Opu Hasnat

আজ ১৯ আগস্ট সোমবার ২০১৯,

বৃষ্টিতে ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস চট্টগ্রাম

বৃষ্টিতে ব্যাহত হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস

বৃষ্টির কারণে এক সপ্তাহ ধরে চট্টগ্রাম বন্দরে ব্যাহত হচ্ছে পণ্য খালাস । গত দুই মাসের ব্যবধানে বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার কন্টেইনার। গত ঈদুল ফিতরের টানা ছুটির কবলে পড়ে পণ্য খালাস বন্ধ থাকার রেশ কাটিয়ে উঠার মুহূর্তেই বর্ষার টানা বৃষ্টিতে পণ্য খালাস পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। এর মধ্যে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের পরিচালনাধীন কিছু লাইটার জাহাজ বহির্নোঙরে গেলেও বৃষ্টির কারণে স্ক্র্যাপ ছাড়া অন্য কোনো পণ্য খালাস সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বন্দর বড় ধরনের জাহাজটের কবলে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

এদিকে, আমদানি পণ্যবোঝাই কন্টেইনার ডেলিভারিতে ধীরগতির কারণে এখন কানায় কানায় পূর্ণ বন্দরের ইয়ার্ডগুলো। অতিরিক্ত সময় অবস্থানের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষ পেনাল রেন্ট আরোপের নোটিশ দেওয়া সত্বেও কন্টেইনার ডেলিভারিতে গতি আসছে না।

বন্দরে কন্টেইনার ধারণ ক্ষমতা (২০ ফুট সাইজ হিসেবে টিইইউ’স) ৪৯ হাজার ১৮টি। ১৪ জুলাই সকাল আটটা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৪৮৭টি। দুই মাস আগে ১৪ মে বন্দরে কন্টেইনার ছিল ৩৪ হাজার ৬৩৫টি। দুই মাসের ব্যবধানে কন্টেইনার সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৮৫২টি।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অন্তত ৩০ ভাগ কম কন্টেইনার থাকা উচিত। সেই হিসেবে বন্দরে কন্টেইনার থাকা উচিত ৩৪ হাজার ৩১৩টি। বর্তমানে স্বাভাবিকের চেয়ে কন্টেইনার আছে ১১ হাজার ১৭৪টি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে বন্দরে কন্টেইনারের সংখ্যা আরো বাড়বে। এই অবস্থায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবার মাঝে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় ১০ দিন ধরে টানা বৃষ্টির কারণে বর্হিনোঙ্গরে পণ্য খালাস বন্ধ থাকলেও মূল জেটিতে কন্টেইনারবাহী পণ্য ওঠানামা প্রায় সচল ছিল। বৃষ্টির কারণে জেটি থেকে পণ্য খালাসে ধীরগতির কারণে কন্টেইনারের সংখ্যা বাড়তে থাকে অস্বাভাবিক হারে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিবহন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের ১ জুলাই বন্দরে কন্টেইনার সংখ্যা ছিল ৪৩ হাজার ৫৭৩টি। ঐ দিন কন্টেইনার খালাস হয় ৪ হাজার ১৯৮টি। এরপর থেকেই ধীরে ধীরে কমতে থাকে কন্টেইনার ডেলিভারি সংখ্যা। ৬ জুলাই থেকে ডেলিভারি আরো কমতে থাকে। ঐ দিন সকাল আটটা পর্যন্ত ডেলিভারি হয় ৩ হাজার ৭১৩টি কন্টেইনার। ৭ জুলাই ডেলিভারি হয় ২ হাজার ৮২৬টি। বৃষ্টির কারণে কন্টেইনার ডেলিভারি পরিস্থিতির কোনভাবেই উন্নতি হচ্ছে না। সর্বশেষ ১৪ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত বন্দরে ডেলিভারি হয়েছে দুই হাজার ৪০৫টি কন্টেইনার।

চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার নিলামযোগ্য কন্টেইনার। যেহেতু কন্টেইনারগুলো নিলামে তোলা চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের এখতিয়ার, সেক্ষেত্রে এসব কন্টেইনার খালি করতে বন্দর কর্তৃপক্ষ অনেকটা নিরূপায়। যদিও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ থেকে নিলামযোগ্য কন্টেইনার সরিয়ে নিয়ে ইতোমধ্যে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় দুই শতাধিক কনসাইমেন্ট (চালান) নিলামে তুলতে টিম গঠন করে কাস্টম হাউজ।

এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানিকৃত এফসিএল (ফুল কন্টেইনার লোড) কন্টেইনার খালি করতে গত ৮ জুলাই বিজ্ঞপ্তি জারি করে। বন্দরের পরিবহন দপ্তর থেকে জারি হওয়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দৈনিক কন্টেইনার ডেলিভারির ক্ষেত্রে ধীরগতির কারণে বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেইনারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এফসিএল কন্টেইনারগুলো সরিয়ে নিতে আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ এজেন্টদের অনুরোধ জানায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। অন্যথায় ফ্রি টাইম পার হওয়ার পর (৪ দিন) স্বাভাবিক ভাড়ার ওপর বর্ধিত হারে রেন্ট আরোপ করা হবে। এই বিজ্ঞপ্তি জারির এক সপ্তাহ পার হলেও ডেলিভারি পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

একাধিক আমদানিকারক জানান, পণ্য খালাস করতে গিয়ে আমরা পদে পদে প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছি। বৃষ্টির ওপর যেহেতু কারো হাত নেই, সেখানে আমরা চেষ্টা করেও পণ্য খালাস নিতে পারছি না। কারণ অনেক ক্ষেত্রে বন্দর থেকে কন্টেইনার খুলে পণ্য অন্য গাড়িতে লোড করতে হয়। তাছাড়া পণ্য খালাসের আগে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের কিছু আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। সেগুলোও বৃষ্টির কারণে সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। তার ওপর গত এক সপ্তাহে দুই বার এনবিআরের অ্যাসাইকুডা সফটওয়্যার (কাস্টমসের নিজস্ব সফটওয়্যার) শাটডাউন থাকায় পণ্য খালাসে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতায় সৃষ্টি হয়। বন্দরে কন্টেইনার বেড়ে যাওয়ার কারণে প্রতিদিন মাশুল গুণতে হচ্ছে তাদের। এই অবস্থায় বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ছাড়া আর কোন উপায় নেই তাদের।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, বৃষ্টির কারণে পণ্য ডেলিভারি না হওয়ায় দিন দিন কন্টেইনারের সংখ্যা বাড়ছে। কন্টেইনার ছাড়া অন্য পণ্যগুলোর বেশির ভাগই বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে লাইটারেজ জাহাজে খালাস করে বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছানো হয়। বন্দর জেটিতে কন্টেইনার ওঠানামা স্বাভাবিক থাকলেও টানা বৃষ্টির কারণে এক সপ্তাহ ধরে বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে বৃষ্টিতে পণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় আমদানিকারকদের অনেকেই কন্টেইনার ডেলিভারি নিতে পারছে না। ফলে ইয়ার্ডে কন্টেইনার বেড়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে কন্টেইনার ডেলিভারিতে গতি আনার জন্য পেনাল রেন্ট আরোপের নোটিস দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে একসপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম জানান, বর্তমানে নিলামযোগ্য সাড়ে পাঁচ হাজার কন্টেইনার পড়ে আছে। নিলামের বিষয়টি যেহেতু চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের এখতিয়ার, সেজন্য এক্ষেত্রে বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছুই করার নেই। তাছাড়া আমদানিকৃত অন্য কন্টেইনারগুলো দ্রুত খালাস নেওয়ার জন্য আমদানিকারক এবং সিএন্ডএফ এজেন্টদের প্রতি আহবান জানান তিনি।

পণ্যবাহী লাইটারেজ জাহাজ পরিচালনাকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশিদ খান বলেন, গত শুক্রবার দুটি, শনিবার ৮টি ও রবিবার ১৬টি লাইটারেজ জাহাজ বহির্নোঙরে গেছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সেখানে স্ক্র্যাপ ছাড়া অন্য কোনো পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না।

চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, রবিবার চট্টগ্রাম বন্দর জেটি ও বহির্নোঙরে অবস্থানরত মোট জাহাজের সংখ্যা ছিল ১১৮টি।