Opu Hasnat

আজ ১৯ আগস্ট সোমবার ২০১৯,

গোপালগঞ্জে চলছে দলিল লেখকদের নীরব ধর্মঘট গোপালগঞ্জ

গোপালগঞ্জে চলছে দলিল লেখকদের নীরব ধর্মঘট

গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্টার অফিসের দলিল লেখকরা নীরব কর্মবিরতি পালন শুরু করেছে। প্রায় ১ মাস ২২ দিন ধরে দলিল লেখকরা তাদের কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়েছে। এদিকে হঠাৎ করে ১ মাস ২২ দিন ধরে দলিল লেখকরা তাদের কাজকর্ম বন্ধ করে নীরব ধর্মঘট পালন করায় দলিল করতে আসা সাধারন লোকজন পড়েছেন বেকায়দায়। দলিল লেখকদের নীরব কর্মবিরতিতে গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। ফলে সব ধরনের রেজিস্ট্রি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রেজিস্ট্রেশন করতে আসা জমির দাতা ও গ্রহীতারা। গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আওতায় ২১টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ২০০ থেকে ২৫০টি দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে। দলিল লেখকদের নীরব কর্মবিরতির কারনে সকল প্রকার রেজিস্ট্রি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সরকার প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।

সরোজমিনে গিয়ে জানা যায়, শাহ আব্দুল আরিফ গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্ট্রার (অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব) হিসাবে গত ২৬ জুন তারিখে এ অফিসে যোগদান করেন। তিনি এ অফিসে যোগদানের পর থেকে দলিল লেখকদেরকে দলিলের সাথে জমির খাজনা রশিদ ও প্রকৃত সকল বৈধ কাগজপত্র জমা দিয়ে দলিল সম্পাদনের নির্দেশ প্রদান করেন। আর শুধু মাত্র এ কারনেই গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসের দলিল লেখকরা নীরব কর্মবিরতি পালন শুরু করে। দলিলের সাথে জমির খাজনা রশিদ ও প্রকৃত সকল বৈধ কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ পাওয়ার পর দীর্ঘ ১মাস ২২ দিন যাবত ধরে বন্ধ রয়েছে সকল ধরনের রেজিস্ট্রি কার্যক্রম। ফলে লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার আর সেই সাথে ভোগান্তি পড়েছে জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা। দলিল লেখকদেও এ নীরব ধর্মঘটের কারনে সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গত ১মাস ২২ দিনে কোনো দলিল রেজিস্ট্রি না হওয়ায় এখানে জমি ক্রেতা ও বিক্রেতারা পড়েছেন বিপাকে। দিনের পর দিন রেজিস্ট্রি অফিসে এসে জমি দলিল করতে না পেরে তাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন দলিল লেখক এই প্রতিনিধিকে জানান, গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্ট্রার শাহ আব্দুল আরিফ স্যার একজন সৎ মানুষ। তিনি জমি দলিল করতে যা যা কাগজপত্র প্রয়োজন সেগুলি দেখতে চেয়েছেন এটাই তার অপরাধ। আমরা সমিতি ভুক্ত তাই ইচ্ছা থাকলেও কোন জমির রেজিস্ট্রি করতে পারছি না। এর একটা সুষ্ঠ সমাধান হওয়া উচিত।

গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসে জমির দলিল করতে এসে চরম বিপাকে পড়ছে সাধারণ মানুষ। এতে একদিকে যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার অন্যদিকে আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে দলিল লেখকদের। শুধু সাধারণ মানুষ নয় জমি বেচা-কেনা আর রেজিস্ট্রি না হওয়ায় চরম সমস্যায় পড়েছেন দলিল লেখকরাও। দলিল লিখতে ও রেজিস্ট্রি করতে না পারায় বন্ধ হয়ে পড়েছে তাদের আয়-রোজগার। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে তাদের। আর এসব কাজ বন্ধ থাকায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাতে হচ্ছে সরকারকে।

দলিল করতে আসা সদর উপজেলার ডালনিয়া গ্রামের বশার মোল্লা বলেন, গত ১ মাস ২১ দিন ধরে সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ঘুরছি। কিন্তু দলিল করতে পারছি না। প্রতিদিন আসছি, আর  ফিরে যেতে হচ্ছে। এ ভোগান্তির শেষ কবে হবে জানি না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন দলিল লেখক এই প্রতিনিধিকে জানায়, গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসের বর্তমান অফিসার জমি ক্রয় বিক্রয়ে সকল ধরনের নিয়ম কানুন মেনে চলেন, কাগজপত্র যাচাই বাছাই করতে একটু সময় লাগে। তবে দলিল লেখকদের নীরব ধর্মঘটের কারনে এখন কোনো দলিল হচ্ছে না।

দলিল করতে আসা রহমত আলী বলেন, গত ১ মাস ১৫ দিন ধরে আমি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে আসছি। কিন্তু দলিল লেখকদের নীরব ধর্মঘট চলায় জমির দলিল করতে পারিনি। আমাকে বারবার ফিরে যেতে হয়েছে।

জমি বিক্রেতা ফজর শেখ বলেন, আমার বিশেষ প্রয়োজনে টাকার দরকার। সে জন্য আমি নিজের জমি টুকু বিক্রি করে দেবো। কিন্তু দলিল লেখকদের নীরব ধর্মঘট চলায় জমি যার কাছে বিক্রি করবো তার নামে দলিল করে দিতে পারছি না। কয়েক বার এসে ফিরে যেতে হয়েছে। সে জন্য আমি জমি বিক্রি করতে পারছি না আবার জমি বিক্রির টাকাটাও পাচ্ছি না। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে আমাকে।

দলিল করতে আসা শাহজাহান চৌধুরী ও আরিফ হোসেন বলেন, বেশ কয়েকদিন ধরে এই অফিসে জমির দলিল করার জন্য আসছি আর ফিরে যাচ্ছি। দলিল লেখকদের নীরব ধর্মঘট চলায় সে জন্য আমরা জমি বিক্রি করতে পারছি না আবার জমি বিক্রির টাকাটাও পাচ্ছি না। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে আমাদেরকে।

সাব-রেজিষ্ট্রার অফিসের দলিল লেখক সালাউদ্দিন খান ও খায়রুল ইসলাম জানান, গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্টার অফিসের দলিল লেখকদের নীরব কর্মবিরতি পালনের জন্য দীর্ঘ ১মাস ২২ দিন ধরে তাদের কোন কাজ-কর্ম নেই। সাধারণ মানুষ এখানে এসে জমির দলিল করেতে পারছেন না। ফলে একদিকে যেমন আমাদের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে পড়েছে তেমনি প্রতিদিন রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

এ ব্যাপারে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফায়েকুজ্জামানের সাথে তার ব্যবহৃত মোবাইল ০১৭১৮-২০৬২৫১ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে রাজী হননি।

এ ব্যাপারে দলিল লেখক সমিতির সাধারন সম্পাদক খায়রুল ইসলামের সাথে তার ব্যবহৃত মোবাইল ০১৭১৬-২২৯৫৫২ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের গোপালগঞ্জ সদর সাবরেজিষ্ট্রি অফিসে একজন নতুন সাবরেজিষ্ট্রার আগামী ২৮ জুলাই যোগদার করবে। উনি যোগদান করার পর থেকে আমরা নতুন করে দলিলের কাজ শুরু করবো।

এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ সদর সাব-রেজিষ্টার (অতিরিক্ত দ্বায়িত্বে) শাহ আব্দুল আরিফ বলেন, আমাদের প্রভিশন আছে জমির খাজনা রশিদ জমা নিয়ে দলিল করার। কিন্তু অধিকাংশ লোক খাজনা রশিদ সংযুক্ত করেন না। গোপালগঞ্জে এই নিয়মটা চালু করতে গিয়ে আমি বিপাকে পড়েছি। জমির সঠিক কাগজপত্র দেখে রেজিস্ট্রি করার বিধান রয়েছে আমি সেটি ফলো করি। তাই দলিল লেখকদের সমস্যা হচ্ছে। মুলত জমির খাজনা রশিদ ও প্রকৃত কাগজপত্র জমা নিয়ে দলিল সম্পাদনের নিয়ম চালু করতে গিয়েই আমি দলিল লেখকদের রোষানলে পড়েছি। জমির মূল কাগজপত্র দেখে রেজিস্ট্রি করার বিধান রয়েছে। আমি সেই বিধান প্রতিপালন করি। এতে দলিল লেখকদের সমস্যা কি হচ্ছে আমার জানা নেই।

দলিল লেখকদের ধর্মঘটের ফলে সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে দলিল করতে আসা মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছেন। দেখা দিয়েছে অচলাবস্থা এ সংকট নিরশনে উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন গোপালগঞ্জের সাধারন মানুষ।

এই বিভাগের অন্যান্য খবর