Opu Hasnat

আজ ২৪ মে শুক্রবার ২০১৯,

‘রসপুরাণ’ দর্শকের পরান জুড়ায় : জাহিদ আজিম বিনোদন

‘রসপুরাণ’ দর্শকের পরান জুড়ায় : জাহিদ আজিম

যদি কোনো সাধারণ দর্শককেও প্রশ্ন করা হয়, আপনি কেন নাট্যপ্রদর্শনী দেখেন? তাহলে তাঁর গড়পরতা উত্তর হবে, ভালো লাগে তাই। তাকে যদি আবারও প্রশ্ন করা হয়, কেন ভালো লাগে? তবে উত্তর হতে পারে নাটক দেখলে মনের ভেতরে দারুণ অনুভূতি-অনুরণন তৈরি করে তাই। আর এই দর্শকহৃদয়ের অনুভূতি-অনুরণনকে নাট্যতত্ত্বে ভাব-রস নামে ব্যাখ্যা করা হয়। যা পাঠক-কুশিলবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সহজ করে বলতে গেলে ‘ভাব’ হচ্ছে মনের প্রাথমিক অবস্থা আর ‘রস’ হচ্ছে ভাব মন্থনের ফলাফল যা দর্শক আস্বাদন করে। বলা বাঞ্চনীয় এ ভাব-রস শুধু নাট্যশিল্প নয় প্রতিটি শিল্পকর্ম তথা যাপিত জীবনের সাথে জড়িত। যা শিল্পকর্ম বা নিত্যকর্মের প্রতিক্ষণেই আমাদের অন্তরকে আবৃত করে রাখে।

এই তত্ত্বের প্রাচীন দালিলিক প্রামাণ পাওয়া যায়, ভরত মুনি রচিত নাট্যশাস্ত্রে। যেখানে শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস ও অদ্ভূত নামক অষ্ট রসের কথা তিনি বলেছেন। আর এ প্রতিটি রসের স্থায়ী ভাব রয়েছে যথা- রতি, হাস, শোক, ক্রোধ, উৎসাহ, ভয়, জুগুপ্সা ও বিস্ময়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন এই ভাব-রস নিয়ে আলোচনা? কারণ ২৫ এপ্রিল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ এই ‘রস’ নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী নাটক মঞ্চে এনেছে। যার নাম ‘রসপুরাণ’। আর নাট্যসৃজনে মূখ্য ভূমিকা রেখেছেন বিভাগীয় চেয়ারম্যান ড. আহমেদুল কবির। তিনি নাট্যভাবনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনার কাজগুলো করেছেন।

তাঁর নিকট এই নাটক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন যাবৎ নাট্যভাবনাটি মনের মধ্যে লালন করছিলাম, কেননা ইউরোপীয় নাট্যাঙ্গিক প্রধানত দ্বন্দ্বনির্ভর আর আমাদের ভারতীয় তথা দেশজ নাট্যাঙ্গিক মূলত রসভিত্তিক। যদিও রসভিত্তিক নাটক মঞ্চায়িত হয়, যেগুলোর একটি প্রধান রস থাকে। তবে আটটি রসকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে কোনো নাটক এখনও ঢাকার মঞ্চে হয়নি। তাই এ নাটকে আটটি রসকেই সমান গুরুত্ব দেয়ার চেষ্টা করেছি। অন্যদিকে নাটকে নাট্যঘটনা মূখ্য নয় এখানে নাট্যরসগুলোকেই মূখ্য ভূমিকায় রাখা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘তাছাড়া ইউরোপীয় দ্বন্দ্বনির্ভর নাটক থেকে কিছুটা নির্ভার হওয়ার চেষ্টাও ছিলো, এমনকি প্রথাগত কাঠামোর বেড়া ভাঙার প্রবণতাও রেখেছি।’ অর্থাৎ নাটকটি নাট্যপ্রথাবিরোধী এক নতুন শিল্পপেয়ালা যাতে অষ্ট রস ভরা রসাধার, যার নাম ‘রসপুরাণ’। এখন দেখা যাক নাটকটির কাঠামা ও প্রদর্শনকৌশল কিভাবে আঁকা হয়েছে। নাটকটিকে বলা হয়েছে, রামায়ন, মহাভারত ও বিভিন্ন ধ্রুপদীনাট্যের নির্বাচিত দৃশ্যের সংশ্লেষ। অর্থাৎ নাটকে রামায়ন, মহাভারত ও কিছু ধ্রুপদী নাটকের দৃশ্য বেছে নেয়া হয়েছে ‘রস’ প্রধান পরিবেশনার জন্য। নাটকে আটটি অণুঘটনায় আটটি রসকে অঙ্গী বা প্রধান রস হিসেবে সন্নিবেশ করা হয়েছে। সংক্ষেপে বললে, অভিমন্যুবধ-করুণ রস, দুঃশাষনবধ-বিভৎস রস, স্বর্গারোহন-অদ্ভূত রস, শিবের তান্ডব রৌদ্র রস, মৃচ্ছকটিক নাট্যাংশ-হাস্য রস, রাবণের সীতাহরণ-ভয়ংকর রস, মেঘনাধবধ-বীর রস ও মুনিপুরী রাসনৃত্যে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলায়-শৃঙ্গার রসের প্রয়োগের প্রয়াস করেছেন নির্দেশক। যদিও আটটি রসফুলে নাট্যমালাটি গাঁথা হয়েছে কিন্তু বীর রস নামক ফুলটির প্রাধান্যই বেশি চোখে পড়ে। এমনকি দর্শক বীর রসের রোশনাইতেই বেশি ভিজেছে। তবে নাটকে দুটি অংশ মৃচ্ছকটিক নাট্যাংশে হাস্য রস ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলায় শৃঙ্গার রসের উপস্থিতি দর্শক হৃদয়ে দোলা দিয়েছে বেশি, এই দুটি দৃশ্যকে নাটকের হৃদপিন্ড বলা যেতে পারে । যেহেতু বীর, করুণ, রৌদ্র, ভয়ানক, বীভৎস ও অদ্ভূত রসের পার্থক্য করা সাধারণ দর্শকের নিকট দূরোহ। এবং রসগুলোর ভাবও খুব কাছাকাছি যা একে অপরকে শ্রাবিত করে। অন্যদিকে শৃঙ্গার ও হাস্য রসে রয়েছে বিস্তর ফারাক ও যাপিত জীবনে মানুষ এ দুটিকে প্রত্যাশা করে। তাই এ দুটি রসের উপস্থিতি দর্শককে বেশি রসাসিক্ত করে। শুধু রসের উপস্থিতে এমনটি হয়েছে তা নয়, এ দুটি দৃশ্যের অভিনয়ও অন্যদৃশ্যের তুলনায় বেশি সজীব-প্রাণবন্ত-স্নিগ্ধকর ও সাবলীল। কেননা কুশিলবগণকে অন্য ছয়টি ভাব-রসে দেহায়তনে যে পৌনঃপুনিক জোর দিতে হয়েছে তাতে কিছুটা হলে ঝিমিয়ে পড়ে কিন্তু হাস্য ও শৃঙ্গারে একঘেয়েমী কাটিয়ে তাদের দেহমানসের পূর্ণপ্রয়োগযোগ হয়েছে। তাতে তাদের যেমন ক্রিয়া ছিলো চমৎকার তেমনি দর্শকও প্রতিক্রিয়া করে উত্তমাকার। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে নাটকের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সবেমাত্র দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সেমিস্টারে অর্থাৎ নাট্যপাঠে তাদের সাধনা মোটে এক বছর চার-পাঁচ মাস। অথচ তাদের এমন পরিবেশনা সত্যি বিস্ময়কর-অদ্ভূত! যা ঢাকার মঞ্চে বিরল উদাহরণ! নাটকে বাহবা দিতে হয় দেহবিন্যাস ও চলনের জন্য অমিত চৌধুরীকে, কেননা আঙ্গিকাভিনয়ে তাঁর দেহবিন্যাস ও চলন সহজ ও নিপুন হওয়ায় দারুণ চলচ্ছবি তৈরি করে। আছে মুখোশের মনোহরী প্রয়োগ। এতে দর্শক নাটকে গল্প খুঁজতে যায় না। নির্দেশক যেভাবে রসগুলোকে পর পর সাজিয়েছে, তাতেই দর্শক নাটকের শেষমেশ এসে শৃঙ্গার রসে স্নান করে মিলনায়তন থেকে বের হয়ে বলতে পারে, বাহ্ ভালো লাগলো। এছাড়া নাটকে মনিপুরী রাসনৃত্যের প্রয়োগও ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এতে নাটকে প্রাচীনধ্রুপদীর সাথে লোকধ্রুপদীর অসাধারণ সংশ্লেষও বটে। এমনকি এ দৃশ্যের পোশাক পরিকল্পনা প্রয়োগ দর্শকদের প্রাণিত করে। তবে পোশাকে কালো রঙাধিক্য হওয়ায় কিছুটা হলেও নাটক মিয়োমান করেছে। কেননা এদেশে কালোকে মূলত শোকের রঙ ধরা হয়। মানসিক ভাবে আমরা কালোক দুঃখের প্রতীক মনে করি। শোকদৃশ্য বা করুণ রসে রঙটি ভালো লাগলেও যত্রতত্র কালোর ছড়াছড়ি, পোশাক কালো তার উপর মঞ্চ কালো, পর্দা কালো যেন কালোর সমুদ্রে অবগাহন করা। এত কালোর কারণে কিছু দৃশ্যে ভালো অভিনয়, ভালো আলোক, ভালো দেহবিন্যাস সত্ত্বেও মাঝে মাঝে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চোখে পড়ে না। সুতরাং মূল রঙটি পুনরায় ভাবা যেতে পারে। তবে মৃচ্ছকটিক নাট্যাংশ-হাস্য রসের দৃশ্য ও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলায় শৃঙ্গার রসের দৃশ্য বা শেষ দৃশ্যে কালোকে ছাপিয়ে অন্য রঙ আসায় মনে হয় অমাবস্যা শেষে পূর্ণিমার জোছনায় স্নান। যাতে নাটকটি গন্তব্যের ঘাটে ভিড়ে যায়। ভালো-মন্দের যোগ-বিয়োগে বলা যায়, পোশাক ও মঞ্চের কালো রঙ ছাপিয়ে কুশিলবদের অভিনয়, চলনবিন্যাস, আবহসংগীত, মুখোশে ভর দিয়ে নির্দেশক জয় করে নিতে পেরেছেন শেষমেশ দর্শকের হৃদয়। যেহেতু নাট্যভাবনাটিতে আছে চমৎকারিত্ব আর প্রদর্শনী চলবে ৪ মে পর্যন্ত। সুতরাং নিশ্চয়ই সামনের দিনগুলোতে প্রদর্শনী আরো অনন্য-অসাধারণ হবে এমনই প্রত্যাশা দর্শকদের। শেষে বাউলগানের বাণী ধার করে বলা যায়, ‘ভাব আছে যার গায়, দেখলে তারে চেনা যায়,’ তেমনি এ নাটকেও ভাব আছে, রস আছে, ভাব-রসের প্রয়োগ আছে, যা দর্শক দেখেই বুঝতে পারছেন, চিনতে পারছেন, তাই প্রতিটি প্রদর্শনী হচ্ছে দর্শকহৃদয়ের সঞ্জিবনী। এ জন্যই ড. আহমেদুল কবিরের নাট্যভাবনা, পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ‘রসপুরাণ’ দর্শকের পরান জুড়ায়।

জাহিদ আজিম
নাট্যকর্মী ও লেখক