Opu Hasnat

আজ ২৪ মে শুক্রবার ২০১৯,

হাওরে বোরো ধান কাটার ধুম, ব্যস্ত সময় পাড় করছেন কৃষাণ-কৃষানীরা কৃষি সংবাদসুনামগঞ্জ

হাওরে বোরো ধান কাটার ধুম, ব্যস্ত সময় পাড় করছেন কৃষাণ-কৃষানীরা

সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, জগন্নাথপুর, সদর, বিশ্বম্ভরপুর সহ সব ক’টি উপজেলার হাওর পাড়ের গ্রামে-গ্রামে এখন পুরোদমে চলছে বোরো ধান কাটার ধুম ।  ফলে ব্যস্ত সময় পাড় করছেন হাওরপাড়ের কৃষক ও কৃষানীরা। পাকা ধানের মৌ-মৌ গন্ধে মাতোয়ারা হাওরের ফসলী মাঠ। ফসল কাটার আনন্দ কে ভাগ করে নিতে নিভৃত পল্লী গুলো এখন লোক সমাগমে সরব হয়ে উঠেছে। গ্রমের লোকজন যে যেখানেই থাকেন বৈশাখে নিজ গ্রামে চলে আসেন ধান কাটতে। শহর থেকে বেড়িয়ে হাওরের পথে পথে যে দিকে চোখ যায় বাতাসে সোনালী ধানের ঢেউয়ের দোলা দেখে মন ভরে যায়। বৈশাখের তপ্ত রোদে গ্রামে আসা লোকজন কেউ বসে নেই, নারী-পুরুষ সবাই মিলে-মিশে মনের আনন্দে ধান তোলার কাজে ভীষন ব্যাস্ত সময় পার করছেন। এ যেন চির চেনা লাল-সবুজের বাংলাদেশে নতুন মিলন মেলা। 

কয়েক দিন হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, কৃষক আর কৃষাণীরা আনন্দ-বেদনায় দিন কটাচ্ছেন হাওরেই। আবার রাত হলে কৃষাণীরা চলে যান বাড়ীতে, কৃষকরা থাকেন ধানের সাথে খলায় (ধান শুকানোর জায়গা)। বছরে একটি মাত্র বোরো ফসলকে ঘিরেই হাওরাঞ্চলের মানুষের যতস্বপ্ন। তাই প্রচন্ড রোদে পুড়ে আর ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজেও ধান গোলায় তুলতে তাদের মনে আনন্দের যেন শেষ নেই। বহু প্রত্যাশীত সোনালী ফসল ঘরে তুলতে কৃষকদের সাথে কাজ করছে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা। এ উৎসব থেকে পিছিয়ে থাকেননী ঘরের নব-বধুরাও। হাওর পাড়ের মানুষের এই কষ্টই সারা বছরের অনাবিল সুখ-শান্তি আর আনন্দের। হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলী মাঠে ঘেরা গ্রাম গুলোতে না এলে এ আনন্দ বুঝা খুবই কঠিন। জেলার ছোট-বড় ১৫৪ টি হাওরে ২ লাখ ২৪ হাজার ৭১৯ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৯২ মেট্রিক টন ধান। টাকার অংকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা’। কৃষকরা জানান, বেশী ফলনের আশায় চলতি বোরো মৌসুমে তারা উচ্ছ ফলনশীল বীজের চারা রোপন করেছিলেন। এর মধ্যে বিআর-২৮, ২৯ ও বিআর-৪৫ ধানের খরাজনিত কারনে কিছুটা চিটা দেখা দিয়েছে। তবে বিআর-২৮ ধানে চিটার পরিমান বেশী হয়েছে। বোরো উৎপাদনের কেন্দ্রস্থল সুনামগঞ্জ হাওয়র গুলোর ধান সঠিক ভাবে গোলায় আসলে এলাকার চাহিদা মিটিয়েও লাখ-লাখ মণ ধান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। 

চলতি বোরো মৌসুমে প্রতি বছরের মতো এবারো দেশের উত্তরাঞ্চল সহ বিভিন্ন জেলা থেকে ধান কাটার শ্রমিক এসেছেন সুনামগঞ্জ অঞ্চলে। ময়মনসিংহ থেকে আসা ধান কাটার শ্রমিক সর্দার ঠান্ডু মিয়া (ঠান্ডু বেপারী) জানান, তার নেতৃত্বে প্রতি বছরের মতো ৩২ জনের একটি দল ৫ দিন পূর্বেই এসেছেন পাকনা হাওরের আসেন। মাস খানেক এখানেই থেকে ধান কাটবেন তারা। প্রতি দিন জন প্রতি ৩০ কেজি ধান আয় করতে পারবেন তারা। শ্রমিকদের বিভিন্ন উপদলে ভাগ করে কয়েকজন গৃহস্তর জমির ধান কাটছেন তারা।

পাকনা হাওরের বাসিন্দা ফেনারবাঁক গ্রামের বজলুর রহমান চৌধুরী বলেন, বৈশাখ মাসে রাইত-দিন সমান কাজ না করলে সারা বছর খাইয়াম খিতা। মনে চায় এক সাথেই সব ধান খাইটা মাড়াই দিয়া গুলায় ভরি। কিন্তু এবার বিআর-২৮ ধানে চিটা হইছে বেশী। লক্ষিপুর গ্রামের ময়না মিয়া বলেন, ধান কাটা-মাড়াই, শুকানী এই সময় বালাই লাগে, তবে হাওরের বেড়ীবাঁধ নিয়ে তিনি খুব শংকিত রয়েছেন বলেও জানান। গজারিয়া গ্রামের নুরুন্নেছা বিবি বলেন, বৈশাখ মাসে সারা দিন খাম করলেও কষ্ট লাগেনা। বেপারীসহ (ধান কাটার শ্রমিক) কত জনের রান্দা করি, ধান হুহাই (শুকাই), ধান (চিটা ও চোঁছা ছাড়ানো) উড়াই, কত খাম করি কোন খামই শরীল লাগেনা। কৃষক-কৃষাণীদের সাথে এ সময় ব্যস্ত থাকে স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা। আলাউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আরাফাত জানায়, সকালে বাবা-ভাই ও কাজের লোকদের ভাত খাইয়ে সে স্কুলে যায়। দুপুরে আবার হাওরে ভাত দিতে সে স্কুল থেকে চলে আসে। হাওরের ধান কাটায় ব্যস্ত (বেপারী) কৃষি শ্রমিক আলী আমজদ, রফিক মিয়া, শরাফত আলী জানালেন, হাওরের প্রচন্ড গরমে ধান কাটতে গিয়ে পানি পিপাসা খুব বেশী লাগে। এ সময় কাঠফাটা রোদে কলসীতে থাকা পানি খেতে অসহ্য লাগে, তৃষ্ণা মেটেনা। ঠান্ডা পানি খেতে হলে প্রায় ২ কিলো মিটার পথ পারি দিয়ে গ্রাম থেকে পানি নিতে হয়। হাওর পাড়ের স্কুল গুলোতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি এখন কমেছে বলে জানান স্কুল শিক্ষকরা। আলাউদ্দিন মেমোরিয়েল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌফিকুল ইসলাম বলেন, বৈশাখ মাসে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের মতোই আসায়াওয়া করে, তাদের কে আটকানো যায়না। আটকানোর চেষ্টা করলে স্কুলে আসবেনা এ সব শিক্ষার্থী। তারাও বাড়ীতে ধানতুলার কাজে সহযোগীতা করে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুত্রে জানাযায়, সারা জেলায় হাইব্রীড, উফশি ও স্থানীয় জাতের বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। সদর উপজেলায় ১৬ হাজার ১৫০ হেক্টর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় ২২ হাজার ৪৭৫ হেক্টর, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ১৩ হাজার ১০০ হেক্টর, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ১১ হাজার ৪৯০ হেক্টর, জগন্নাথপুর উপজেলায় ২০ হাজার ৭২৫ হেক্টর, জামালগঞ্জ উপজেলায় ২৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর, তাহিরপুর উপজেলায় ১৮ হাজার ৩০০ হেক্টর, ধর্মপাশা উপজেলায় ৩১ হাজার ৮০০ হেক্টর, ছাতক উপজেলায় ১৪ হাজার ৮০০ হেক্টর, দিরাই উপজেলায় ২৮ হাজার ৯৩০ হেক্টর ও শাল্লা উপজেলায় ২২ হাজার ১০ হেক্টর, মোট ২ লাখ ২৪ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা বশির আহমদ সরকার বলেন, বোরো মৌসুমে সব হাওরে একযোগে ধান কাটা শুরু হওয়ায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগ অন্যান্য সময়ের মতো এবারও কিছু এলাকায় ধান কাটার মেশিনের ব্যবস্থা করেছে। তবে এ সংকট সরকারের একার পক্ষ্যে দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য এলাকার ধনী কৃষকদের এগিয়ে আসতে হবে। তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি ভালো মানের ধান কাটার মেশিন কিনতে পারেন। এতে তারা নিজেরা যেমন উপকৃত হবে পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি কৃষকরাও উপকৃত হবেন।