Opu Hasnat

আজ ১২ ডিসেম্বর বুধবার ২০১৮,

অনন্য এক কবি সত্ত্বা নাজমুল হক নজীর : আলী আকবর শিল্প ও সাহিত্য

অনন্য এক কবি সত্ত্বা নাজমুল হক নজীর : আলী আকবর

শব্দের নূড়িপাথর কুড়িয়ে অবিরামভাবে হয়তো লেখা সম্ভব নয়,  অথবা লিখলেও ক'জনে তা লিখতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমরা ছুটে চলি - ‘স্বপ্ন বাড়ি অবিরাম’ এর কাছে। কথা বলি কবি নাজমুল হক নজীরের সাথে। মুগ্ধতার দৃষ্টিতে আবিষ্কার করি অমর কবিসত্ত্বার  সেই কারিগরকে যিনি উপলব্ধিকে বয়ানে আর কবিতাকে শ্লোগানের ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। 

একজন কবি কতটা শান্তিকামী হলে ঈদের খবরকে নিত্যদিন ছড়িয়ে দিতে চান। অনন্ত সৌরভের আধিপত্যে রঙিন হতে চান। কেন সৌরভের আধিপত্য বলছি তা তাঁর ‘স্বপ্নজট’ কবিতার এই পঙক্তির দিকে তাকালেই পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন।

    দেবদুত হোক সব লোকালয়
    ঈদের খবর প্রতিদিন,
    দেহ প্রাণে অনন্ত সৌরভ 
    সবুজ শ্যামল রঙিন। 

সমকালীন  কবিতায় সারল্যের অনুপস্থিত একজন পাঠক হিসাবে আমাকে খুব ব্যথিত করে। অবশ্য কবিতার পাঠকদের এই অভিযোগ নতুন নয়। ছন্দের বাইরে বেরোবার যে প্রতিযোগীতা এখন শুরু হয়েছে তাতে  ক্রমশই কবিতা পাঠক প্রিয়তা হারাচ্ছে। তবে নাজমুল হক নজীর উপযুক্তকে যথার্থ বলে সারল্যের যে পরিচয়  দিয়েছেন তা তাঁর সৃষ্টিকর্মকে শতবছর বাঁচিয়ে রাখবে অবলীলায়। 

তারুণ্যকে কালের ফ্রেমে আটকানো যায় না। তাইতো কবি নিম্নের পঙক্তিতে শব্দকল্পের যে নবান্ন এনেছেন তা নিঃসন্দেহে নান্দনিকতার নতুন উপমা। যেমন-
      জীবনে শুধু যৌবন চাই 
      বয়সে চাই বসন্ত 
      পৌষ শ্রাবণ নবান্ন থাক
      মানুষে মানুষে সুমন্ত।

মফস্বলে যারা লেখালেখি করেন তারা সাহিত্যের মুল ধারার সাথে খুব একটা সঙ্গ নিতে পারেন না। কিন্তু নাজমুল হক নজীরের কোন সাহিত্যেকর্মে এমন দুর্বলতা পাওয়া যায় না। তাঁর সমকালীন কবিরা হয়তো কেউ কেউ জানতেননা যে  তিনি বোয়ালমারীর মত মফস্বল শহরে থেকে লেখালেখি করেন।

২০১১ সালের জানুয়ারী মাসের কথা, কবির সাথে প্রথম দেখা করেছিলাম। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র । ফরিদপুরের বোয়ালমারী সরকারি  কলেজ রোড দিয়ে বোয়ালমারী  জর্জ একাডেমী যেতে পাক্ষিক 'নজীর বাংলা'র  সাইনবোর্ড মারফত একদিন বিকালে তাঁর অফিসে বান্দা হাজির। সালামের পর বললাম- আমি একটা কবিতা শুনাতে চাই; ঝাকড়া চুলের বাবরি  দুলিয়ে দুলিয়ে তিনি শুনলেন আমার ‘সেই মেয়ে’ কবিতাটি।
তার প্রথম ক’লাইন ছিলো  এমন----

 পল্লী পাড়ার একটি কথায় 
   মন যে কেমন করে
ফুল কুড়ানো সেই মেয়েটির 
    কথা মনে পড়ে।
রোজ প্রভাতে ফুল কুড়াতে
  সেই মেয়েটির আসা
লাজুক তার ঐ দুটি চোখ
  মুখের মিষ্টি ভাষা।

এক কবিতা শুনিয়ে আমি বেশ লাভবান। সেকি আনন্দ!  উপহার হিসাবে তিনটি বই পেলাম। সেদিনের কথা মনে হলে আজো হৃদয়টা বড় হয়ে যায়।  অদ্যবধি এই উপহারের কথা ভোলার নয়।

দৈনিক ইত্তেফাকের কঁচিকাঁচার পাতায় একবার কবির একটা কবিতা ছাপা হলো,সাথে একটা ‘বই আলোচনা’। সম্ভবত আলোচনাটা কবি মিলন সব্যসাচী লিখেছিলেন। এই লেখাটা আমিই তাকে সংগ্রহ করে দিয়েছিলাম। এতে খুশি হয়ে তিনি তাঁর ‘ইষ্টিকুটুম মিষ্টি কুটুম’ বইটি  হাদিয়া হিসেবে দিলেন । ২০১৫ সালের ২৩শে নভেম্বর কবি ইহজগৎ ত্যাগ করেন।
জীবন আয়ুতে তিনি ক্ষণজন্মা হয়েও তাঁর অমর সৃষ্টিকর্মে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্ত কাল। 
শেষ কথাটি তাঁর ভাষাতেই বলি;
          ‘এই মৃত্যুতে  গোলাপ পেল পূর্ণ মর্যাদা।
           আমাদের কাধে এলো স্বপ্নের ভাগ,
         ‘শুভ সকাল’ আমরা তোমাকে ভুলবো না।’