Opu Hasnat

আজ ১৭ জুলাই বুধবার ২০১৯,

পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীদের সরিয়ে নিচ্ছে জেলা প্রশাসন

চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতায় মানুষের দুর্ভোগ চরমে

টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন স্থানে পানি জমে তলিয়ে গেছে বিভিন্ন এলাকা। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ভেঙে পড়েছে গাছপালাও। এতে চট্টগ্রাম নগরীতে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। 

সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় ১৩৬ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চট্টগ্রামে। প্রবল বৃষ্টিতে ধসের আশঙ্কায়  নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোতে অবৈধ বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ে। প্রবল বৃষ্টিতে ধসের আশঙ্কায়  নগরীর পাহাড়গুলোতে  অবৈধভাবে বসবাসকারী মানুষজনকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ে।

চট্টগ্রামে গত শনিবার গভীর রাতে শুরু হয়েছে টানা বৃষ্টি। গত তিন দিনে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস মোট ২৮৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। অধিকাংশ এলাকা ছিল পানির নিচে। কোথাও হাঁটু পানি, আবার কোথাও কোমর পানি। বুক সমান পানিও ছিল কোন কোন এলাকায়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। টানা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণে নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নগরবাসী সার্বিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। টানা বৃষ্টিতে যেসব এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে, তার মধ্যে রয়েছে বহদ্দারহাট, ২ নাম্বার গেট, মুরাদপুর, চকবাজার, অক্সিজেন, সল্টগোলা, কমার্স কলেজ এলাকা, প্রবর্তক মোড়, খুলশি বিজিএমইএ রোড, পাঁচলাইশ রোড, রিয়াজুদ্দিন বাজার, তিন পুলের মাথা, শোলকবহর, বাদুরতলা, ডিসি রোড, মেহেদীবাগ, আগ্রাবাদ, রাহাত্তারপুল, খাতুনগঞ্জ, রহমতগঞ্জ, হালিশহর ও নয়াবাজার।

এদিকে, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর যেসব সড়কে রাস্তায় যানচলাচল বিঘিœত হচ্ছে তার একটি তালিকা প্রকাশ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। সে তালিকার মধ্যে রয়েছে কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দার হাট মোড়, মুরাদপুর মোড়, শোলক বহর এলাকা, দুই নাম্বার গেইট এলাকা, অক্সিজেন মোড়, বাদশা মিঞা, পেট্রোল পাম্প, জিইসি মোড় থেকে খুলশী, শিল্পকলা এলাকায় মোহাম্মদ আলী রোড, ওয়ারলেস গেইট মুরগি ফার্ম, প্রবর্তক মোড়, চকবাজার গুলজার মোড়, বাদুরতলা জঙ্গি শাহ মাজার মোড়, ডিসি রোড, ওয়াসা মোড়, নিউ মার্কেট থেকে আমতল, নিউ মার্কেট থেকে বিআরটিসি মোড়, জামাল খান মোড়, চৌমুহনী থেকে কদমতলী মোড় , আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড়, থেকে এক্সেস রোড, সদরঘাট মোড়, সল্টগোলা ক্রসিং, ইপিজেড থেকে বন্দরটিলা, মনসুরাবাদ পুলিশ লাইন এলাকা।

নগরীর প্রায় সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ ছিল। নগরবাসীর ভরসা এখন রিকশা, অটোরিকশা, ভ্যান ও টেম্পো। বিভিন্ন সড়কে পানি জমে অফিসগামী যাত্রীদের নাকাল হতে হয়েছে দিনের শুরুতেই। মুরাদপুর থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত আক্তারুজ্জামান ফ্লাইওভারেও হাঁটু পানি জমে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও বাসাবাড়ি, বাজার সব জায়গায় এখন হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি। এই বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী আর জীবিকার তাগিদে পথে নামা মানুষকে যানবাহন না পেয়ে কষ্টে ভুগতে হচ্ছে। কোনো গাড়িতে উঠতে পারলেও যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে দীর্ঘ সময়। আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ায় রোগী ও স্বজনরা পড়েছেন ভোগান্তিতে। সকালে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীর জামালখানে হেমসেন লেইন ১ নং গলির গ্রিনহিল নামের একটি বহুতল ভবনের সীমানা প্রাচীর ধসে পড়ে। এতে অর্ধশতাধিক পরিবারের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পরে সিটি কর্পোরেশেনের উদ্যোগে মানুষের চলাচলের পথ পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। 

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা প্রদীপ কান্তি রায় বলেন, পুরো দেশের ওপর মৌসুমি বায়ু প্রবলভাবে সক্রিয়। এ কারণে ভারি বর্ষণ হচ্ছে। সোমবার এবং মঙ্গলবার ভারি বৃষ্টি হতে পারে। ভারি বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের কোনো কোনো পাহাড়ি এলাকায় ভ‚মি ধ্বসের আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন জানিয়েছেন, জলবাবদ্ধতা কমাতে সেনাবাহিনীর পাঁচটি রেসপন্স টিম মাঠে কাজ করছে। প্রবর্তক মোড়, দুই নম্বর গেটসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে বেশি পানি সেখানে এর কারণ বের করে তা সমাধানে তারা কাজ করছেন। একটি কনসালটেন্ট টিম সোমবার সন্ধ্যার মধ্যে প্রতিবেদন দেবে বেশি জলাবদ্ধ এলাকাগুলোর পানি জমার কারণ চিহ্নিত করে। এদিকে ভারি বর্ষণ ও জলাবদ্ধতার কারণে নোয়া খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সিডিএর অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছে।

ভারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজে (ছোট আকারের জাহাজ) পণ্য খালাস বন্ধ আছে বলে জানান বন্দরের  পরিচালক  (প্রশাসন) মোঃ মমিনুর রশিদ। বৃষ্টি বেশি হলে বর্হিনোঙরে পণ্য খালাস সম্ভব হয় না। তাই কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনিভারি বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজে (ছোট আকারের জাহাজ) পণ্য খালাস বন্ধ আছে বলে জানান বন্দরের  পরিচালক  (প্রশাসন) মোঃ মমিনুর রশিদ । বৃষ্টি বেশি হলে বর্হিনোঙরে পণ্য খালাস সম্ভব হয় না। তাই কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল নগরীর রেডিসন বøুতে সেনাবাহিনীর সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। ঐ মাসেই প্রত্যাশিত এ প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। চট্টগ্রাম নগরবাসীকে রক্ষায় গৃহীত এ মেগা প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে ২০১৮ সালে ৩৬ খালের মাটি অপসারণসহ ৩০০ কিলোমিটার নতুন ড্রেন নির্মাণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এর দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কোর। তারা খালের দুপাশে রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, রাস্তা নির্মাণ ও নিচু ব্রিজগুলো ভেঙে উঁচু করার কাজ শুরু করে। এছাড়া নতুন করে ১০০ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ, ২০২০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম নগরে ৩৬টি খাল, খালের পাশে ১৭৬ কিলোমিটার প্রতিরোধক দেয়াল, ৮৫ কিলোমিটার সড়ক, ৪২টি বালির ফাঁদসহ (সিল্ট ট্র্যাপ) নানা অবকাঠামো নির্মাণ করার কথা জানায় ওই সময়। কিন্তু এ পর্যন্ত সেনাবাহিনী যা কাজ করেছে তা হলো গত বছর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ২৪টি ওয়ার্ডের ৪৭টি ড্রেন থেকে ১ কোটি ২৫ লাখ ৮৮ হাজার ২৪ সিএফটি বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে। চলতি বছর ১৪টি ওয়ার্ডে বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে ৪১ লাখ ৮ হাজার ৬০৫ সিএফটি। চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ৫৫টি খালের মধ্য দিয়ে জোয়ারের পানি চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। যতক্ষণ পর্যন্ত এটি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না ততক্ষণ চট্টগ্রাম শহর জলাবদ্ধতামুক্ত হবে না বলেও জানান সেনাবাহিনীর প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

অপরদিকে, চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়গুলোর পৃষ্ঠ ও পাদদেশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় অবৈধ বসবাসকারীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে। পাহাড় থেকে ৩৬১টি পরিবারকে সরিয়ে জেলা প্রশাসনের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। অন্যদের সরানোর কাজ চলছে। অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ও ভূমিধস জনিত সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবেলায় মেডিকেল টিম গঠন ও কন্ট্রোল রুম চালু করেছে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। যে কোন প্রয়োজনে ৬৩৪৮৪৩ নম্বরে যোগাযোগের জন্য বলা হয়েছে।

ইতিমধ্যে পাহাড়ের পৃষ্ঠ ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অবৈধ বসবাসকারীদের নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার জন্য মহানগরী এলাকায় মোট আটটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবং সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) সমন্বয়ে এ আশ্রয়কেন্দ্র কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত শুকনা খাবার ও পানির মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন বলেন, পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে সরিয়ে আনতে কাজ করছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে অনেকেই নিজ উদ্যোগে সরে গেছে। আজকের (সোমবার) ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে সরিয়ে আনতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টাা চালিয়ে যাচ্ছি যদি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে যাতে একজন মানুষেরও প্রাণহানি না ঘটে।