Opu Hasnat

আজ ২২ নভেম্বর শুক্রবার ২০১৯,

পাহাড়ে ঝুঁকিতে থাকা ৩০ পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়েছে প্রশাসন

খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসে নিহত ১, আহত ৭ খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসে নিহত ১, আহত ৭

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় চারদিনের টানা বর্ষণে জনজীবনে দূর্ভোগ তৈরী হয়েছে। জেলার দীঘিনালা উপজেলায় পাহাড় ধসে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তার নাম যুগেন্দ্র চাকমা(৪০)। তিনি দীঘিনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের দুর্গম উল্টাছড়ি এলাকার সুবধন চাকমার ছেলে। মঙ্গলবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে। পাহাড় ধসের ঘটনায় চার পরিবারে ৭জন সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও নাম পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যায় ভারী বর্ষণে দীঘিনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের দুর্গম উল্টাছড়ি গ্রামের একটি পাহাড় চূড়ায় থাকা চারটি বাড়ি ধসে পড়ে। এসময় যুগেন্দ্র বাসায় ছিলেন। ঘরসহ ধসে পড়লে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। এতে ৭ জনের অধিক বেশ কয়েকজন আহত হলেও তাদের অবস্থা গুরুতর নয়। 

বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তোষ জীবন চাকমা ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাস্থল অনেক দুর্গম এলাকায় তাই তাৎক্ষণিক যাওয়া সম্ভব নয়। তবে পরিবারে ৭জন সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও নাম পাওয়া যায়নি।  

এছাড়া সকালে মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়িতে একটি পরিত্যক্ত দোকানের উপর পাহাড় ধসে পড়ে। তবে এতে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সোমবার (৮ জুলাই) সকালে শহরের মোহাম্মদপুর এলাকা আরসিসি সীমানা প্রাচীর ধসে পড়ে। মঙ্গলবার (৯ জুলাই) শালবাগান এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। টানা অতিবৃষ্টিতে মহালছড়ি উপজেলার সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস ও চোংড়াছড়ি এলাকায় সড়ক ডুবে যাওয়ায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙ্গামাটির সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। ভারী বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে খাগড়াছড়ির সাথে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে সোমবার দুপুর থেকে। সড়কের উপর পাহাড় ধসে পড়ায় খাগড়াছড়ির সঙ্গে রাঙামাটির লংগদু সড়ক যোগাযোগ একেবারেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। 

পানি সরে না যাওয়া পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হবে না বলে জানিয়েছেন দীঘিনালা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম।

এদিকে খাগড়াছড়ি জেলা শহর পাহাড়ের ঝুঁকিতে থাকা ৩০ পরিবারকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়েছে প্রশাসন। মঙ্গলবার বিকেলে খাগড়াছড়ি সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভা ও পুলিশের পক্ষ থেকে শালবন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়। চারদিন ধরে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় খাগড়াছড়ির চেঙ্গী ও মাইনী নদীর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে জেলা সদরের মুসলিমপাড়া, পেরাছড়া, গঞ্জপাড়া, গোলাবাড়িসহ বেশ কিছু গ্র্রাম প্লাবিত হয়ে পাচ শতাধিক পরিবার পানি বন্দী হয়ে পড়েছে।

খাগড়াছড়ি সদরে পানিবন্দী ও পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারদের জন্য ১২টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। তা ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দূর্যোগ মোকাবেলায় নয় উপজেলায় ৪৫টি আশ্রয় কেন্দ্র ও মনিটরিং সেল খোলা হয়েছে। বুধবার সকালে থেকে মাইনী নদীর পানি কিছুটা কমে গেলে রাঙ্গামাটির লংগদু উপজেলার সাথে দীঘিনালার সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক তেমন হয়নি। রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি আভ্যন্তরীণ সড়কের মহালছড়ি চব্বিশ মাইল এলাকায় সড়কের উপর জলাবদ্ধতা হয়ে দুই ঘন্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো: শহিদুল ইসলাম জানান, খাগড়াছড়ি সদরের পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা ৩০ পরিবারকে মঙ্গলবার বিকেলে বসতবাড়ি থেকে বের করে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৫ পরিবার শালবন এলাকায় খোলা হয়েছে জেলা প্রশাসনের আশ্রয় কেন্দ্রস্থল। এছাড়া পানিবন্দী পাচ শতাধিক পরিবার জেলা সদরের বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছে। পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের মাঝে ত্রাণ ও বিশুদ্ধ পানীয় বিতরণ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের ঘটনা ছাড়া জেলা সদরের শালবন এলাকায় পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পাহাড় ধসে ঝুঁকি এড়াতে ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, উপজেলা প্রশাসন পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সরে যেতে মাইকিং ও অভিযান চালাতে দেখা গেছে। প্রবল টানা বর্ষণে বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটলেও পৌর শহরের শালবাগানে পাহাড় ধসে বেশ কিছু বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। 

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, খাগড়াছড়ির ৯টি উপজেলায় পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে প্রায় ৮ শতাধিক পরিবার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের তালিকা করে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে হাজারের অধিক পরিবার। ভারী বর্ষণে পাহাড় ধস কিংবা বন্যার সম্ভাবনা থাকায় তাদের সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতেও প্রশাসনের চুড়ান্ত প্রস্তুতি রয়েছে। দূর্যোগ মোকাবেলায় ৯টি উপজেলার সবক’টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জরুরী প্রয়োজনে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে উদ্ধারকারী দল। আমরা আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত ও খাবার মজুদ রেখেছি। প্রত্যেক নিজ নিজ সরকারি বিভাগ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছি। ঝুঁকিতে বসবাসরতের সরে যেতে মাইকিংয়ের পাশাপাশি সরেজমিন গিয়ে বুঝিয়ে বলা হচ্ছে। এরপরও তারা না সরলে জানমালের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমরা বল প্রয়োগ বাধ্য করবো। 

অতি বৃষ্টিতে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি সভা করেছে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন। এছাড়া পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে  মাইকিং অব্যাহত রেখেছে প্রশাসন। জেলা শহরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসকসহ সামরিক-বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তারা।

খাগড়াছড়ি পৌর মেয়র মো: রফিকুল আলম জানান, এরই মধ্যে পৌর শহরে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিতে বসবাসরতদের নিরাপদে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে মাইকিং করছে পৌর প্রশাসন। প্রস্তুত রাখা হয়েছে আশ্রয় কেন্দ্র। অতিবৃষ্টিতে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সোমবার(০৮ জুলাই) বিকেলে জরুরি সভা ডেকেছেন জেলা প্রশাসন।

খাগড়াছড়ি জেলায় বিশেষ করে শহরের কলাবাগান, নেন্সিবাজার, মোল্লাপাড়া, কৈবল্যপিঠ, আঠার পরিবার, শালবন ও মোহাম্মদপুরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে সহস্রাধিক পরিবার। বিগত বছরগুলোতে পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

অপরদিকে, টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ি জেলার বিভিন্ন এলাকার জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। আর দুর্যোগের আশঙ্কায় পুরো জেলায় ৪৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলাসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। প্রবল বর্ষণে জেলার চেঙ্গি, মাইনি, ফেনী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার প্লাবিত দেখা দিয়েছে। তারমধ্যে শান্তিনগর, অপর্না চৌধুরী পাড়া, রাজ্যমনি পাড়া, গন্জ পাাড়া, কালাডেবা, বটতলী, গুগড়াছড়ি, বাসটার্মিনাল, কলেজ পাড়া, খবংপুড়িয়া, শব্দমিয়া পাড়া বন্যা কবলিত হয়েছে।  এরই মধ্যে নিচু ও কিছু উচু এলাকায় প্লাবিত হওয়ায় খাগড়াছড়ি সদরের ১৫০ থেকে ২০০টি পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন।

মংগলবার সকালে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা(ইউএনও) শামছুন্নাহার, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) মো: রশিদ, পৌরসভার প্যানেল মেয়র মো: জাফর আহম্মেদসহ প্রশাসনের সম্মিলিত একটি টিম শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এসময় তারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসরতদের আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানান। ঝুঁকিতে বসবাসরত ৩০টি পরিবারকে বিকেলের মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দেন তারা।

উল্লেখ্য, গত বুহস্পতিবার আংশিক বৃষ্টি শুরু হলেও পুরোদমে মংগলবার থেকে চারদিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় খাগড়াছড়ির শহরতলী ও ৯াট উপজেলায় পাহাড় ধসের ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। চারদিনে খাগড়াছড়িতে প্রায় ১৭২ দশমিক ৬ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বর্ষণে গত চার’দিনে বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। শহরের কলাবাগান, নেন্সিবাজার, মোল্লাপাড়া, কৈবল্যপিঠ, আঠার পরিবার, শালবন ও মোহাম্মদপুরসহ জেলার বিভিন্ন  এলাকায় পাহাড়ের ঢালে ঝুঁকি নিয়ে বাস করছে সহস্রাধিক পরিবার। বিগত বছরগুলোতে পাহাড় ধসে কারনে হতাহতসহ প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।