কারবালার ইমামবাড়ার আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক এরশাদ হোসেন পাপ্পু বলেন, বিশ্বনবী (সাঃ) এর কলিজার টুকরা ইমাম হোসাইনের মহব্বতে এ পাইকওয়ালারা তিন দিন ইমাম হোসেনের প্রতিকি দুলদুল সেজে মানত করে থাকেন। চাঁদ ওঠার সাথে সাথে এ প্রতিকি কারবালার মাটি নিয়ে প্রতি ইমামবাড়ায় দেওয়া হয়। পরে শেষ দিনে এ কারবালায় এসে পাইক খুলে ও নিয়ে যাওয়া মাটি ফেরত এনে এর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। অপরদিকে একটি অংশ আশুরা উপলক্ষে মসজিদে মসজিদে মিলাদ মাহফিল, কোরানখানি ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করে। বিভিন্ন মসজিদে আলোচনা সভায় আশুরার তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় শিরনি বিতরণ করতে দেখা গেছে। এছাড়াও অনেকে ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখেন।

এদিকে পুরো আনুষ্ঠানিকতাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ৩ দিন শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেয় পুলিশ। আশুরার দিন কারবালার মাঠকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব-১৩ এর পক্ষ থেকে টহল ব্যবস্থা করা হয় জোরদার। মাঠে প্রবেশের সকল রাস্তায় বসানো হয় চেকপোস্ট। প্রতি সন্ধেহভাজনের ব্যাগ তল্লাশীর মাধ্যমে মাঠে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান পাশা জানান, কোন অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সে লক্ষ্যে নিরাপত্তা প্রদানে কোন ঘাটতি করা হয়নি প্রশাসনের পক্ষ থেকে। সুষ্ঠুভাবে যাতে আশুরার শেষ আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয় সে লক্ষ্যে আইনশৃংখলা বাহিনী কাজ করেছে। 

শিয়া সম্প্রদায়ের পৃথক কর্মসূচী :
এদিকে সৈয়দপুর-পাবর্তীপুর সড়কে অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায় তাদের জেলা মার্কাজ শিয়া মসজিদ থেকে শোক শোভাযাত্রা বের করে। বুক চেপে হায় হোসাইন হায় হোসাইন ধ্বনীতে মুখোরিত শোভাযাত্রায় সৈয়দপুরসহ ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারীসহ আশপাশের শহরের শিয়া সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুরা অংশ নেয়। শোক মিছিলে নওহা, কাসিদা, মর্সিয়া, শোকগাথা ও ইমাম হোসাইনের জীবনী পাঠ সহ এসময় কালেমা খচিত বিভিন্ন পতাকা বহন করে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা। এ সময় মিছিলে অংশ নেয়া অনেকের মাথায় শোকের কালো কাপড় বাঁধা ছিল। এছাড়া হাতে জরি লাগানো সবুজ নিশান নিয়ে মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়। কারবালার ঘটনা স্মরণে বহন করা হয় ইমাম হোসেনের (রাঃ) প্রতিকি কফিন। শোভাযাত্রাটি মার্কাজ থেকে বাস টার্মিনাল হয়ে পূণরায় মার্কাজে গিয়ে শেষ হয়।  শোক শোভাযাত্রাটি দেখতে শহরের বিপুল মানুষ ভিড় করে সেখানে। 

সৈয়দপুরস্থ শিয়াদের আঞ্জুমানে আব্বাসীয়ার সাধারণ সম্পাদক শাহিদ রেজভী জানান, প্রতিবছর এ মার্কাজ থেকে  সৈয়দপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন শহরের বিপুল সংখ্যক শিয়া সম্প্রদায় অংশ গ্রহন করে থাকেন। আইনশৃংখলা বাহিনীর পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকায় সন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।