Opu Hasnat

আজ ২৬ মার্চ মঙ্গলবার ২০১৯,

‘সবার জন্য কিডনি স্বাস্থ্য : পেক্ষাপট বাংলাদেশ’ স্বাস্থ্যসেবা

‘সবার জন্য কিডনি স্বাস্থ্য : পেক্ষাপট বাংলাদেশ’

১৪ মার্চ উৎযাপিত হবে ১৪তম বিশ্ব কিডনি দিবস। এ দিবসের উদ্দেশ্য  হলো সারা বিশ্বের মানুষকে কিডনি রোগের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা এবং কিডনি বিকল প্রতিরোধে কী করনীয় সে সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা।

বিশ্বের প্রায় ৮৫ কোটি মানুষ বিভিন্ন ধরনের কিডনি রোগে ভুগছে। প্রতি বছর ২৪ লক্ষ মানুষ ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ লোক আকষ্মিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয় প্রতি বছর। এদেও  মধ্য থেকে প্রায় ১৭ লক্ষ রোগী অকাল মৃত্যুবরণ করে। এ ছাড়াও আকষ্মিক কিডনি বিকল এবং দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের কারণে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, এইডস, ম্যালেরিয়া, টিবি, হেপাটাইটিস ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। এ কারণে কিডনি রোগকে বলা হয় ডিজিজ মাল্টিপ্লায়ার।

বিভিন্ন জরিপ থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে ২ কোটিরও অধিক লোক কোন না কোন কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি বিকল হয়ে প্রতি ঘন্টায় অকাল মৃত্যুবরণ করছে ৫জন লোক। কিডনি বিকল হয়ে গেলে বেঁচে থাকার উপায় কিডনি সংযোজন অথবা ডায়ালাইসিস। কিন্তু এই চিকিৎসা এতোই ব্যয়বহুল যে, এদেশের শতকরা ১০ ভাগ লোকেরও সাধ্য নেই তা বহন করার। ফলে শতকরা ৯০ ভাগ কিডনি বিকল রোগী মৃত্যুবরণ করে অর্থাভাবে প্রায় বিনা চিকিৎসায়। 

তাহলে এই বিশাল সংখ্যক অসহায় রোগীদের কিভাবে কিডনি রোগ প্রতিরোধ ও প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসার আওতায় আনা যায়। কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমে সবার জন্য কিডনি স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব।
 
* সুস্থ  জীবন ধারা চর্চার মাধ্যমে কিডনি রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিডনি রোগের কিছু কারণ আছে যেখানে মানুষের হাত নেই যেমন- বংশগত কিডনি রোগ, বয়স, লিঙ্গ, জম্মগত ক্রটি। পক্ষান্তওে প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে প্রধান কারণ গুলো কিন্তু জীবন ধারা চর্চার সাথে সম্পর্কিত। যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, অলস জীবন যাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহন ইত্যাদি। তাই একটু সচেতন হলে সুস্থ জীবন ধারার চর্চার মাধ্যমে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা অথবা নষ্ট হওয়ার গতি কমিয়ে আনা যায়।

আবার ডায়রিয়া, বমি, রক্তক্ষরণ, তীব্র সংক্রমন যেমন -ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, হেপাটাইটিস, ভেজালখাদ্য থেকে আকস্মিক কিডনি বিকল হয়। সবার জন্য সুপেয়পানি, জীবানু মুক্ত খাবার, হাত ধুবার অভ্যাস, প্রয়োজনে খাবার স্যালাইন, সময়মত টিকা নেয়া আকষ্মিক কিডনি বিকল ঠেকাতে পারে। 

* সাধারণত কিডনির কার্যক্ষমতা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ নষ্ট হওয়ার পূর্বে কিডনি বিকলের কোন লক্ষণ দেখা যায়না। তাই যারা কিডনি রোগের ঝুঁকিতে আছে সবাইকে নিয়মিত স্ক্রিনিং এর আওতায় আনতে হবে। যাদেও ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অথবা বংশে এসব রোগ আছে, যারা ধূমপায়ী, যাদের ওজন বেশী, যারা অলস জীবন যাপন করে, যারা অস্বাস্থ্যকর খাবার খায়, দীর্ঘ দিন ব্যথার ওষুধ খাচ্ছে, যাদেও কিডনিতে পাথর হয়েছে, ঘনঘন মূত্রতন্ত্রে প্রদাহ যাদেও বয়স ৫০ এর বেশী তারা সবাই ঝুঁকিতে আছে। তাদেরকে অন্তত ৬ মাস পরপর রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে কিডনি ভাল আছে কিনা তা জেনে নিতে হবে। সুপ্ত কিডনি রোগ প্রাথমিক অবস্থায় নির্নয় করে চিকিৎসার মাধ্যমে নিরাময় করা যায়। প্রস্রাব পরীক্ষায় মাইক্রো এ্যালবুমিন ও রক্তের ক্রিয়েটিনিন থেকে ইজিএফআর নির্নয় করে কিডনি আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা বলে দেওয়া যায়। সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সকল হাসপাতালে যদি এই দুইটি পরীক্ষা বিনা মূল্যে করা হয় তাহলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অঙ্কুরেই কিডনি রোগ সনাক্ত কওে কিডনি বিকল প্রতিরোধ করা যাবে।

* যে কারণগুলো কিডনি রোগের জন্য বেশী দায়ী যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তেঅতিরিক্ত কোলেষ্টেরল- সে গুলোর চিকিৎসা সুযোগ ধনী/গরীব নির্বীশেষে সবার থাকতে হবে। গরীবদেও জন্য এসব ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

* কিডনি যদি সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায় তখন বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজন। এই চিকিৎসা ব্যয় এত বেশী যে এ দেশের শতকরা ৯০ ভাগ লোকের সাধ্যেও বাইরে। কাজেই সবাইকে চিকিৎসার আওতায় আনতে হলে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের বিধিমালার কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে হবে। ডায়ালাইসিস সুবিধা সুদূর থানা হাসপাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে। ডায়ালাইসিসের আর একটি পদ্ধতি আছে যাকে বলা হয় সিএপিডি বা পেরিটোনিয়া লডায়ালাইসিস যা রোগী নিজের ঘওে বসেই করতে পারে। এর জন্য কোন দামী মেশিন বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক বলের প্রয়োজন হয়না। শুধু প্রতিদিন তিন ব্যাগ ফ্লুইড লাগে। সরকার যদি বিনামুল্যে বা স্বল্প মুল্যে এই ফ্লুইড সরবরাহ করেত প্রত্যন্ত গ্রামের কিডনি বিকল রোগীদেরকেও চিকিৎসার আওতায় আনা যাবে। অন্য দিকে ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাই যাতে ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজনের খরচ বহন করতে পারে সেজন্য এই খাতে অগ্রাধীকার ভিত্তিতে ভর্তুকি প্রদান ও সবার জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু করতে হবে। 

এ সুপারিশমালা যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে সবার জন্য কিডনি স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা নিশ্চিত হবে।

লেখক : অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ
এমবিবিএস, এফসিপিএস, এমডি, এফআরসিপি
চিফ কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান, কিডনি রোগ বিভাগ
বিআরবি হসপিটালস লিমিটেড, ঢাকা।