Opu Hasnat

আজ ১৩ ডিসেম্বর শুক্রবার ২০১৯,

তীব্র স্রোতে ফেরি চলাচল ব্যাহত, চার ঘাটে আটকা হাজারও যানবাহন রাজবাড়ী

তীব্র স্রোতে ফেরি চলাচল ব্যাহত, চার ঘাটে আটকা হাজারও যানবাহন

দেশের প্রধান দুই নৌরুট ও দক্ষিনাঞ্চলের প্রবেশদ্বার দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ও শিমুলিয়া কাঠালবাড়ি নৌরুটে তীব্র স্রোত ও ফেরি সংকটে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ জানজট। এতে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া, মানিগঞ্জের পাটুরিয়া, মুন্সিগঞ্জের শিমুলিয়া ও মাদারিপুর জেলার কাঠালবাড়ি ঘাটে পারের অপেক্ষায় আটকে আছে কয়েক হাজার ছোটবড় যানবাহন। 

বিআইডব্লিটিসি কার্যালয় সুত্রে জানাগেছে, দৌলতদিয়া পাটুরিয়া নৌরুটে ২০ টি ফেরি থাকলেও গত ঈদ উল ফিতরের এক সপ্তাহ পর থেকেই ৫ টি ফেরি বিকল হয়ে নারায়নগঞ্জের ডকইয়ার্ডে মেরামতে রয়েছে। এছাড়াও বাকি পনেরটি ফেরির মধ্যে ২ টি ফেরি বিকল ও ৩ ফেরি স্রোত চলতে না পারায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। এই নৌরুটে বর্তমানে চলাচল করছে ১০ টি ফেরি। 

অপরদিকে, বিআইডব্লিটিসি মাদারিপুরের কাঠালবাড়ি কার্যালয় সুত্রে জানাগেছে, শিমুলিয়া কাঠালবাড়ি নৌরুটে মোট ১৬ টি ফেরি চলাচল করলেও স্রোতর কারনে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে ১৩ টি ফেরিকে। মাত্র ৩ টি ফেরি দিয়ে চলছে এই নৌরুটের পারাপার। 

বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে দৌলতদিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দৌলতদিয়া জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা খুলনা মহা সড়কের জমিদার ব্রীজ পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার এলাকায় পারের অপেক্ষায় তিন সাড়িতে আটকে আছে অন্তত ২ হাজার ছোট বড় যানবাহন। এছারাও গোয়ালন্দ মোড় থেকে নিমতলা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত আরো এক কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত আটকে আছে পন্যবাহি ট্রাক।

এদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন দেখা যায়, পদ্মায় পানি বেড়ে দৌলতদিয়ার ৬নং ঘাটের পন্টুন নিমজ্জিত হয়ে গেছে। পন্টুনের র‌্যাম উচু হয়ে যাওয়ায় সেখান দিয়ে ঠিকমত যানবাহন ফেরিতে উঠতে পারছে না। ঘাট মেরামতের দায়িত্বে থাকা বিআইডব্লিউটিএ’র দায়িত্বশীল কাউকেই সেখানে দেখা যায়নি। এ সময় সেখানে উপস্থিত গোয়ালন্দের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবগত করলে তাদের কর্মীরা এসে ফেরির র‌্যাম ও নিমজ্জিত রাস্তায় বালু ও খোয়া ফেলে উচু করার কাজ শুরু করে।

এ ব্যাপারে গোয়ালন্দের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দৌলতদিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘাট। অথচ এখানে বিআইডব্লিউটিএ'র কোন অফিস বা স্থায়ীভাবে কোন কর্মকর্তা থাকেন না। ফলে জরুরী মুহুর্তে তাদের অনুপস্থিতিতে জনদুর্ভোগ বেড়ে যায়। আমি বিষয়টি বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর মোজাম্মেল হোসেনকে মুঠোফোনে অবগত করেছি।

এদিকে তীব্র স্রোতে ঠেলে নদী পার হতে গিয়ে বৃহস্পতিবারও তিনটি ফেরির সাইলেন্সারে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এতে আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি করে ফেরির যাত্রীরা।

এ সময় ফেরি শাহ আলীর যাত্রী আলী আজগর বলেন, ফেরিটি সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও পার হতে কষ্ট হচ্ছিলো। নদীর পাটুরিয়া অংশে যাওয়ার পর সাইলেন্সারে আগুন লেগে যায়। পরে অপর একটি এসে টেনে ঘাটের কাছে নিয়ে যায়।

দৌলতদিয়া ঘাটে আটকে থাকা গরু বোঝাই ট্রাকের চালক আব্দুল কাদের বলেন, আমি বুধবার রাত আটটার সময় সিরিয়ালে আটকা পরেছি। জানজট ঠেলতে ঠেলতে এখন ক্যানল ঘাটের কাছে এসেছি। সামনে আরো দুই কিলোমিটার আছে। বৃহস্পতিবার রাতেও মনে হয় পার হতে পারবো না। ঘাটের ভোগান্তি বুঝেনই তো। এখানে দালাল ছিনতাইকারী ও হকারদের উৎপাৎ তো আছেই।

যশোহরের গরু ব্যবসায়ী লোকমান ব্যপারি বলেন, সারারাত ঘাটে থেকে সারাদিন রোদে দারিয়ে থেকে গরুগুলো দুর্বল হয়ে পরেছে। সামান্য খরকুটো খাইয়ে কোন রকমে বাচিয়ে রেখেছি। ভালো দামের আশায় ১৬ টি গরু নিয়ে চট্টগ্রাম যাচ্ছি। প্রচন্ড গরমে যদি আমার একটি গরু মারা যায় তবে ব্যাবসা তো দুরের কথা আসল উঠানোই দায় হয়ে পরবে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ঘাট কর্তৃপক্ষ টাকা খেয়ে অন্যন্য পন্যবাহি ট্রাক ও যাত্রীবাহি গাড়ি পার করছে অথচ গরুর গাড়ি ছারছে না।

সাতক্ষীরা থেকে ছেড়ে আসা ঈগল পরিবহনের যাত্রী সুজন শিকদার বলেন, বুধবার সারাদিন সারারাত রাস্তায়ই কাটালাম। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ভেবেছিলাম ঘাট পেয়ে যাবো। অবশেষে গাড়ি থেকে নেমে লঞ্চে যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এভাবে আর চলে না ঘাট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেন তিনি।

অপরদিকে মাদারিপুর জেলার কর্মরত সংবাদকর্মী নাছিরুল ইসলাম নাছির জানান, গত এক সপ্তাহ যাবৎ তীব্র স্রোত ফেরি চলাচল ব্যহত হচ্ছে। এখন সেই স্রোতে প্রকট আকার ধারন করেছে। এই নৌরুটে মাত্র তিনটি ফেরি চলাচল করছে। বিকল্প রুট হিসেবে দ্যেলতদিয়া পাটুরিয়ার দিকে ছুটছে যানবাহন।

বিআইডব্লিউটিসি মাদারিপুর জেলার কাঠালবাড়ি ঘাটের ব্যবস্থাপক মোঃ আব্দুস সালাম মিয়া বলেন, কাঠালবাড়ি শিমুলিয়া নৌরুটে ১৬ টি ফেরি সচল থাকলেও চলাচল করছে মাত্র ৩ টি বাকি ১৩ টি ফেরি বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারো হাত নেই। ঘাট এলাকায় জানবাহনের সাড়ি আছে।

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া অফিসের ব্যবস্থাপক আবু আব্দুল্লাহ রনি জানান, দৌলতদিয়া পাটুরিয়া নৌরুটে তীব্র স্রোত নৌযান পারাপার ব্যহত হচ্ছে। এই নৌরুটে প্রতিদিন ১৯০ থেকে ১৯৫ টি ট্রিপ হতো। এখন তা কমে ১৪০ থেকে ১৪৫ ট্রিপে নেমে এসেছে। প্রতিদিন এক হাজার যানবাহন কম পার হচ্ছে। তাছারা স্রোতের বিপরিতে চলতে গিয়ে ফেরিগুলোতে আগুন ধরে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যেই বিকল হচ্ছে। আমরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি। তবে বিকল হওয়া ফেরিগুলো আগামী সপ্তাহে বহরে যুক্ত হওয়ার কথা জানান এই কর্মকর্তা।