Opu Hasnat

আজ ২০ এপ্রিল শনিবার ২০১৯,

বিপন্ন হয়ে পড়েছে নদীর দুই তীরের প্রাকৃতিক পরিবেশ-

মুন্সীগঞ্জে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্যে ধলেশ্বরী-শিতলক্ষা-মেঘনা নদী দূষিত মুন্সিগঞ্জ

মুন্সীগঞ্জে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্যে ধলেশ্বরী-শিতলক্ষা-মেঘনা নদী দূষিত

মুন্সীগঞ্জের পশ্চিম মুক্তারপুরে একাধিক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অ্যাশ, ডাইং, প্রিন্টিংসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিষাক্ত বর্জ্যে ও বায়ুদূষণে ধলেশ্বরী-শিতলক্ষা-মেঘনা নদী দূষিত হয়ে পড়েছে। বিপন্ন হয়ে পড়েছে নদীর দুই তীরের প্রাকৃতিক পরিবেশ। এতে নদীতীরের বিভিন্ন প্রামের মানুষজনসহ আসে-পাশের এলাকার দোকানপাটের ক্রেতা-বিক্রেতা ও পথচারীরা শ্বাসকষ্টজনিত রোগ, স্ট্রোক, এমনকি ক্যান্সারের মতো বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। 
এসব রোগে আক্রান্ত হবার কথা স্বীকার করেছেন জেলার সিভিল সার্জন হাবিবুর রহমান।

অন্যদিকে ধলেশ্বরীর তীরে শহররক্ষা বাঁধ দখল করে বর্তমান ক্ষমতাসিন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ইট-বালুর ব্যবসা ও ড্রেজারে বিভিন্ন জমি, ডোবা-নালা ভরাট ব্যবসার কারণে মুক্তারপুর ব্রিজের একাধিক পয়েন্টের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরই মধ্যে শহররক্ষা বাঁধের একাধিক স্থানের ব্লক খুলে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। জেলা প্রশাসন একাধিকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে উচ্ছেদ করলেও প্রভাবশালী চক্রটি বর্তমান ক্ষমতাসিন দলের রাজনৈতিক দলের ব্যানার ব্যবহার করে ফের ইট-বালু ও আনলোড ড্রেজারের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে শহররক্ষা বাঁধটি। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধটি সংস্কার করা না হলে ব্যাপক ভাঙনের আশঙ্কা করছেন নদীতীরবর্তী শহরবাসী।

এ প্রসঙ্গে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা বলেন, শহররক্ষা বাঁধের ওপর এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে ইট-বালু স্তুপ করে রেখে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, সিমেন্ট ফ্যাক্টরির ডাস্ট বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির দূষণ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও এ অবস্থা থেকে উত্তরণ হওয়া যায় সে বিষয়ে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের নিয়ে জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হবে। এর পরও সংশ্নিষ্টরা সচেতন না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে, সরেজমিন নদীর তীর ঘুরে দেখা গেছে, মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার উত্তর ইসলামপুর থেকে হাটলক্ষীগঞ্জ-নয়াগাঁও ফিরিঙ্গিবাজার হয়ে মিরকাদিম পৌরসভার ধলেশ্বরী নদীর পাড় দখল করে অবৈধ ইট-বালুর ব্যবসা চালানো হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, ইট-বালুর ব্যবসায়ীরা শহররক্ষা বাঁধকে দখল করে রেখেছে। তাদের কারণে ভেঙে পড়ছে বাঁধের ব্লক। এ ছাড়া সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অ্যাশ এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরী নদীতে। তাই ধলেশ্বরী-শিতলক্ষা নদীর পানি এখন দূষিত হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে পানি কিছুটা স্বচ্ছ দেখালেও শুস্ক মৌসুমে পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় নদীতীরের বাসিন্দাদের গোসল করার ক্ষেত্রেও হচ্ছে সমস্যা। মাছও নেই নদীতে। জেলেরা এখন আর এই ধলেশ্বরী নদীতে মাছ শিকারে নামেন না। আগে এ নদীতে ডলফিন থাকলেও এখন তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

শহরের উপকন্ঠ নদী তীরবর্তী নয়াগাঁও গ্রামের কামাল হোসেন জানান, সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর অ্যাশ উড়ে সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে খোলামেলাভাবে ক্লিংকার ও অ্যাশ জাহাজে লোড-আনলোড করা হচ্ছে। সিমেন্টের অ্যাশ উড়ে এসে ধলেশ্বরী নদীতীরবর্তী হাটলক্ষীগঞ্জ, নয়াগাঁও, মিরেশ্বরাই, মুক্তারপুর, চরমুক্তারপুরসহ আশপাশ এলাকা ও জেলা শহরের পরিবেশ দূষণ করে চলেছে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির অ্যাশ এবং বালু সামান্য বাতাসেই উড়তে থাকায় আশপাশের এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পরেছে।

জেলার সিভিল সার্জন হাবিবুর রহমান জানান, পশ্চিম ও পূর্ব মুক্তারপুর, নয়াগাঁও, মিরেশ্বরাই, ফিরিঙ্গিবাজার ও শহরের হাটলক্ষীগঞ্জসহ জেলা শহরে অবস্থিত জেনারেল হাসপাতাল, আদালত, পুলিশ লাইন্স, ট্রাফিক পুলিশ অফিস, সদর থানা, জেলা পরিষদ, পুলিশ সুপার কার্যালয়, এলজিইডি, জনস্বাস্থ প্রকৌশল অধিদপ্তর অফিস, সড়ক ও জনপদ অফিস, স্কুল-কলেজসহ শহর ও শহরতলির নারী-পুরুষ, শিশুরা ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়াসহ শ্বাস-প্রশ্বাস ও চর্মরোগ এবং ৩০ থেকে ৪০ বছরের বেশির ভাগ নারী-পুরুষ ব্রেইন ও হার্ড স্ট্রোক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়া গাছপালা ও ফসলাদির ক্ষতি হচ্ছে। এরই মধ্যে ধলেশ্বরী নদীতীরে বড় বড় অনেক গাছ মারা গেছে। এ ছাড়া নদীরতীরে গড়া সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলো ক্রমাগত নদী দখল করে নিচ্ছে। শহররক্ষা বাঁধ-সংলগ্ন মিরেশ্বরাইয়ের মাঠে মেশিন দিয়ে পাথর ভাঙা হচ্ছে। এতে শব্দদূষণসহ পাথরের ধুলা ও পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ীদের বালু উড়ে তাদের ঘরবাড়িতে প্রবেশ করছে। রাস্তায় এসব বালুর আস্তরণ পড়ে। পরে সামান্য বাতাসেই সেগুলো পথচারীসহ দোকানিদের চোখে-মুখে প্রবেশ করছে।

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মুন্সীগঞ্জ শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান জানান, তিনি পৌর মেয়র থাকাকালে এ বাঁধটি নির্মাণ করেছিলেন। সরকারী প্রভাবশালী সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও ইট-বালু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্ক অনেক ভালো। তাই নির্বিঘ্নে তারা ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারছেন।

মুন্সীগঞ্জ পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বিগত সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অবৈধ ব্যবসায়ীদের একাধিকবার চিঠি দেওয়া ও জরিমানা করা হয়েছে। এর পরও সিমেন্ট কারখাখানার ডাস্ট ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে ধলেশ্বরী-শিতলক্ষা-মেঘনা নদীর পানি দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশও বিপন্ন হয়ে পড়ছে। 

ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী জানান, মুন্সীগঞ্জের পশ্চিম মুক্তারপুর এলাকায় বিভিন্ন টেক্সটাইল মিলসের কেমিক্যাল মিশ্রিত তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে দূষণ করে চলেছে। এ ছাড়া সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর অ্যাস ও একাধিক ডাইং-প্রিন্টিংসহ অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠানের কেমিক্যাল মিশ্রিত পানি ফেলে নদী দূষণ করে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন করে তুলেছে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর ক্লিংকার ও অ্যাস জাহাজে লোড-আনলোড করার সময় বাতাসের সঙ্গে উড়ে পরিবেশ দূষিত করে তুলেছে। 

সরেজমিনে মুন্সীগঞ্জের চর-মুক্তারপুর এলাকা ও নদী তীরবর্তী এলাকাবাসীদের সঙ্গে কথা বলে ও ঘুরে এসে জানা যায়, গড়ে উঠা বিভিন্ন শিল্প কারখানার বিষাক্ত গ্যাসের মাধ্যমে পরিবেশ ও মানুষের জীবন হুমকির মুখে পরে গেছে, ধলেশ্বরী-শীতলক্ষ্যা-মেঘনা নদী দখল মুক্ত করার রক্ষে, সিমেন্ট ফ্যক্টরিসহ শিল্প কারখানার বিষাক্ত বর্জ দূষণের প্রতিবাদে মুন্সীগঞ্জের পশ্চিম মুক্তারপুরে ধলেশ্বরী নদীর তীরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভাসহ ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়ক বন্ধের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী। এ প্রতিবাদ কর্মসূচিতে পশ্চিম মুক্তারপুর এলাকায় শাহ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ও অন্যান্য সিমেন্ট ফ্যক্টরিসহ নদীর তীরে গড়ে ওঠা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক পক্ষকে স্থানীয় ব্যক্তি মালিকানাধীন এবং নদী ও সরকারি সম্পত্তি দখলমুক্ত করার আহ্বানসহ দাবি জানানো হবে। 

এ ব্যপারে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানান, ইট-বালু ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করার পাশাপাশি যেসব ব্যক্তি অবৈধভাবে শহররক্ষা বাঁধকে হুমকির মুখে ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ কলকারখানাগুলোর তরল বর্জ্য ও অ্যাশের কারণে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। তা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়- এ নিয়ে মালিকদের সঙ্গে দ্রুত মতবিনিময় সভার আয়োজন করার উদ্যোগ নিয়ে এর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে। আশা করি খুব দ্রুত এর ফলাফল জেলাবাসী দেখতে পারবে।