Opu Hasnat

আজ ১৯ এপ্রিল শুক্রবার ২০১৯,

বিস্তৃীর্ণ ফসলী মাঠ জুড়ে আধা-পাকা ধানের গন্ধ

সুনামগঞ্জের হাওরে দুলছে কৃষকের নতুন স্বপ্ন কৃষি সংবাদসুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জের হাওরে দুলছে কৃষকের নতুন স্বপ্ন

সুনামগঞ্জের কৃষকরা চলতি বোরো মওসুমে সময়মতো ফসলী জমি রোপন করতে না পারলেও হাওরে আবাদকৃত বোরো জমিতে ধানের শীষ দেখে তাদের মনে নতুন স্বপ্ন ও আশা সঞ্চার হয়েছে। বছরে একটি মাত্র বোরো ফসলকে ঘিরেই হাওরাঞ্চলের মানুষের যত স্বপ্ন। বহু প্রতিক্ষা ও ত্যাগের পর কৃষকদের বছরজুড়ে থাকা অভাব-অনটন আর জমাট বাঁধা দুঃখ-কষ্ট পেরিয়ে এবার কিছুটা হলেও সোনাঝরা হাঁসি ফোটেছে তাদের মুখে। বহু প্রত্যাশীত সোনালী ফসল ঘরে তুলতে কৃষকর-কৃষকরা ধান মাড়াই ও শুকানোর কাজে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আর ধানী মাঠে গিয়ে প্রতিদিন দেখছেন তাদের আবাদকৃত ধান। মহান প্রভুর কাছে প্রার্থনা করেছেন ধান কাটার ক’টা দিনর জন্য। মেঘলা আকাশ দেখলেই শুরু হয় ছটফটানি আর শীলাবৃষ্টির ভয়ে কৃষকদের মন আঁতকে উঠে। পর-পর বেশ কয়েক বছর বোরো মওসুমে ফসল ডুবির কারণে কৃষকদের কয়েক বছর গেছে দুর্দিনে। সেই ক্ষতি কখনো পুষিয়ে উঠতে পারবেন কি-না কৃষকরা তা জানেননা। এ অবস্থায় কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করলেও ফসলের ভালো আবাদে কিছুটা আশ সঞ্চার হয়েছে তাদের মনে।

সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলাসহ ১১টি উপজেলার- দেখার হাওর, শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, পাকনা হাওর, হালির হাওর, সোনামোড়ল হাওর, খরচার হাওর, আঙ্গারুলী হাওর, কালিকোট হাওর, ধারাম হাওর, ধানকুনিয়া হাওর সহ বড়-বড় হাওরের বিস্তৃর্ণ ফসলী মাঠ এখন ধানের শীষে সবুজে সমারোহ। বোর ফসলের উপর নির্ভরশীল এ অঞ্চলের কৃষকরা বৈশাখ মাসে ধান গোলায় তোলার অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তারা। ধান গোলায় উঠলে কৃষকদের পরিবার আনন্দময় হয়ে উঠবে। নতুবা বিষাদের ছায়া নেমে আসবে। দেশের ধান ভান্ডার খ্যাত সুনামগঞ্জের বোরো ফসল এলাকার খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে দেশের অর্থনৈতিকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। গত ২০১৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের লাগামহীন দুনীতি আর অনিয়মের কারণে ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙ্গে একের পর এক হাওর ডুবে ফসল হারিয়ে এ জেলার কৃষকরা স্বর্বসান্ত হয়েছেন। ওই সময় মার্চের শেষ ও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের বৃষ্টি কাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কৃষকদের। এ কারণেই জেলা বাসীর দৃষ্টি এখন হাওরের ফসল রক্ষা বেরী বাঁধ নির্মানের দিকে। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর সুনামগঞ্জ জেলায় ১১টি উপজেলার ছোট বড় সব ক’ টি হাওরে ২ লাখ ২৪ হাজার ৫ শত ৫২ হক্টর বোরো জমিতে চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ১৬ হাজার ৬৯ হেক্টর। দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ২২ হাজার ৩ শত ২৯ হেক্টর। জামালগঞ্জে ২৪ হাজার ৬ শত ৯ হেক্টর। ধর্মপাশা ৩১ হাজার ৭ শ ৯৬ হেক্টর। তাহিরপুর ১৮ হাজার ৩ শত ৩৫ হেক্টর। দিরাই ২৭ হাজার ৯ শত ৫৪ হেক্টর। শাল্লা ২১ হাজার ৯ শত ৯৯। জগন্নাথপুর ১৫ হাজার ৩৫ হেক্টর। বিশ্বম্ভরপুর ১১ হাজার ৩ শত ৩৫ হেক্টর। ছাতক ১৪ হাজার ১ শ ৯৯ হেক্টর। দোয়ারাবাজার ১৩ হাজার ৬ শত ৩৯ হেক্টর। গত ২০১৭ সালের বন্যায় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকরা ঘুরে দাঁড়াতে পারছেননা। যদি লক্ষমাত্র অনুযায়ী জমিতে ধান উৎপাদন হয়, আর বৈরী আবহাওয়া না থাকে, তা হলে সুনামগঞ্জের হাওর থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার ধান উৎপাদন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ২০১৭ সালে বছর হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মানে দুনিিতর কারণে হাওরের বাঁধ ভেঙ্গে আড়াই  হাজার কোটি টাকারও বেশী ফসল ডুবে যায়। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ হয় জেলার ৩ লক্ষাধিক কৃষক পরিবার। এই ক্ষতির প্রভাব পড়ে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের উপর। জেলার সর্বত্র দেখা দেয় অভাব অনটন। ধান-চালের দাম বেড়ে গেলে এ অঞ্চলের হাওর পারের মানুষ কাজের সন্ধানে ছুটে যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। ফসল বিপর্য়য়কে সামনে রেখে কৃষকদের আন্দোলনে ২০১৮ সালে পানি সম্পদ মন্ত্রনালয় বাঁধ নির্মানে নতুন নীতিমালা করে ঠিকাদারী প্রথা বাতিল করে। সরাসরি সংযুক্ত করা হয় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে। গেল বছর নতুন নীতিমালায় সদ্য বিদায়ী জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আল-ইমরানের নিরলশ পরিশ্রম আর দক্ষতায় জেলার শ্রেষ্ট বাঁধ নির্মান ঘোষণা হয়েছিল জামালগঞ্জ উপজেলার হাওর। তবে চলতি বছর কিছুটা ব্যাতিক্রম হয়েছে। হাওর বাচাও সুনামগঞ্জ বাচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও কৃষকরা বলেছেন গত বছরের চেয়েও এবার কাজের মান নিম্ন। ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে গাফিলতি হওয়ায় ‘হাওর বাচাও, সুনামগঞ্জ বাচাও‘ আন্দোলনের ব্যানারে জেলা-উপজেলায় মানব বন্ধন হয়েছে। জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লাসহ বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা অভিযোগ তুলেছেন ফসল রক্ষা বাঁধের গোড়া থেকে পি আইসির সদস্যরা এক্সেভেটর দিয়ে বাঁধে মাটি তুলেছেন। ফলে সামান্য বৃষ্টিপাতে বাঁধ ভেঙ্গে ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। 

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবুবকর সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, বাঁধের কাজ শেষ। সার্বিক দিক থেকে বলা যা এবারো ভালো কাজ হয়েছে। বৃষ্টিতে প্রকল্পের কাজে মাটি লেভেলিং, ড্রেসিং, মজবুতকরনসহ দুর্বাঘাস লাগানো হচ্ছে।