Opu Hasnat

আজ ২৬ মার্চ মঙ্গলবার ২০১৯,

মুন্সীগঞ্জও উত্তাল হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের ঢেউয়ে মুন্সিগঞ্জ

মুন্সীগঞ্জও উত্তাল হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের ঢেউয়ে

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি, ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি”-পৃথিবীতে একমাত্র বাংলাদেশের মানুষই ভাষা আন্দোলন করেছে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত একমাত্র ঘটনা। ঢাকার অতি সন্নিকটের জেলা মুন্সীগঞ্জ। ঢাকার ভাষা আন্দোলনের উত্তাল ঢেউ মুন্সীগঞ্জেও লেগেছিল। ১৯৪৮ সাল থেকে রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবীতে সোচ্চার মুন্সীগঞ্জবাসী। ভাষা আন্দোলনের দু’টি মূলস্থান ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের সরকারী হরগঙ্গা কলেজ ও মুন্সীগঞ্জ হাই স্কুল।

বাঙালিরাই শুধুমাত্র ভাষার জন্য রাজপথে জীবন দিয়েছেন। মোঃ আলী জিন্নাহর ১৯৪৮সালের পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু ঘোষণার সাথে সাথে বাংলার প্রতিটি অঞ্চলের মতো মুন্সীগঞ্জেও হয় আন্দোলন, হয় নানা ধরণের সভা ও সমাবেশ। 

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল। ভাষার দাবীতে মুন্সীগঞ্জ উত্তাল হয়ে পড়ে। মফস্বল শহরের প্রতিটি রাস্তা হয়ে পড়ে মিছিলে-মিছিলে উত্তাল। ঘর ছেড়ে মানুষ বের হয়ে ভিড় জমায় সদর রাস্তায়। ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক সবাই মিছিল করতে থাকে- “রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই, আমাদের দাবী মানতে হবে”।

এদিন বেলা ১১ টার দিকে সরকারি হরগঙ্গা কলেজের ছাত্র নেতা সৈয়দ খোকার নেতৃত্বে একটি বিশাল মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। মিছিলটি জেলা শহরের সরকারী হরগঙ্গা কলেজ থেকে শুরু হয়ে পুরাতন কাচারী, জমিদার পাড় মোড়, বাজার রোড, মুন্সীগঞ্জ সদর থানার সম্মুখ হয়ে, থানার পুল, দর্পনা এলাকাসহ শহরের প্রধান-প্রধান সড়ক প্রদক্ষিন করে শহরের হাটলক্ষীগঞ্জ লঞ্চঘাট পর্যন্ত পৌঁছায়।

সেখান থেকে ফেরার পথে মিছিলটি যখন বাগমামুদালী পাড়া অতিক্রম করছিল তখন বিরোধীরা মিছিলে আক্রমন করে। সে সময় তেজস্ক্রিয় অস্ত্র, সোডার বোতল মিছিলে নিক্ষেপ করা হয়। এতে অনেক আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হয়।

আহতদের মধ্যে যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন বজলুর রহমান রবি, এডভোকেট মোতাহার হোসেন চৌধুরী ও মোবারক হোসেন। এদের পুরাতন কাচারীস্থ তৎকালীন মুন্সীগঞ্জ মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসা করা হয়। এ মিছিলটিতে অংশ গ্রহণ করেছিলেন সরকারি হরগঙ্গা কলেজের সেই সময়ের ছাত্র বর্তমানে অবসর প্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা লুৎফর রহমান। তিনি বলেন এ আকস্মিক হামলায় মিছিলকারীরা দমে যায়নি। তারা দ্বিগুণ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে মিছিল সহকারে মুন্সীগঞ্জ হাই স্কুলে জমায়েত হয়।

স্কুল, কলেজ ও সূধী সমাজ মিলে হাজার খানেক লোকের এক বিশাল সমাবেশে পরিণত হয় মিছিলটি। মিছিল শেষে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সৈয়দ খোকা, জিতেন মোক্তার, জ্ঞান মোক্তার, রুহিনী বাবু ও হিরালাল মোক্তার। এর পর থেকে মুন্সীগঞ্জ আরো উত্তপ্ত হতে থাকে। ভাষার দাবীতে মুন্সীগঞ্জ হতে থাকে উত্তাল। তখনকার জনতার এর পরের জানা। 

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিছিলে গুলিবর্ষণ করা হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত শহীদ হয়। 

এ খবর বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো মুন্সীগঞ্জেও ছড়িয়ে পড়লে তীব্র্র ক্ষোভে রাস্তায় নেমে পড়ে সর্বস্তরের জনগণ। এ সময় হরগঙ্গা কলেজের ছাত্ররা তাৎক্ষণিক একটি মিছিল বের করে এবং একটি প্রতিবাদ সভা হয় কলেজ চত্ত্বরে। প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন হরগঙ্গা কলেজের সুরবিন্দ সেন, মোয়াজ্জেম হোসন খান ও হারুন অর রশিদ।

মুন্সীগঞ্জ, গজারিয়া, টঙ্গীবাড়ী, লৌহজং, সিরাজদিখান ও শ্রীনগরের ছয়টি উপজেলায়ও ভাষা আন্দোলনের সময় মিছিল, সভা-সমাবেশ করা করেন অনেকে। মুন্সীগঞ্জের সন্তানেরা বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড.এ,কিউ,এম বি.করিম। ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ফজলুল হক মুসলিম হলের হাউস টিউটর। তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন এবং মুন্সীগঞ্জের আন্দোলনকারীদের সার্বিক সহযোগিতা করেন। ভাষা আন্দোলনে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার সন্তান প্রখ্যাত সাংবাদিক শফিউদ্দিন আহম্মেদ (শফি)-এর অবদানও বিশেষ ভাবে স্মরণীয়। তাঁকে বঙ্গ-ভারতের লোকেরা শফি সাংবাদিক নামেই বেশী চেনে থাকেন। ১৯৫২ সালে শফিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন জগন্নাথ কলেজের জি.এস। তার নেতৃত্বে জগন্নাথ কলেজের ছাত্র-শিক্ষকরা পুরান ঢাকায় মাতৃভাষা আন্দোলন বেগবান করে তোলেন। ঢাকার বিভিন্ন সভা সমাবেশে ভাষা আন্দোলনের স্বপক্ষে বক্তৃতা করেন।

১৯৫৪ সালে ভাষা আন্দোলনের জন্য ঢাকার ফজলুল হক হল হতে গ্রেফতার হয়েছিলেন মুন্সীগঞ্জের সন্তান আফজাল হোসেন ভূইয়া। ভাষা আন্দোলনের জন্য তিনি একমাস ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজদ্দিন আহাম্মদও ভাষা সৈনিক ছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন। 

আফজাল হোসেন ভূইয়া বলেন আব্দুল মতিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের ভি.পি ছিলেন। 

১৯৫৪ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের তার ছিল দূর্দান্ত অংশ গ্রহণ। তার গ্রামের বাড়ি টঙ্গীবাড়ীর উপজেলার স্বর্ণগ্রাম এলাকায়। ভাষা আন্দোলনে মুন্সীগঞ্জের দু’জন মহিলার নাম জানা যায়। এরা হলেন দু’বোন ফরিদা ইয়াসমিন ও মমতাজ বেগম। তাদের এক ভাই আশরাফ-উ-দৌলা। তারা মধ্য জেলা শহরের কোর্টগাঁও গ্রামে ভাড়া করা বাড়িতে বসবাস করতেন।

শহরের কোর্টগাঁও গ্রামের সন্তান মজনু সরকার ভাষা আন্দোলনের সময়কালীন বিভিন্ন মঞ্চে তিনি সংগীত পরিবেশন করতেন। ভাষা আন্দোলনে কারাবরণকারীদের মধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদরের বড় কেওয়ার গ্রামের এডভোকেট মোতাহার হোসেন চৌধুরী ও অধ্যাপক সাহাব উদ্দিন হিরু ছিলেন অন্যতম।

মোতাহার হোসেন চৌধুরী ১৫ ফেব্রুয়ারি ৫২ সালে মিছিল করার সময় আহত ও গ্রেফতার হন। ব্যাংক কর্মকর্তা লুৎফর রহমান ও এ,কে,এম খোরশেদ ভাষা আন্দোলনের সময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বাংলাদেশের প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী। তিনি ঢাকার সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন এবং জীবনের প্রথম গ্রেফতার হন। আরো একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছিলেন তিনি হলেন কোরবান আলী। তিনি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং এলাকার সন্তান।

আব্দুল করিম বেপারী, রিকাবী বাজারের সন্তান। তিনিও ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশ গ্রহণ সহ ছাত্রদের উৎসাহ দিতেন। কামরুদ্দিন আহমেদ ষোলঘর এলাকার সাহসী এক নাম। তিনি ঢাকার আরমানিটোলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ভাষার দাবীতে ৫২ সালে ঢাকার রাজপথে মিছিল করেন। 

আজিজুল হক খান লৌহজং নাগের হাটের বাসিন্দা। তিনি ছিলেন ঢাকা কলেজের ছাত্র নেতা। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেন। মুন্সীগঞ্জের সন্তান যারা ভাষা আন্দোলনে ঢাকায় অংশ গ্রহণ করেন এদের মধ্যে মধ্যে মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন শ্রীনগরের পশ্চিম মু্িন্সয়া গ্রামের সন্তান। লৌহজং উপজেলার মেদিনীমন্ডলের আব্দুর রশিদ মিয়া। যিনি ভাষা আন্দোলনের সময় গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। হাওলাদার নুরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ীর জেলার শ্রীনগর উপজেলার দোগাছিতে। তিনি ভাষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সরকারি চাকুরী ছেড়ে দেন। তিনি সরকারী কলেজের অধ্যাপক ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে মুন্সীগঞ্জের শ্রীপল্লীর আব্দুন নূর ১৯৫৫ সালে গ্রেফতার হয়েছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত ভাষার জন্য মুন্সীগঞ্জে অনেক আন্দোলন, সভা-সমাবেশ হয়। 

এ পর্যন্ত যে সকল তথ্য পাওয়া যায়। তা হলো ৩ মার্চ ১৯৪৮ সালে মুন্সীগঞ্জের স্কুল সমূহে হরতাল ও বিক্ষোভ হয়। জেলা শহরের শ্রীনাথ ক্লাব মাঠে এর মিটিং হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আমির হোসেন। বক্তব্য রাখেন মিনহাজ উদ্দিন মৃধা, দুদু মিয়া, সত্য রঞ্চন বসু ও মোহিত লাল চেটার্জী। 

১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মুন্সীগঞ্জে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি প্রতিবাদ সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন এসাক চাকলাদার। তথ্য ও ইতিহাস সংরক্ষণের অভাবে অনেক ভাষা সৈনিকের নাম পাওয়া যায়নি। কিন্তু তাদের নাম সংরক্ষন করাটা যে অতি জরুরী হয়ে পরেছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। অন্যথায় বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবে ভাষা আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ন অধ্যায়। এতো রক্ত-আন্দোলনের বিনিময়ে বর্তমানে বিশ্বে অর্জিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই বাংলাভাষা নিয়ে গবেষক-ইতিহাসবিদদের প্রতি মুন্সীগঞ্জবাসির দাবী ভাষা আন্দোলনে যারা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেছেন এবং যাদের নাম সংগ্রহ করে ইতিহাসের শেষের পাতায়ও যেন জায়গা করিয়ে দেন।