Opu Hasnat

আজ ১৩ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১৯,

মৎস্য সপ্তাহ-২০১৯

সৈয়দপুরে বছরে মাছের ঘাটতি সোয়া ৩ হাজার মেট্রিক টন নীলফামারী

সৈয়দপুরে বছরে মাছের ঘাটতি সোয়া ৩ হাজার মেট্রিক টন

সৈয়দপুর নীলফামারী থেকে সৈয়দা রুখসানা জামান শানু : ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ কথাটি এখন আর এই জনপদের মানুষের মুখে তেমন শোনা যায় না। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে প্রতিবছর নীলফামারীর সৈয়দপুরে মাছের ঘাটতি বাড়ছে। যেখানে বছরে মাছ জাতীয় আমিষের চাহিদা ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন সেখানে উৎপাদিত হচ্ছে ১ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন। ফলে আমিষ সংকটের কারণে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে বিভিন্ন রোগ-বালাই দিন দিন বেড়েই চলেছে। এছাড়া জলবায়ূ পরিবর্তনের কারণে ভরা মৌসুমেও এ অঞ্চলের নদী-নালা, খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় মাছের  উৎপাদন দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।  

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্র হতে জানা যায়, উপজেলার ৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভাসহ এলাকার ১২১.৬১ বর্গকিলোমিটারে আয়তনে মোট জনসংখ্যা হচ্ছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৪৬১ জন। বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য প্রতিবছর মাছের চাহিদা ৫ হাজার ২৫ মেট্রিক টন এর বিপরীতে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ১ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টন মাছ। ফলে প্রতিবছর মাছের ঘাটতি থাকছে ৩ হাজার ২৪২ মেট্রিক টন। 

উপজেলায় সরকারি পুকুর বা দীঘি রয়েছে ৬ দশমিক ২৫ হেক্টরে ১৬টি, বেসরকারি পুকুর বা দীঘি ২৬৪ দশমিক ৫৪ হেক্টরে ২ হাজার ৫শ’ ৭৮টি, বাণিজ্যিক মৎস্য খামারের সংখ্যা ৮ দশমিক ৬৫ হেক্টরে ৬টি, সরকারি বিলের সংখ্যা ৯ দশমিক ২৫ হেক্টরে ৬টি, বেসরকারি বিলের সংখ্যা ৫১০ হেক্টরে ১৩টি, নদীর সংখ্যা মাত্র ৭৭ হেক্টরের আয়তনে ২টি, সড়ক ও জনপথের জলাশয় ১টি, রেলওয়ের জলাশয় ৬ দশমিক ১৭ হেক্টরের আয়তনে ৭টি, রেনু উৎপাদন কেন্দ্র ১টি ও সরকারি মৎস্য হ্যাচারীর সংখ্যা ১টি। এছাড়া মৎস্যজীবী ৩ হাজার ৮১ জন, মৎস্য চাষির সংখ্যা ২ হাজার ১শ’ ২৫ জন। এরমধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মৎস্য চাষি রয়েছে ৭শ’ ৫ জন। এখানে বেসরকারি প্লাবনভূমি রয়েছে ১৩৪ দশমিক ৮২ হেক্টরের ৭টি, গলদা চিংড়ি চাষ করা হচ্ছে ২টিতে, খালের সংখ্যা ২টি। 

এসব নদী, পুকুর, দীঘি ও জলাশয় থেকে প্রতিবছর যে মাছ উৎপাদন হচ্ছে তাতে প্রতিবছর মাছ জাতীয় আমিষের ঘাটতি বাড়ছে। মানুষের সৃষ্টি পরিবেশগত পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকৃতিতেও মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে। হাটবাজারে চার ইঞ্চির ছোট মাছ  বেশি বিক্রি হচ্ছে। পুকুর, দীঘি, বিল শ্যালো মেশিনে পানি তুলে মাছ মারার কারণে বংশবৃদ্ধি হচ্ছে না। দীর্ঘদিন এসব খনন না করায় মাছ চাষের পরিধি কমে আসছে। কোথাও পরিকল্পিতভাবে মাছ চাষ করা হচ্ছে না। ফলে চাহিদা অনুযায়ী এখানে মাছ উৎপাদিত কমে আসছে। 

উপজেলার কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের আদর্শ মৎস্য চাষি ফজলুর রহমান (৫৫) জানান, সেভাবে সহযোগিতা না মেলায় মৎস্য চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে প্রায় ১ একর জমির দীঘিতে একদিকে মৎস্য চাষ অপরদিকে ধান চাষ করছেন। উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের নিজবাড়ি জেলেপাড়ার বানু (৪৫) জানান, নদী বা জলাশয়ে জাল ফেলে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। নদী খনন না করায় ভরাট ও বসতি গড়ে ওঠায় দেশী আনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত প্রায় বলে জানান তিনি। বাঙালিপুর ইউনিয়নের মাছ ব্যবসায়ী আমিনুর জানান, সচেতনতার অভাবে লোকজন ডিমওয়ালা ও ছোট মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করায় মাছের বংশ বিস্তার হচ্ছে না। 

সৈয়দপুর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সানী খান মজলিস জানান, সৈয়দপুরে চাহিদা অনুযায়ী মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমিষের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মৎস্যজীবী ও চাষি পর্যায়ে প্রদর্শনী স্থাপন, উপকরণ বিতরণ, প্রশিক্ষণসহ সবধরণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এই অঞ্চলের পুকুর, দীঘি ও বিলে সারাবছর পানি না থাকায় মৎস্য চাষে ব্যয় বাড়ছে। আপদকালীন সময়ে এসব মাছ উৎপাদন কেন্দ্রে শ্যালো মেশিনের সাহায্যে পানি দিতে হয়। মৎস্য চাষে উৎসাহ দিতে র‌্যালি, উদ্বুদ্ধকরণ সভা, নদী খননের প্রস্তাবনা দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বাজারজাতকরণের অভাবে এখানকার গলদা চিংড়ি চাষ প্রকল্পটি ভালো ফল দিচ্ছে না বলে জানান তিনি। পরিবারের আমিষের চাহিদা পূরণে মাছ চাষে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে জমিতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহারে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি আরও জানান, আগামি ২৩ জুলাই পর্যন্ত মৎস্য সপ্তাহ-২০১৯ চলবে। এর মাধ্যমে মৎস্য চাষি উদ্বুদ্ধকরণে সভা, প্রদর্শনী, মোবাইল কোর্ট, ফরমালিন ব্যবহার প্রতিরোধ বিষয়ে নানা কর্মসূচি পালন করা হবে। 

শহরের উপকন্ঠে কামারপুকুরে অবস্থিত বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের স্বাদু পানি উপকেন্দ্র অবস্থিত। সেখানকার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রাশেদুল হাসান জানান, বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির মাছ বংশবিস্তারে এই কেন্দ্রটি গবেষনার কাজ করছে। এখানে শিং, টাকি, টেংরা, তেলাপিয়া, সরপুটি ইত্যাদি দেশীয় জাতের মাছের গুণগত পোনা উৎপাদন করে প্রদর্শনী ও চাষি পর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। সেই সাথে মাছ চাষি ও পুকুর মালিকদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। স্বাদু পানি উপকেন্দ্রটি পূর্নাঙ্গ কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা হলে উপকৃত হবেন এই জনপদের মানুষ এ আশা ব্যক্ত করেন তিনি।