Opu Hasnat

আজ ১৯ আগস্ট সোমবার ২০১৯,

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জনজীবন বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রামে জনজীবন বিপর্যস্ত

টানা এক সপ্তাহের বৃষ্টিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে গত রোববার (৭ জুলাই) থেকে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। ফলে প্রতিদিন নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলজট দেখা দিচ্ছে। নগরীর নিচু এলাকায় বাসাবাড়ি, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানির নিচে। রাস্তায় পানি জমে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যাত্রীরাসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অবর্ণনীয়। শুধু শহরে কেন, চট্টগ্রামের উত্তর ও দক্ষিণের উপজেলাগুলো থেকেও আসছে পানিবন্দী জনজীবনের সংবাদ। কোথাও বাঁধ ভেঙে পানির নিচে তালিয়ে গেছে গ্রামের পর গ্রাম, কোথাও বানের পানিতে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বর্হিনোঙরে মালামাল উঠা-নামা বন্ধ থাকায় শত শত জাহাজ আটকা পড়েছে। দেশের প্রধান ভোগ্যপণ্য পাইকারী বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে রাস্তাঘাট, অলিগলি, দোকান ও গুদামে পানি ঢুকে পড়ায় এবং দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ক্রেতাসাধারণ ও যানবাহন ঢুকতে না পারায় ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। মরার উপর খড়ার ঘা হয়ে আছে নগরীর বিস্তির্ণ এলাকাজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকগুলো পাহাড়, যেগুলোর পাদদেশে বসবাস করছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা শত শত ভাসমান পরিবার। টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসে এসব ঘর-বাড়ি বিলীন হওয়া, মানুষ মরা এই নগরীতে নতুন কিছু নয়। জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রতিবছর কিছু লোক দেখানো উচ্ছেদ কর্ম সম্পাদন করে থাকে বর্ষা আগমনের আগে। কিন্তু পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন নেই, যথাপূর্ব তথাপর। 

বৃহত্তর চট্টগ্রামের মানুষ আগে আষাঢ় মাস ঢোকার আগেই বৃষ্টির দেখা পেতো। এবার বর্ষা এসেছে দেরিতে। প্রচন্ড দাবদাহে দীর্ঘদিন ভুগেছে মানুষ। এবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে আষাঢ়ের শেষে দিকে। যেই শুরু, আর থামে না।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৬৫০০ মিলিমিটার দাঁড়িয়েছে। আরো ভারী বর্ষণের সতর্কতা জারি করেছে অধিদপ্তর। পাহাড় ধসের আশঙ্কার পাশাপাশি নগরী ও বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়িবাঁধের ভাঙনের মুখোমুখি রয়েছে অসংখ্য পরিবার। বঙ্গোপসার রয়েছে উত্তাল। এরই মধ্যে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ট্রলার ডুবিতে কক্সবাজার উপকূলে মারা গেছে ১১ জন জেলে। 

কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেছেন, ১১টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এরা সবাই মাছ ধরা ট্রলারের মাঝিমালা। তাদের মধ্যে সাত (৭) জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন ভোলার চরফ্যাশনের শামসুদ্দিন পাটোয়ারী (৪৫), ভোলার পূর্ব মাদ্রাজের মোহাম্মদ বাবুল (৩২), উত্তর মাদ্রাজের মোহাম্মদ মাসুদ (৪৫), একই এলাকার আজিজুল্লাহ ওরফে মনির (৩৮), অলিউল্লাহ (৫০), রসুলপুরের জাহাঙ্গীর বলি (৪০) ও পূর্ব মাদ্রাজের কামাল হোসেন (৩৫)। নিহত অপর চারজনের লাশ অনেকখানি বিকৃত হয়ে গেছে। চেনার উপায় নেই। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে এক লক্ষ টাকা সহায়তা দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। আর দাফনের জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় দিয়েছে ২৫ হাজার টাকা করে।

অতিবর্ষণে চট্টগ্রামের সাথে বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সড়ক যোগাযোগ দুইদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর শুক্রবার সড়ক যোগাযোগ পুন:চালু হয়েছে বলে জানা গেছে। সাতকানিয়ায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়েছে পৌরসভা এলাকায়। বন্যার পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ফটিকছড়ির নারায়ণহাট ও নাজিরহাটে পানিতে ডুবে দু’জন নিহত হয়েছে। পানি আটকে থেকে নগরীর বিমানবন্দর সড়ক তিনদিন অচল ছিল। রুবি সিমেন্ট ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ খাল দখল করে দেয়াল নির্মাণ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। গত ১১ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের বিশেষ উদ্যোগে এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে ঐ দেয়ালটি ভাঙার পর বিমানবন্দর সড়কে যানবাহন চলাচল কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

জলাবদ্ধতা নগরীর সবচেয়ে বড় সমস্যা যা বর্ষা মৌসুমে প্রকট আকার ধারণ করে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়। জলাবদ্ধতা থেকে নগরীকে মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগে ৫৬১৬ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন আছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) এ প্রকল্পের দায়িত্ব দেয়া হলেও প্রকল্প নেয়া হয়েছে চট্টগ্রামবাসীর অনেক কান্নাকাটির পর এবং সিডিএ প্রকল্পটির কাজ শুরু করেছে আরো এক বছর বিলম্বে। মাঠ পর্যায়ে প্রকল্পটির কাজ করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ। এর পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে ২৫৯৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ১২৫৬ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। দু’টি প্রকল্পই জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক-এ) অনুমোদিত হয়েছে। সিডিএ’র প্রকল্পটি ২০২০ সালের জুন মাসে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নির্ধারণ করা হলেও আগামী দু’বছরে তা সম্পন্ন হবে কিনা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত নয়। সিটি কর্পোরেশনের প্রকল্পটিও সম্পন্ন করার মেয়াদ রয়েছে ২০২০ সালের জুনে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পটি সম্পন্ন করার মেয়াদ রয়েছে ২০২১ সালের জুন মাসের মধ্যে। 

নগরবাসীর দুর্ভোগ লাঘব নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করা ফোরাম ফর প্ল্যানড চিটাগাং এর নেতা প্রকৌশলী সুভাষ বড়ূয়া বলেন, ১৯৬১ সালের সিডিএ মাস্টারপ্ল্যানে অনুরূপ একটি প্ল্যানের প্রস্তাব করা হয়েছিল কিন্তু এতদিন পরে এসে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে প্রকল্প হতে নিলেও নির্ধারিত সময়ে কোনভাবেই এগুলো সমাপ্ত করা সম্ভব নয়। আগামী অন্তত আরো তিনটা বর্ষা মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে কারণ এর মধ্যে একটি নতুন খাল খনন, ১৬টি খাল পুন:খনন ছাড়াও খালগুলোর রিটেইনিং ওয়াল, উভয় পাড়ে রাস্তা নির্মাণসহ অনেক কাজ করতে হবে।