Opu Hasnat

আজ ১৯ আগস্ট সোমবার ২০১৯,

রাজবাড়ীতে ধান চাষে মলিন কৃষকের মুখ কৃষি সংবাদরাজবাড়ী

রাজবাড়ীতে ধান চাষে মলিন কৃষকের মুখ

রাজবাড়ীতে দিন দিন কমছে ধান চাষ। বিগত বছরের তুলনায় এবছর রাজবাড়ীতে ৩৯০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ কম করা হলেও ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদন হয়েছে  ৮৩ হাজার মেট্টিক টন। এতো বিপুল পরিমান ধান উৎপাদন করার পরও নেই কৃষকের মুখে হাঁসি। তবে সরকারী ভাবে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ঘোষনায় মুখে হাঁসি ফুটলেও সে হাঁসি মূহুর্তের মধ্যেই ন হয়ে গেছে ম্লান তাদের। কারণ উৎপাদনের তুলনায় সরকারী ভাবে ক্রয় করা হবে সামান্য পরিমান ধান। 

রাজবাড়ীতে সরকারীভাবে কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় শুরু হয়েছে। রবিবার সকালে রাজবাড়ীর খাদ্য গুদামে ধান ক্রয় কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী। 

এ সময় রাজবাড়ীর ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোঃ আলমগীর হোসেন, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুন্সি মজিবুর রহমান, রাজবাড়ীর খাদ্য সরবরাহের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল কালাম, উপস্থিত ছিলেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজবাড়ী জেলায় ধান চাষের সাথে ৬০ হাজারেরও বেশি কৃষক জড়িত রয়েছে। এবছর ১৩ হাজার ৮শত ১০ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। বিগত বছর আবাদ হয়েছিল ১৪ হাজার ২ শত হেক্টর জমি। যা বিগত বছরের তুলনায় ৩৯০ হেক্টর কম। তবে এবার ধান উৎপাদন হয়েছে ৮৩ হাজার মেট্টিক টন।

জানাগেছে, চলতি মৌসুমে রাজবাড়ী জেলার পাঁচটি উপজেলায় ধানের ব্যাপক আবাদ হয়েছে। ফলনও হয়েছে ভালো। তবে ধানের বাজার দর অন্যান্য বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। আর দিন মজুরের প্রতিদিনের মজুরি অন্য সময়ের চাইতে প্রায় দ্বিগুন। যেখানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হত ৮ শত টাকা থেকে হাজার টাকার কাছাকাছি। বর্তমানে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে চার শত টাকা থেকে ৫ শত টাকায়। এক মণ ধান বিক্রি করে একজন দিন মুজুরের টাকাও হচ্ছেনা কৃষকদের। বিঘা প্রতি ১৫ মণ থেকে ২০ মণ ধান হলেও এই ধান বিক্রি করে, চাষাবাদ, ঔষধ, কীটনাশক, সার, বীজ, দিন মজুরসহ যা খরচ হচ্ছে, ধান বিক্রি করে সেই টাকা ঘরে আনতে পারছেনা কৃষকেরা। বিঘা প্রতি জমিতে ধানের আবাদ করে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।  

রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর এলাকার কৃষক হাচেন আলী জানান, প্রতি বিঘা জমিতে ধান চাষ, সার, কীটনাশক, ঔষধ ও দিন মুজুরি সহ খরচ হয় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। কিন্তু ধান কাটতে দিন মজুরির খরচ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। যে কারনে এবার বিঘাপ্রতি কৃষকদের খরচ পরছে ১৫ হাজার টাকার বেশি। ভালো ফলন হলে বিঘা প্রতি ধান পাচ্ছেন ২০ থেকে ২২ মনের মধ্যে। বাজার দর কম থাকায় প্রতি বিঘা জমির ধান বিক্রি করতে পারছেন ১০ থেকে ১১ হাজার টাকায়। এতে করে আবাদ ও উৎপাদন মিলিয়ে ধান চাষ করে লোকসান হচ্ছে তাদের।

দাদশী ইউনিয়নের কৃষক খৈয়ম জানান, ফলন ভালো হলে কি হবে। এক মণ ধান উৎপাদন করতে খরচ হচ্ছে ৮ শত থেকে ৯ শত টাকা কিন্তু ধানের বাজার দর পাচ্ছেন ৫ শত টাকা। তাই খরচের চাইতে বিক্রি করতে হচ্ছে অর্ধেক দামে। যে কারনে আগামী ধান চাষ আরো কমে যাবে এই এলাকা থেকে। 

আব্দুল হালিম বাবু নামে অপর এক কৃষক বলেন,  আমাদের কাছ থেকে সরকার সরাসরি ধান ক্রয় করেনা। ক্রয় করেন মধ্যস্বঃত্ব ভোগী ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। আমাদের কাছ থেকে সরাসরি সরকার ধান ক্রয় করলে আমরা কিছুটা হলেও লাভবান হতাম। এবার ধান আবাদ করে অনেক কৃষক ঋণগ্রস্থ হয়ে পরেছে। অনেক কৃষক বাজারে ধান নিয়ে বিক্রি করতে না পেরে ফেরত নিয়ে আসছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবী ধানের বাজার দর বৃদ্ধি করে আমাদের সহযোগিতা করা হোক।

রাজবাড়ী জেলা খাদ্য কর্মকর্তা মুনশী মজিবুর রহমান জানান, দেশে ধান উৎপাদনের  দশমিক ৫ শতাংশ ধান সরকারী ভাবে ক্রয় করা হবে। রাজবাড়ীতে এ বছর ৮৩ হাজার মেট্টিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে সরকারী ভাবে ৪০০ টন ধান ক্রয় করা হবে। সরকারীভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে রাজবাড়ী সদর উপজেলায় ১৯১ টন, পাংশা উপজেলায় ৪৯ টন, কালুখালী উপজেলায় ৫৬ টন, বালিয়াকান্দি উপজেলায় ২৪ টন ও গোয়ালন্দ উপজেলা থেকে ৮০ টন ধান ক্রয় করা হবে। এই ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করা হবে। 

রাজবাড়ীর ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোঃ আলমগীর হোসেন জানান, ধানের বাজার দর কম থাকায় কৃষকেরা সোচ্চার হয়েছেন। ইতোমধ্যে সরকার কৃষকের উৎপাদন খরচ মাথায় রেখে ১ হাজার ৪০ টাকা মণ দরে ধান কেনার ঘোষনা দিয়েছে। এতে কৃষক লাভবান হবে। ধান ক্রয়ে কোন মধ্যস্বত্ব ভোগী যেন কৃষকের হক হরন করতে না পারে সে বিষয়ে জেলা প্রশাসন বদ্ধ পরিকর। ধান ক্রয়ের সময় জেলা প্রশাসনের ম্যাজিষ্ট্রেট, উপজেলা প্রশাসন, কৃষি অফিসার, ফুড অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন। ধান ক্রয়ে কোন ধরনের ব্যপ্তয় ঘটলে প্রশাসনিক কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী বলেন, সারাদেশে ধানের ন্যয্য মূল্যেে জন্য কৃষতেরা আন্দোলন করছে। সরকার কোন ফরিয়া বা মিল মালিক নয় ? এবার  সরাসরি কৃষকের থেকে ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারী সিদ্ধান্ত মোতাবেক এ জেলার পাচটি উপজেলা থেকে মাত্র ৪ শত মেট্টিকটন ধান ক্রয় করা হবে যা উৎপাদনের তুলনায় একেবারেই নগন্য। আমরা উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে দাবী জানিয়েছে যাতে আর কিছু পরিমান বাড়ানো হয়। আর এই ধান ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারের সকল নিয়ম মেনেই ক্রয় করা হবে।